• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ন

কক্সবাজারে পাহাড়ধস : একদিনে ১০ জনের মৃত্যু

ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক : / ৭ বার ভিউ
আপডেট সময় : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে আবারও প্রাণ কেড়ে নিল পাহাড়ধস। মাত্র ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, কক্সবাজার সদর ও পেকুয়ায় পৃথক পাঁচটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী-শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শতাধিক পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আগামী কয়েক দিন আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নতুন করে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা করছে প্রশাসন।

আজ সোমবার বিকালে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আলমের ঝিরি এলাকায় পাহাড়ধসে ঘরের ভেতর মাটিচাপা পড়ে মিনহাজ (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি এলাকার কলিম উল্লাহ ও রুবি আক্তার দম্পতির ছেলে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যায়। বিকালে হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে কলিম উল্লাহর টিন ও বাঁশের তৈরি বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা মিনহাজ মাটিচাপা পড়ে। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করলেও ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়।

এর আগে সোমবার ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। একই পরিবারের আরও দুই সদস্য আহত হয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সাত্তারের ভাষ্য, প্রবল বর্ষণের মধ্যে হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ বসতঘরের ওপর ধসে পড়ে। মাটিচাপা পড়া তিনজনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অন্য দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এরও আগে রবিবার রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসে আট রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। এতে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) ও তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন।

দুর্ঘটনার সময় ঘরটিতে পরিবারের ১০ সদস্য অবস্থান করছিলেন। আহত এক কিশোরীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাত ২টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে মোহাম্মদ রশিদের ছেলে একরাম (৭) নিহত হয়। এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বললেন, ‘খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। রাতভর অভিযান শেষে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

রোহিঙ্গা শরণার্থী জাফর আলমের ভাষ্য, বর্ষা এলেই পাহাড়ধস তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। পাহাড় কেটে তৈরি করা ঢালে বাঁশ, ত্রিপল ও মাটির ওপর নির্মিত হাজারো ঘর সামান্য বৃষ্টিতেই ঝুঁকিতে পড়ে।

এদিকে টানা বর্ষণে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সোমবার বিকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান।

সভায় জানানো হয়, সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ছিল ২৪০ মিলিমিটার। আগামী তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, শুধু উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই গতকাল থেকে ১৯৩টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে এবং অতিরিক্ত এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৭৭ বান্ডিল ঢেউটিনও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সভায় উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা জানালেন, উখিয়া, টেকনাফ, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধসের ঝুঁকি ও সড়ক ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের বারবার নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হলেও অনেক পরিবার এখনো ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছে। তাদের সরিয়ে নিতে প্রশাসন কাজ করছে।’

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের মতে, ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। জীবন রক্ষায় সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানালেন, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আগামী আরও দুই থেকে তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বললেন, আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি সুপেয় পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা কিংবা অন্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।

প্রশাসনের আশঙ্কা, টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে কক্সবাজারের পাহাড়ি ঢাল ও পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে আরও ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান না করে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সবাইকে আহ্বান জানানো হয়েছে। সূত্র-আগামীর সময়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন