ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক:
জমি বিক্রির খবর কানে আসামাত্র কেনার জন্য ছুটে যায় মো. কালা মিয়া মাঝি ও ফাতেমা বেগম ওরফে ফাতে দম্পতি। অথচ কাজ করেন ঢালাই মিস্ত্রি হিসেবে। বৈধ আয়ের উৎস এটি। সাইনবোর্ডে তাদের একমাত্র আয়ের পথ ঢালাইয়ের কাজ হলেও নিরবে চলে অবৈধ মাদক কারবার। এ ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে গড়ে তুলেছে বাড়ি। পরিবারের সদস্যদের নামে কিনেছে প্রচুর জমি-জমা। বন্ধক নিয়েছেন সুপারি বাগানসহ অন্তত ১০ একর জমি। এ দম্পতির বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ডেইঙ্গাপাড়ায়। কালা মিয়া একই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসার আগে কালা মিয়া প্রায় দুই যুগ ধরে ঢালাই মিস্ত্রী হিসেবে কাজ করছেন। বাবা মোহাম্মদ হোসেন প্রকাশ আইট্ট্যা মাছন ছিলেন দিন মজুর। পাশাপাশি কৃষি কাজে ব্যবহৃত লাঙ্গল-জোয়াল ও মই তৈরি করে হাটে বিক্রি করতেন। অভাবের সংসারে পাড়া-লেখা করাতে পারেনি কোনো ছেলে-মেয়েকে। এমনকি নিজের নামও লিখতে না জানা কালা মিয়া মাদকের টাকা ছিটিয়ে ভাগিয়ে নিয়েছেন জনপ্রতিনিধির পদও। এমনিই অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, কালো টাকার কাছে সাধারণ ভোটাররা বিক্রি হয়ে যাওয়ায় কালা মিয়ার মতো নিরক্ষর এবং মাদকে অভিযুক্ত ব্যক্তিই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে কয়েকগুণ। নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে তাদের। অফিসিয়াল কোনো কাজে সামনে আসেনা ইউপি সদস্য কালা মিয়া।
স্থানীয়রা জানান, কালা মিয়াসহ তার অপরাপর ভাইয়েরা ছোট বেলা থেকে বনের কাঠ কেটে বাজারে লাকড়ি বিক্রি করতেন। পরে ঢালাই শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রায় দুই যুগ ঢালাইয়ের কাজ করে জীবিকানির্বাহ করেন কালা মিয়া। তার অন্যান্য ভাইয়েরা এবং বাবা এখনো দারিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করে দিনাতিপাত করছেন। হঠাৎ বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে কালা মিয়া শ্বাশুড়ির মাধ্যমে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে দিয়ে করান মাদক ব্যবসা। প্রথমে ছোট ছোট চালানের মাদক কারবারেই ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা। গড়ে তোলেন অঢেল সম্পদ। এখন রাজারকুলসহ আশেপাশের এলাকায় মাদকের গডফাদার হিসেবে এক নামে পরিচিত কালা মিয়া মাঝি। এই দম্পতির হাতেই ওই এলাকার মাদকের একক নিয়ন্ত্রণ।
স্থানীয়দের দাবি, নির্বাচনের সময় প্রতিটি নারী ভোটারদের হাতে একটি করে স্বর্ণের নাক ফুল দিয়ে ভোট ভাগিয়ে নিয়েছেন। শিক্ষাদিক্ষা না থাকায় যে কোনো সামাজিক এবং অফিসিয়াল কাজ নানা অজুহাতে এড়িয়ে যান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, নাম কিংবা স্বাক্ষর কোনটাই দিতে জানেন না এই জনপ্রতিনি। ফলে সেবাপ্রার্থীরা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজারকুল ৬নং ওয়ার্ডের ডেইঙ্গাপাড়া গ্রামে রাস্তার পাশে একটি জমি তিনবার কিনে বানিয়েছেন একটি আলিশান বাড়ি। বাড়ি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। তার নামে সিএনজি কিনেছেন ২০টি। বাড়ির পাশেই প্রায় দেড় বিঘার একটি বিশাল সুপারি বাগান নিয়েছেন লিজে। বাড়ির সামনে ৫ গন্ডা জমি কিনেছেন ৬ লাখ টাকায়। ছাগলকাটা এলাকায় পাকা রাস্তার ধারেই ক্রয় করেছেন সোয়া ১০ গন্ডা জমি। যার মূল্য ১০ লাখ টাকা। বিভিন্ন এলাকায় নামে বেনামে বন্ধক নিয়েছেন অন্তত ১০ একর জমি। সেখানে ১ কোটি টাকার বেশি খরচ করেছেন। সম্প্রতি পন্জেখানা এলাকায় ফকির আহমদের কাছ থেকে ১০ গন্ডা, কাঠালিয়ার ডেপা এলাকায় রশিদ আহমদের কাছ থেকে ২০ গন্ডা এবং ডিয়াং পাড়ার মেহের আলীর ছেলে জনু মিয়ার কাছ থেকে কিনেছেন ৫ গন্ডা। কিছুদিন আগে বাজাজ পালসার ব্র্যান্ড্রের আড়াই লাখ টাকা দামের একটি বাইকও কিনেছেন, কিনেছেন ৩০ লাখ টাকা দিয়ে ১৫ গন্ডা জমি। কৃষি-ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের রামু শাখায় নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা জমা রেখেছেন বলেও একাধিক প্রতিবেশি দাবী করেছেন। নির্বাচনে খরচ করেছেন অন্তত ২০ লাখ টাকা। এছাড়াও নামে-বেনামে রয়েছে বিভিন্ন সম্পত্তি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, নগদ অর্থ কালু নিজের কাছে রাখেন না, রাখেন বিভিন্ন জনের জমি বন্ধক রেখে। ব্যবসার টাকার হিসাব থাকে তার অধীনে। কালা মিয়ার মাদক ব্যবসার লক্ষাধিক টাকার আদান-প্রদান হয় বিকাশের দুটি এজেন্ট ও কয়েকটি ব্যক্তিগত নম্বরের মাধ্যমে। তার বাড়িতে কয়েক লক্ষাধিক টাকা নগদ গচ্ছিত রাখেন তিনি। প্রশাসনিক হয়রানি কিংবা গ্রেফতার এড়াতে ওই মোটা অংকের অর্থ নিজ হেফাজতে রাখেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিতে এখনো কাজ করেন ঢালাই মিস্ত্রি হিসেবে। জনসেবার নানা কাজে যোগানদাতা হিসেবে চৌকিদার ইউনুচ রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, উখিয়া টেকনাফ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে শ্বাশুড়ির মাধ্যমে তার বাড়িতে মজুত করেন। পরে স্ত্রী ফাতেমা স্থানীয় খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের দিয়ে তা বিক্রি করান। কিছুদিন আগে মোবাইল বন্ধক রেখে হারুল নামের এক খুচরা মাদক বিক্রেতার কাছে ইয়াবা বিক্রি করে। ভুলবশত সেই মোবাইল পরে আরেকজনকে দিয়ে দেওয়ায় মাদক বিক্রির বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর থেকে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বগুড়াসহ দেশের বিভিন্নস্থানে মাদক পাচার করে আসছেন এই দম্পতি।
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরিষদের আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে কালা মিয়ার স্ত্রীর মাদক বিক্রির কথাটি একাধিকবার আলোচনা হয়। রহস্যজনক কারণে তার নামে কোনো মামলা বা অভিযোগ হয়নি কোথাও। প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার পর রাতে কালা মিয়া বাড়িতে থাকতেন না বলে জানান এই জনপ্রতিনিধি। তার দাবি, মেজর সিনহা হত্যার পর বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় তিনি মাদক ব্যবসায় স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন। রয়েছেন ঝামেলামুক্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্মাণ কন্ট্যাক্টার বলেন, কালা মিয়া আমার অধীনে দীর্ঘদিন শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। হঠাৎ করে তার এমন সফলতা দেখে বিস্মিত হয়েছি। আমি দেড়যুগ ঠিকাদারি কাজ করছি; অথচ তার চারভাগের এক ভাগ সম্পত্তির মালিক হতে পারিনি। কালা মিয়া একজন চিহ্নত ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে মন্তব্য করেছেন এই ঠিকাদার।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কালা মিয়া ঢালাই কাজের আড়ালে চালান মাদক ব্যবসা। স্ত্রী-শ্বাশুড়ির মাধ্যমে পাচার করছেন মাদক। স্ত্রীকে দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করেন ইয়াবা। এসব গোপন কাজে কালা মিয়ার একমাত্র সহযোগী তার স্ত্রী ফাতে।
এখানেই শেষ নয়, জনপ্রতিনিধি হলেও নিরক্ষর হওয়ায় জনসেবামূলক কোনো কাজে তার সম্পৃক্তা থাকে না। ইউপি সদস্য কালা মিয়া হলেও পরিষদের যে কোনো কাজ করছেন চৌকিদার ইউনুচ। তাই যে কোনো সেবা পেতে বিপুল টাকাসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হয় চৌকিদার ইউনুচকে। প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে এইসব করছেন তিনি। এমনকি নিজের মাদক ব্যবসার সুদৃঢ়তার লক্ষ্যে ওয়ার্ড মেম্বার পদে নির্বাচন করে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর।
রামু উপজেলার অফিস সূত্র জানান, মাদক যেন তার পারিবারিক ব্যবসা। গেল নির্বাচনে মাদকের টাকায় জনপ্রতিনিধির পদ ভাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। উপজেলা অফিসে যেকোন আইনশৃঙ্খলা মিটিং কিংবা সভা-সেমিনারে তার উপস্থিতি চোখে পড়েনা। মাঝেমধ্যে এখানে তাকে দেখা গেলেও অংশগ্রহণ করেন না।
নির্বাচনে ৮/১০ লাখ টাকা খরচ, আগে ২০ টি সিএনজি থাকলেও কিস্তি শেষ হওয়ায় বর্তমানে তার ১০ টি সিএনজি রয়েছে ও কয়েকটি জমি কেনার কথা স্বীকার করে প্রতিবেদককে কালা মিয়া বলেন, মাদক ব্যবসায় নয় পরিশ্রম করে এইসব করেছি। ঢালাই কাজে কোন কোন দিন ৫০ হাজার টাকাও আয় করেছেন বলে দাবী করেন এই জনপ্রতিনিধি।
সামান্য ঢালাইয়ের কাজ করে এতো সম্পদ অর্জন করা কিভাবে সম্ভব জানতে চাইলে তিনি কোনো সদোত্তর দিতে পারেন নি। তার দাবি, স্থানীয় প্রতিপক্ষের লোকজন তার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন।
কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, মাদকের শিকড় যত গভীরে থাকুক আমরা খোঁজে বের করব। এছাড়াও কেউ যদি তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেন তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হবে।