• সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
কক্সবাজারের পুত্রবধূ হালিমা খাতুন উপসচিব পদে পদোন্নতি টেকনাফে মাদক মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার ৫৩৩ উপজেলা হাসপাতাল ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী একই জমি দুইবার বিক্রির অভিযোগ : টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রারকে ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজার পৌরসভার অর্থায়নে সেগুনবাগিচায় ৪টি রাস্তা নির্মাণ শুরু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিএনপির করণীয় বিষয়ে যা পরামর্শ দিলেন : ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজ উদ্দীন যে ৫ কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিততে পারে আর্জেন্টিনা! টি-টোয়েন্টি সিরিজেও হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের ইয়াবা পরিবহনের দায়ে রোহিঙ্গা তরুণীর কারাদন্ড নিয়োগ দেবে কারিতাস এনজিও : কর্মস্থল কক্সবাজারের উখিয়া

রামুতে চেয়ারম্যানের নেতৃতে অবৈধ ড্রেজারের তান্ডব

নিজস্ব প্রতিদেক / ১২৩ বার ভিউ
আপডেট সময় : সোমবার, ৩ অক্টোবর, ২০২২

বিশেষ প্রতিবেদক:
দেখলে মনে হবে জলাশয় বা নদী। গভীরতারও মাপকাঠি নেই। শুধু পানি আর পানি। প্রকৃত অর্থে জলাশয় বা নদী নয়। কৃষকের ফসলি জমি কেটে এমন জলাশয় বানানো হয়েছে। তাও আবার জোরজবরদস্তি করে। জমির কাছে ঘেঁষতেই পারছে না কৃষক। রয়েছে প্রভাবশালীদের অত্যাচার। জোর করেই তাদের জমি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নতুবা কৃষকের জমিতে এইসব বালু জমা রেখে ডিপো বানাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ম্যানেজ করে সবকিছুই চলছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের ‘ছত্রছায়ায়’।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার চাকমারকুলসহ বিভিন্ন স্থানে ফসলি জমি ও বাঁকখালী নদীতে নিষিদ্ধ ড্রেজার বসিয়ে বালি উত্তোলন চলছে। উপজেলায় অন্তত শতাধিক ড্রেজার রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে সমানে তোলা হচ্ছে বালি। নির্বিচারে জমির তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করায় ক্ষতির সম্মুখীন কৃষক। নিয়ম বহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন করায় আশপাশের জমি, বাড়িঘর নদীতে বিলিন হচ্ছে। হুমকির মুখে সড়ক, মহাসড়ক ও বিদ্যুত ব্যবস্থা। এতে প্রাকৃতিক ও জলজ পরিবেশের ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের ছত্রছায়ায় একটি বিশাল সিন্ডিকেট প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবত বালু উত্তোলনে প্রায় এক’শত একর খাস জমি ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়েছে। প্রতিবাদ করতে গেলেই উল্টো প্রাণে মারার হুমকি আসে। বালু উত্তোলনকারিদের দাবি, চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রশাসন ‘ম্যানেজ’ করার দায়ীত্ব নিয়েছেন। তার নিজস্ব মালিকানাধীন ১টি ড্রেজারের পাশাপাশি তার অনুমতিতেই চলছে বাকিসব ড্রেজার। তবে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চলছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চাকমারকুল ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় সারিবদ্ধভাবে ড্রেজার নদীতে গর্ত করে পাইপ নিচে বসিয়ে প্রকাশ্যেই বালু উত্তোলনের কাজ চলছে। নদীর চর ও ফসলি জমি থেকে ২০-২৫ ফুট গভীর করে বালু ও মাটি উত্তোলনে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ, সড়ক-মহাসড়ক, বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। উত্তোলিত বালু নির্দিষ্ট জায়গায়সহ মহাসড়কের দু’পাশে মজুদ করায় স্থানীয় জনসাধারনের যাতায়তের পাশাপাশি যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। ফলে যে কোন মুহুর্তে দুর্ঘটনায় প্রাণ হানির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে কলঘর-চাকমারকুল এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে চলছে বিপজ্জনকভাবে ফসলি জমি থেকে বালি উত্তোলন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভূমি কম্পন হলে এলাকা ধসে পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, ‘আমরা কৃষি জমি ও বাড়ি-ঘর নদীতে হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে সরকারের সাহায্য পেতে চাই না। আমরা চাই সরকার দ্রুত এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে আমাদেরকে রক্ষা করুন।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, রামুর বিভিন্ন স্থানে গত ৫ বছর ধরে অবিরাম চলছে ড্রেজার দিয়ে বাঁকখালী নদীর নিচ থেকে বালু উত্তোলন। কৃষি জমি-নদী ও জলাশয়ে ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন শত শত ঘনফুট বালু উত্তোলন চলছে। বেসরকারী একটি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব বালি বিক্রি করা হচ্ছে। অবাধে বালি তোলায় হুমকির মুখে নদীর দু’পাড়ের সিসি ব্লক, সড়ক-মহাসড়ক এবং ৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক খুঁটি।

রামুর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বার বার এ বিষয়টি তোলা হলেও কেউ কর্ণপাত করছে না।’ মাটির তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালি উত্তোলন করায় প্রকৃতি ও জলজ পরিবেশ হুমকির কথা জানান তিনি।

চাকমারকুল এলাকার কৃষকদের দাবি, শতাধিক কৃষক ভূমিহীন হওয়া ও নদীর দু’পাড়ের বসতভিটা বিলিন, বিল্ডিং ফাটল দেখা দিয়ে বসবাসের মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তবে তাদের হাহাকার কেউই শুনছেন না, এমনই অভিযোগ করেছেন সৈয়দ নুর নামের এক কৃষক। তিনি জানান, খাস জমি এবং মালিকানাধীন আবাদি জমি থেকে জোর করে মাটি ও বালু উত্তোলন করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বাঁকখালী নদী থেকে সবচেয়ে বেশি বালু উত্তোলন করছে বালু দস্যুরা।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, চাকমারকুল ইউনিয়নের মিয়াজী পাড়া, নয়া পাড়া, পশ্চিম চাকমারকুল, নতুন চরপাড়া, সালাম্মত পাড়া ও ডেইঙ্গা পাড়া গ্রাম ঘেঁষা বাকঁখালী নদীর আধা কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যে সারিবদ্ধভাবে আদর মিয়া, কামাল উদ্দিন, ছলিম মিয়া, আমিন সিকদার, শাহেদ, জুয়েল, নাছির উদ্দিন সিকদার, মোহাম্মদ উল্লাহ, মোঃ সাইয়েদ, জিয়াবুল সওদাগর, মোঃ সাইফুল ইসলাম, আলা উদ্দীন ও দিদারুল আলমের নেতৃত্বে এইসব ড্রেজার বসিয়ে কৃষিজমি এবং বাঁকখালী নদীর তলদেশ থেকে দিনে রাতে বিরামহীনভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে।

আওয়ামী রাজনীতির ছত্রছায়ায় ভূমিদস্যুরা এন আমল ফিলিং ষ্টেশনের দক্ষিণ পাশের এলাকায় মহাসড়কের সাথে উপসড়ক তৈরী করে খাস জমি এবং মালিকানাধীন ১৭ কানি ফসলি জমির নিচে গভীর ডেজিং করে বালি উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অন্তত ৩শ’ ফুট গভীর করা হয়েছে ফসিল জমি। প্রশাসনের নাকের ডগায় বালি ও মাটি উত্তোলন করে মেক্স কোম্পানির নিকট (রেলওয়ের কাজে ব্যবহৃত) বালি বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করছে স্থানীয় জিয়াবুল সওদাগর নামের একজন। খাস জমি থেকে গভীর করে বালি উত্তোলন করায় ৩০ বিঘা জমির সম্পূর্ণ অংশ ভেঙ্গে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযুক্তরা বলেন, ‘ প্রতিটি ড্রেজারের জন্য ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম এক থেকে দেড় লাখ টাকা করে নিয়েছেন। তিনি বালু উত্তোলনের অনুমতি নিয়েছেন মর্মে আমাদেরকে অভয় দিয়েছেন।’ তার নির্দেশনায় তারা এইসব বালু উত্তোলন করে ব্যবসা করছেন বলে দাবি অভিযুক্তদের।

চাকমারকুল কোনারপাড়া ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন জানান, ড্রেজারের বিকট শব্দে অতিষ্ট এলাকাবাসী। উচ্চ শব্দ দূষণের কারনে ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা এমনকি ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটছে। ইতিপূর্বে ড্রেজার মেশিনের বালু তোলার গর্তে পড়ে লম্বরীপাড়ায় ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

ড্রেজার মেশিনের কারনে রামু উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন উল্লেখ করে পরিবেশবাদী জানান, প্রশাসনের দায়সারা অভিযান কোনভাবে নিষিদ্ধ ড্রেজার বন্ধ করা সম্ভব নয়। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, প্রশাসনের অভিযানে দু একজন শাস্তির আওতায় আসলেও বাকিদেরকে অদৃশ্য কারনে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। জেল-জরিমানা করে গনহারে শাস্তির আওতায় আনা গেলে এসমস্ত নিষিদ্ধ ড্রেজার সমূলে উৎখাত সম্ভব হবে জানান পরিবেশবাদীরা।

অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, ইজারাদারের অংশীদার হিসেবে ইউএনও তাকে ৪টি ড্রেজার মেশিন বসানোর অনুমতি দিয়েছেন বলে দাবী করেন। ড্রেজার বসানোর ইউএনও’র লিখিত কোন অনুমোদন আছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা মুস্তফা বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো হবে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন