• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন

করোনা ক্রাইসিস চালচিত্র

নিজস্ব প্রতিদেক / ১৮৪ বার ভিউ
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২০

শাহীন আবদুর রহমান:

হু হু করে বেড়েই চলেছে করোনা রোগী সনাক্তের সংখ্যা। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ভালভাবেই শুরু হয়ে গেছে। সত্যিই এলার্মিং একটা বিষয়। টেস্টিং আরো বাড়লে এই সংখ্যা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বা সত্যিকারের আক্রান্তের সংখ্যা যে কতো সেটা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছি সবাই। তারপরও বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের কোন বিকার নেই। তারপরেও কিন্তু আমরা সরকারি নির্দেশনা, চিকিৎসক, পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা মানছি না।

কেয়ামতের সংক্ষিপ্ত নমুনাও আমরা দেখতে পাচ্ছি ইতিমধ্যে। মারামারি, খুন, ধর্ষন কিন্তু থেমে নেই। আজকাল রাস্তায় মানুষ মরে পড়ে থাকলে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। করোনা সন্দেহে মা’কে বনে ফেলে দিয়ে আসছে প্রাণপ্রিয় সন্তানেরা। হাসপাতালে মৃত্যুর পর লাশ ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে স্বজনেরা। অনেকে আবার এলাকায় নোটিশ জারি করেছে সেখানে কোন করোনা রোগীকে চিকিৎসা দেয়া যাবেনা বা করোনা হাসপাতাল স্থাপন করা যাবে না কিংবা করোনা আক্রান্ত রোগীর লাশ দাফন করা যাবে না।

চিকিৎসক সম্প্রদায় মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল ইতিমধ্যেই মন্দা অবস্থার যুক্তি দেখিয়ে চিকিৎসকদের চাকুরিচ্যুত করেছে। অনেকে আবার কর্মরত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সামগ্রী বা সরঞ্জাম প্রদান করেননি। অনেক চিকিৎসক ও হাসপাতাল আবার করোনা সন্দেহে রোগীর চিকিৎসা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানানোর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এটা আবার বাস্তবতা, কারণ উপযুক্ত পিপিই’র অভাবে কিংবা রোগীর হিস্ট্রি গোপন করে বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করে চিকিৎসা নেবার কারণে ইতিমধ্যেই অসংখ্য চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছেন।

কয়েকটি হাসপাতাল বা হাসপাতালের ওয়ার্ড ইতিমধ্যেই লকডাউন করা হয়েছে। আক্রান্ত হবার পাশাপাশি অজস্র চিকিৎসাকর্মী কোয়ারেন্টাইন এ আছেন। এ নিয়ে সমবেদনার পাশাপাশি বিপরীত চিত্রও আছে। কেউ কেউ আবার ‘কসাই’দের আক্রান্ত হবার সংবাদে উল্লাস প্রকাশও করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সত্যিই সেলুকাস!

করোনা রোগীর চিকিৎসা বা সেবা করার অপরাধে অনেকক্ষেত্রে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে কিংবা আল্টিমেটাম দেয়া হচ্ছে। সেদিন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী কাঁদতে কাঁদতে আমাকে এসে জানাল বাড়িওয়ালা তাকে সপরিবারে বের করে দিয়েছে হাসপাতালের পাঁচ তলায় যেখানে করোনা আক্রান্ত রোগী ছিলেন সেখানে ডিউটি করার সংবাদ পেয়ে। ওসি সাহেবকে ফোন করলাম, শেষমেশ উনার সহযোগিতায় এই শাস্তি থেকে সে রক্ষা পেল। অহরহ ঘটে চলেছে এমনতর ঘটনা।

‘লকডাউন’ এর মানেও আমরা ঠিকমতো বুঝতে পারছি না, কিংবা মানছি না। রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে নিজেরাই দিব্যি ঘুরাফেরা করছি, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছি। চোর পুলিশ বা লুকোচুরি খেলছি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে। মৃত্যুকেও আমরা ফান হিসেবে দেখি, করোনা নিয়ে ট্রল করি, মজা করি। করোনা আক্রান্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন উপায়ে লোকজন বা পণ্যবাহী বাহন আসার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে আবার হোম কোয়ারেন্টাইন মানছে না। আইসোলেশান ওয়ার্ড থেকে রোগীরা পালিয়ে যাচ্ছে। এসব সত্যিই ভাবনার বিষয়।

কক্সবাজার তার ভৌগলিক অবস্থান ও অবস্থা বিবেচনায় অত্যন্ত ভাল পর্যায়ে আছে। এই সময় ও সুযোগ হেলায় নষ্ট করলে চরম মূল্য দিতে হবে আমাদের সবাইকে। আমরা সন্দেহজনক সবাইকে আমাদের নিজস্ব ল্যাবে পরীক্ষা করছি, আইসোলেট করছি। চিকিৎসক সহ সবাই নিরলস নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান করে যাচ্ছি।

এখন সবার দায়িত্ব হচ্ছে নিরাপদে ঘরে অবস্থান করা, প্রতিবেশীদের খোঁজ খবর নেয়া, সাধ্যমতো খাদ্য ও জরুরি সাহায্য প্রদান করা, সন্দেহ জনক রোগীর ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, হিস্ট্রি গোপন না করে সুরক্ষিত চিকিৎসক এর কাছ থেকে চিকিৎসা নেয়া এবং উপদেশ নির্দেশ মেনে চলা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা শিষ্টাচার মেনে চলা। জনসমাগম এড়িয়ে চলুন, ঘরে অবস্থান করেই প্রার্থনা করুন, ধর্মচর্চা করুন, ধর্মান্ধতা পরিহার করুন। অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও আমরা আপনাদের সেবায় কাজ করে যাচ্ছি।

সীমাবদ্ধতাগুলি উপেক্ষা করে অযথা বিরূপ সমালোচনা না করে আমাদের উতসাহ প্রদান করুন, সহযোগিতা করুন, এটুকুই চাওয়া। আপনাদের এটুকু সাপোর্ট পেলে আমরা সফলভাবে করোনা ক্রাইসিস থেকে উত্তরণ লাভ করবো ইন শা আল্লাহ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই চিকিৎসক সহ করোনা যুদ্ধে অবতীর্ণ সবার জন্যে বিশেষ ইন্সেন্টিভ এবং ইন্স্যুরেন্স সহ সম্মানসূচক স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটা বিশাল একটা পাওয়া। কক্সবাজারে জেলা পুলিশ, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ সদর হাসপাতালে যেসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিরলস সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন তাদের প্রতি ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত উতসাহ প্রদান করে যাচ্ছেন, যেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

পরিশেষে সংকটময় এই মূহুর্তে যেসব চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রদানকারী জীবন বাজি রেখে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব সদস্য রাস্তায় রাস্তায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিনরাত নিরলস শ্রম দিচ্ছেন, সাংবাদিক, ব্যাংকার সহ যেসব পেশাজীবি নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন তাদের প্রতি রইল আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

লেখক: প্রধান- জরুরি বিভাগ ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল।

১৪ এপ্রিল, ২০২০. কক্সবাজার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন