তানভিরুল মিরাজ রিপন:
বাংলাদেশের টেকনাফ এবং উখিয়ায় ৩৪ টি রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির। চার হাজার একর বনভূমি কেটে গড়ে উঠা শরনার্থী শিবিরে বাস করে ১২ লাখ রোহিঙ্গা। শরনার্থী শিবিরে প্রায় ১৪ ধরনের অপরাধে জড়িত রোহিঙ্গারা। ১৪ টি সশস্ত্র ডাকাতদল এই অপরাধগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা জিম্মি করে রাখে সাধারণ রোহিঙ্গাদের।
যখনই নিরাপদ প্রত্যাবাসন কাজে রোহিঙ্গাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা রোহিঙ্গা কমিউনিটির কোনো সংগঠন প্রচারণা চালায়, তখন সশস্ত্র সংগঠনগুলো তাদের খুন ও অপহরণ করা হয়। এ কারণে আতংকে দিন কাটাচ্ছে শুধু রোহিঙ্গা নয়, স্থানীয় বাংলাদেশিরাও।
সম্প্রতি টানা চারদিন আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু-গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ করে ৭ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়। যার ফলে ক্যাম্পে শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বেশ তৎপরতা বেড়েছে। ক্যাম্পে নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতে জড়ানোর বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা রোহিঙ্গা নেতারাও।

তাই গত ২০ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংগঠন ফ্রী রোহিঙ্গা কোয়ালিশন আয়োজন করে অনলাইন কনফারেন্স। সেখানে ইউরোপীয়ান রোহিঙ্গা রাইট সংগঠনের সহ-সভাপতি ডা. আম্বিয়া পারভিন বলেন, ‘পুরো বিশ্ব জানে আমরা নির্যাতনের শিকার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর। আমরা জুলুমের শিকার। কিন্তু এখন মানুষ জানছে আমরা ক্রিমিনাল গোষ্টি, আমরা খুনী, আমরা মানুষ পাচারকারী। এটি আমাদের জাতির জন্য দুঃখজনক। আপনারা এসব বন্ধ করেন। নিজেরা নিজেদের লোকেদের না মেরে আপনার প্রস্তুত হোন শত্রুদের বিরুদ্ধে । আর এসব অন্যায় রুখে দিন। আমরা সঠিক বিচার পাবো, সেটির কাছাকাছি আমরা চলে এসেছি। আপনারা এসব খুনাখুনি, মাদক পাচার, মানুষ পাচার বন্ধ করেন।
তিনি আরও বলেন, যারা ক্যাম্পের বিভিন্ন মসজিদে ইমাম হিসেবে কাজ করেন আপনারা খোতবাতে কোনো উস্কানিমূলক কথা বলবেন না, আপনারা এদের ইমানি দায়িত্বের কথাগুলো বোঝান। খুনাখুনি, মাদক, মানুষ পাচার এগুলো শান্তির কাজ নয়, ধর্মের কাজ নয়। বোঝান সব দেশে আইন আছে, সেটা মানতে হবে। ‘
ডা. আম্বিয়া পারভিন সহ ৯ জন রোহিঙ্গা নেতার বক্তব্য নিয়েই বাধে যত বিপত্তি।
কনফারেন্সের নয়জন রোহিঙ্গা নেতার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি গ্রুপ ২৫ ও ২৬ অক্টোবর প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করে। এবং কনফারেন্সে অংশ নেওয়া নয় রোহিঙ্গা নেতাকে জাতির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ক্যাম্পে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল করে। তাদের বয়কটের ডাকও দেওয়া হয়। যারা এই কনফারেন্সে বক্তব্য দিয়েছে তাদের খুন করার হুমকি দেওয়া হয়।
তাৎক্ষনিক ২৬ অক্টোবর ফ্রী রোহিঙ্গা কোয়ালিশন সংগঠনটি একটি বিবৃতির মাধ্যমে বলেন, যতই মিছিল করা হোক আমাদের বিরুদ্ধে কিন্তু আমরা ঐক্যবদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে।
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবার নয়জন রোহিঙ্গা নেতার পক্ষ নিয়ে ২৯ ও ৩০ অক্টোবর দফায় দফায় ব্যানার, প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করে রোহিঙ্গাদের কিছু গ্রুপ। সে সকল রোহিঙ্গারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন রোহিঙ্গারা বিশ্বের কাছে একটি নিপীড়নের শিকার জাতি। আমরা শান্তির পক্ষে। যারা আমাদের পক্ষে, আমাদের অধিকারের পক্ষে কাজ করে তাদের জন্য আমরা এই মিছিলের আয়োজন করেছি। আমাদের ভাইদের ভয় নেই আমরা তাদের সাথে আছি।
মিছিলের প্রসঙ্গে নিয়ে এপিবিএন ১৪ এর সেকেন্ড ইন কমান্ডার রাকিব খান বলেন, মিছিলের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। আরও বিস্তারিত জানার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
রোহিঙ্গা নেতা নাই সান লুইন। বর্তমানে বসবাস করেন জার্মানে। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কলে ভয়েসওয়ার্ল্ডকে বলেন, আমি জানিনা এরা কারা, যারা আমাদের পক্ষে ক্যাম্পে মিছিল করছে। আমরা পক্ষ নিক, বিপক্ষে নিক এটার কিছুই চাইনা। আমরা চাই তারা অপকর্ম বন্ধ করুক। রোহিঙ্গা জাতির সম্মান রক্ষা করুক। হুমকি দিক, মিছিল করুক সমস্যা নেই। কিন্তু আমরা আমাদের জাতির অধিকার পেতে কাজ করে যাবো আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবো।
রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশ্লেষক ও বিবিসির প্রাক্তন সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ভয়েসওয়ার্ল্ডকে বলেন, রোহিঙ্গাদের উচিত নিজেদের মধ্যে হানাহানি না করে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রচারণা চালানো। বাংলাদেশের উচিত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরী করা।
দফায় দফায় সংঘর্ষ, খুন, অপহরণ, নারী পাচারের ফলে সাধারণ রোহিঙ্গারাও বিশ্বের কাছে এখন আতংকে পরিণত হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী ক্যাম্পে নিয়মিত কমিউনিটি নেটওয়ার্কিং বাড়িয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা তৈরি করতে চেষ্টা করছে। শুধু এপিবিএন নয় র্যাব এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্যাম্পে শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে। যার ফলে এপিবিএন-১৬ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সালমান শাহ গ্রুপের প্রধান সালমান শাহকে অস্ত্র ও মাদকসহ এবং জকির গ্রুপের ডাকাত জকিরের সহযোগী আমান উল্লাহকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
এ বিষয়ে ১৬ এপিবিএন এর কমান্ডিং অফিসার (পুলিশ সুপার) মো. হেমায়েতুল ইসলাম ভয়েসওয়ার্ল্ডকে বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা সংঘর্ষ করে এরা সংখ্যায় কম। কিন্তু ক্যাম্পের বেশিরভাগ অঞ্চল পাহাড়ঘেরা হওয়াতে তারা ক্যাম্পে বিভিন্ন অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যায়। কিন্তু এপিবিএন-১৬ কাজ করছে নিরাপত্তা জোরদার করতে। আমরা বেশ কয়েকজন ভয়ংকর সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী বাহিনী প্রধানকে আটক করেছি। আমরা এসব অপরাধীদের নির্মুল করবো।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত সংস্থা ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি)। এদের সর্বশেষ হিসাবমতে, ৩৪টি ক্যাম্পে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা ৯ লাখ ৫ হাজার ৮২২ জন। এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে ১৯৯১ সালে আসা ৩৪ হাজার রোহিঙ্গাও। বাকি দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা কোথায় গেছে, তা কারও জানা নেই। তবে সরকারি-বেসরকারি সব মহলই মনে করছে, এসব রোহিঙ্গা লোকালয়ে মিশে যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে তারা।