বঙ্গোপসাগর এবং বাঁকখালী নদীর তীর ঘেষে একটি অপরূপ এবং ব্যতিক্রমী দ্বীপের নাম মহেশখালী। সময়ের প্রবাহে বিভক্ত মহেশখালীর ইউনিয়ন বড় মহেশখালী’র একটি গ্রাম নাম তার জাগিরাঘোনা , আমার দাদার বাড়ী । একদিকে সমুদ্রের গর্জন, আবার অন্যদিকে নদীর পাড় ঘেঁষে প্যারাবন, সারি সারি আম-কাঁঠাল-নারিকেল-সুপারী-তাল গাছের শীতল ছায়া, বাঁশ ঝাড়, বাবুই-শালিকের তীব্র কলকাকলি সব মিলিয়ে ভীষণ ভালো লাগার এই গ্রাম।
এই গ্রামেরই একটি যৌথ পরিবারে পৌষের এক আমেজি সোনালী রৌদ্দুরে আমার পিতা এস.এ.এম রফিক উল্লাহ’র জন্ম। আমার পিতামহ মকবুল আহমেদ ছিলেন পেশায় মোক্তার, জীবন নিবেদিত সমাজকর্মী। আর দাদী কুলসুম বেগম। উল্লেখ্য , পিতামহ মকবুল আহমেদ ১৯১৯ সালে এন্ট্রান্স (এস.এস.সি সমমান) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মকবুল আহমেদ তৎকালীন শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক প্রবর্তিত ৠণ সালিসি বোর্ড, মহেশখালী’র চেয়ারম্যান ছিলেন।

এস. এ. এম রফিক উল্লাহ।
তিনি একাধারে বড় মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং কক্সবাজার লোকাল বোর্ডের সদস্য ছিলেন। শ্রদ্ধেয় পিতামহ মকবুল আহমেদ মোক্তারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান মহেশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মহেশখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড় মহেশখালী মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতি। তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের অনন্য দৃষ্টান্ত হলো গোরকঘাটা-জনতাবাজার সড়ক নির্মাণ, মহেশখালী দাতব্য চিকিৎসালয় (বর্তমান মহেশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) এবং বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ পানি নিশ্চিতকল্পে পাকা কুয়া খনন।
১৯৩৭ সালের ২রা ডিসেম্বর দুই কন্যার পর প্রথম পুত্র সন্তান লাভে বাড়ীতে মহা উল্লাসের এবং মহাতুষ্টির উপলক্ষ্য হয় । প্রথম পুত্র সন্তান প্রাপ্তিতে দাদী কুলসুম বেগম এর আনন্দ নিশ্চয় সেদিন খরস্রোতা নদীর মত ভেসেছিল। আর দাদা মজেছিলেন প্রবল খুশীর সুখ সন্ধিক্ষণে। আমার পিতার শৈশব কেটেছে নদীবিধৌত পলি মাটি মাড়িয়ে, বর্ষায় কাদামাটি মেখে মাছ ধরে, শীতের মিষ্টি রোদ অবগাহনে, জোনাক জ্বলা রূপালি জোৎস্না রাঙিয়ে, ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে, দীঘির শাপলা ফুল তুলে। অন্যদিকে পিতা মকুবল আহমেদের ছিল সন্তান ঘিরে বহুমাত্রিক আশার স্বপন। তাঁর মানসপটে আঁকা ছিল উচ্চ শিক্ষিত, সৎ, ন্যায় নীতি সম্পন্ন এক সমাজ সংস্কারক পুত্রের প্রতিচ্ছবি। তাই পুত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পড়াশুনার ব্যাপারে দাদার ছিল সুতীক্ষ্ম নজরদারি। তবে তিনি পুত্রের ব্যাপারে যেমন সচেতন ছিলেন তেমনি ছিল ভাই-বোন, আত্মীয় স্বজনের পুত্র-কন্যাদের শিক্ষিত করার তাগিদ। দাদীর কাছে শুনেছি বাবা রফিক উল্লাহ সাহেব অত্যন্ত সহজভাবে গ্রামের মানুষের সাথে মিশতেন এবং তাদের আপন করে নিতেন। আমৃত্যু ছোট খাটো ছিপছিপে পাতলা গড়নের ছিলেন বলে দাদী কুলসুম বেগমের ছিল অন্তহীন চিন্তার বলিরেখা। বাবার ছিল পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধূলার প্রতি বিশেষ ঝোঁক। ফুটবল এবং সাঁতারের প্রতি ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। সাঁতারে পারদর্শীতা তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও প্রতিভাত হয়। পুত্রের কোনো কাজে বাধা না দিয়ে বরং উৎসাহ প্রদান করে দাদা-দাদী বিস্তৃত মানসিকতার পরিচয় দিতেন এবং মুক্ত পরিবেশে সন্তানের বিকাশ ঘটাতে চাইতেন।

শেখ হাসিনার সাথে তৎকালিন এস. এ. এম রফিক উল্লাহ।
অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নিজ পিতৃদেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মহেশখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ণ শেষে তদানন্তীন কক্সবাজার ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৫৪ সালে প্রবেশিকা (এস.এস.সি সমমান) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে ১৯৫৬ সালে আই.এ পাশ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে (সম্মান)স্নাতক এবং ” মিলিটারি সায়েনস ” এ ডিপ্লোমা ডিগ্রী লাভ করেন। পরের বছর ১৯৬০ সালে একই বিদ্যাপীঠ হতে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ঐ বছর সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত রফিক উল্লাহ জেলা এগরিকালচারাল মার্কেটিং অফিসার হিসাবে সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন। সরকারী চাকুরীরত অবস্থায় ১৯৬৮ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন। সেখানে তিনি ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটি হতে এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং বিষয়ে এক বছরের বিশেষ প্রশিক্ষন কোর্স গ্রহণ করেন এবং ১৯৬৯ সালে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি হতে ” কমিউনিকেশন” এর উপর বিশেষ সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেন এবং উক্ত বছরেই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
১৯৭০ এর ১৮ ই জানুয়ারি কক্সবাজারের প্রখ্যাত আইনজীবি জনাব মোমতাজুল হকের জেষ্ঠা কন্যা জনাবা জয়নাব আক্তার বেগম (বুলবুল) এর সাথে পরিনয় সূত্রে আবদ্ধ হন। স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে ১৯৭৩ সালে সরকারী চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে কক্সবাজার আদালতে আইনজীবি হিসাবে যোগদান করেন। কিশোর বয়সেই পিতা রফিক উল্লাহ সাহেবের মধ্যে অধিকার সচেতনতা, সংগ্রামী চেতনা এবং প্রতিবাদী মনোভাবের চারিত্রিক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রগতিশীল রাজনীতির স্বাদ তিনি ছাত্র অবস্থাতেই নেওয়া শুরু করেন।
তাইতো ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে কক্সবাজার ইংরেজী বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় খালেদ মোশাররফের (মুক্তিযুদ্ধের কে ফোর্সের কমান্ডার) নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের অন্যান্য ছাত্রদের সাথে মিছিলে যোগ দেন এবং স্লোগানে স্লোগানে কক্সবাজার শহরকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে প্রকম্পিত করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ পূনর্গঠন-পুনর্জীবনের কার্যকলাপ শুরু হয় তখন আমার পিতা রফিক উল্লাহ সাহেবও সেই কাতারে শামিল হন। বিশেষ করে তরুণ যুবকেরা বুঝতে পেরেছিল এই শেখ মুজিবই।
লেখক: তৌফিক শাকিল।