ডা. শাহীন আবদুর রহমান:
ছোট্ট বেলায় বিটিভিই ছিল বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। এখনো মনে পড়ে, শুক্রবারের বাংলা সিনেমার জন্যে অধীর আগ্রহে সারা সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করতাম তীর্থের কাকের মতো। নায়িকার বড়লোক বাবাকে চ্যালেঞ্জ করে, গরীব হয়েও বিশুদ্ধ ভালবাসার অধিকারী নায়ক আদরের দুলালী নায়িকাকে বিয়ে করে ফেলতো অনায়াসেই। কী যে আনন্দ হতো দেখে!
একদিন দেখতে পেতাম নায়িকা বেহুশ হয়ে যেতো। ডাক্তার সাহেব প্রেগন্যান্সি টেস্ট না করে শুধুমাত্র পাল্স চেক করেই কনফিডেন্টলি বলে দিতে পারতেন- ” কংগ্রেচুলেশান্স, আপনি মা হতে চলেছেন”! সেইসব দেখে আমার রীতিমতো হিংসে হতো। মনে হতো- আহ, যদি এমন এক্সপার্ট ডাক্তার হতে পারতাম! কিন্তু আজ মনে হয়, এইসব সিনেমা বানানোর সময় একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিলে হয়তোবা এই গাঁজাখুরি দৃশ্যগুলি তখন দেখতে হতোনা বাংলা সিনেমার।
কিন্ত এই যুগের সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আজকাল আমরা ফেসবুক, গুগল ইত্যাদি বই পড়ে রাতারাতি ডাক্তার বনে যাচ্ছি। ফলে আমরা যারা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে ডাক্তার হয়েছি, তারা রীতিমতো সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছি। করোনা পরিস্থিতিতে এই সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সেদিন টিভি দেখছিলাম। বিখ্যাত একটা প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের একজন বিখ্যাত উপস্থাপিকা সেদিন করোনার একটি কার্যকর প্রতিরোধক সম্পর্কে বলছিলেন। আমি নড়েচড়ে বসলাম। প্রতিরোধক মানে তিনি বুঝাতে চাইছিলেন- আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য যেটা ব্যবহার করা হয় আর প্রতিষেধক মানে তিনি বললেন রোগ না হবার জন্যে যেটা ব্যবহার করা হয়। কয়েকবার এটা বলে তিনি নিজেই আবার প্যাঁচ খেয়ে গেলেন। এমন জটিল প্যাঁচ যে সেখান থেকে কোনভাবেই তিনি আর বেরুতে পারছিলেন না। তার জন্যে সত্যিই খুব মায়া হচ্ছিল আমার!
সেদিন একটা সুসংবাদ পেলাম। কক্সবাজারের একমাত্র করোনা আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করার পর পরীক্ষার মাধ্যমে করোনামুক্ত বা নেগেটিভ ঘোষিত হলেন। শুনে খুব ভাল লাগলো। কিন্তু এই সুসংবাদ অনেকের মনোবেদনার কারণ হয়ে দাড়ালো।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, তিনি সারাজীবন করোনা পজিটিভ হলেই তারা খুশি হতেন। তারা বলতে লাগলেন এই রোগী প্রকৃতপক্ষে করোনা আক্রান্ত ছিলেন না। প্রথম পরীক্ষাটি ভুল ছিল। অনেকে আবার টেস্ট কিটের মান সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। তার প্রমাণ হিসেবে তারা বলতে চাইলেন ঐ রোগীর সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের কেউইতো করোনা আক্রান্ত হননি। এ-ই হচ্ছে অবস্থা। একজন আবার লিখলেন, করানা কি তাহলে সংক্রামক নয়? কথায় যুক্তি আছে নিঃসন্দেহে।
তাহলে কি করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা লক্ষ লক্ষ কোয়ারান্টাইন এর মানুষগুলো আর সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া রোগী দেখা ডাক্তারদের অনেকেই আক্রান্ত হয়ে প্রমাণ করতে হবে যে করোনা একটি সংক্রামক ব্যাধি? ডাক্তারী বিজ্ঞান কিন্তু তা বলে না। এই সংক্রমণ আসলে ভাইরাসের পরিমাণ বা লোড, ইনফেক্টিভ ডোজ এবং ঐ ব্যক্তির ইম্যুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর নির্ভর করে।
এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, একজন মানুষের পক্ষে সবকিছু জানা অসম্ভব। যিনি যেই বিষয়ে এক্সপার্ট সেই ব্যাপারে তার পরামর্শ নেয়াই শ্রেয়। এতে করে কমিউনিটিতে ভুল ইনফরমেশন যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। মানুষ সঠিক তথ্য পাবে এবং সমাজে পজিটিভ ইম্প্যাক্ট তৈরি হবে। কারণ অসত্য তথ্য প্রচার করলে সমাজে একটা ফলস সেন্স অব সিকিউরিটি বা মিথ্যে নিরাপত্তাবোধ কাজ করবে। ফলে বাড়িতে অবস্থান করা লোকজন স্বস্তি বোধ করে বাইরে বেরিয়ে আসবে, যেটা নিঃসন্দেহে এই মূহুর্তে ভয়ংকর।
সমাজের সবাই আমরা একে অপরের পরিপূরক। কেউই ত্রুটির ঊর্ধ্বে নই আবার সবজান্তা ও নই। আসুন সবাই মিলে আমরা ইতিবাচক ভূমিকা রেখে সমাজ বিনির্মাণে কাজ করি। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে, এই ক্রাইসিস সিচুয়েশনে একটু দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। মূল প্রতিপাদ্য বিষয় সার্বজনীন সেবা হলেও একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলাই আজ সবার ধ্যানজ্ঞান। আসুন আমরা সবাই মিলে যুদ্ধ করি, করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ!
৭ এপ্রিল, ২০২০. কক্সবাজার।
লেখক: প্রধান- জরুরি বিভাগ ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল।
(লেখাটি শাহীন আবদুর রহমানের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া।)