কক্সবাজার সদরের বাংলাবাজারে এক দুর্ধর্ষ প্রতারকের আভির্ভাব ঘটেছে। তার ভয়ানক প্রতারণা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মান্যগণ্য ব্যাক্তি থেকে শুরু করে সমাজের বিত্তশালী পরিবার কিংবা দিনমজুর সবাই তার একের পর এক শিকারে পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বাক্ষর জালিয়াতি, প্রতিবেশীর জমি দখল, বিভিন্ন মালামাল লুটপাট, নারীদের সাথে প্রতারণা-নির্যাতন, নানা প্রলোভনে ফেলে টাকা আত্মসাৎ করাসহ এমন কোনো দুঃসাহসী অপকর্ম নেই যা সে করেনি ইতিমধ্যে। এমনকি নিজেকে একজন বিএনপি সরকারের সাবেক সাংসদের সাথে তার বিশ্বস্ত তল্পিবাহক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে এই প্রতারক। থানা অথবা জনপ্রতিনিধিদের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে জমা পড়লেও সেসব ব্যাপারে একেবারেই বেপরোয়া এই দুর্ধর্ষ প্রতারক।
বাড়ির পাশ্ববর্তী পড়ে থাকা অন্যের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সমাজের নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীদের সর্বনাশ করা, নানা প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের টাকা আত্মসাৎ করে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কীভাবে সেগুলোতে রেহায় পেতে হয় সেটাও সে ভালো মতোই রপ্ত করেছে। আর এভাবে দিনে দিনে দুর্ধর্ষ হয়ে উঠছে সে। তার শিকারের থলিতে একের পর এক যুক্ত হচ্ছে ভুক্তভোগীর নাম। দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্তদের তালিকা।
এতক্ষণ যার কথা বলা হচ্ছে তিনি হলেন- কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মধ্যম মুক্তারকুল এলাকার নুরুল হকের ছেলে সাবেক ছাত্রদল নেতা দিদারুল আলম।
গত কয়েক বছরে তার বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে প্রতারণা করার পাহাড়সম অভিযোগ জমা পড়েছে প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গের কাছে। স্থানীয় বিচার-শালিসকারকদের কথাতো দুরের কথা; প্রশাসনের কাউকে পাত্তা না দিয়ে এরপর আবারও শুরু করে সেই পুরোনো কৃত্তিকলাপ। রোহিঙ্গাসহ বিয়েও করেছেন ৪টি।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি পক্ষের ইন্ধনে যখন যেভাবে ব্যবহার হওয়ার হয়ে আসছে এই দুর্ধর্ষ প্রতারক দিদারুল আলম। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গন্যমাণ্য সমাজপ্রতিদের সাথে পেরে উঠা এই প্রতারকের সাহস এখন আকাশচুম্বি। প্রসাশনসহ জনপ্রতিনিধিরা যেখানে নস্যি সাধারণ মানুষ তার কাছে কিছুই নয়।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, খরুলিয়া মৌজার ৩৪৩ খতিয়ানে হাবিব আহমদ নামের এক ব্যাক্তির সাড়ে ৮ শতক জমি রয়েছে। তিনি মারা যাওয়ার পর পৈত্রিক সূত্রে জমিটির মালিক হন তার ছেলে আবু বক্কর। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণে (খালি পড়ে থাকায়) জমিটির উপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে প্রতারক দিদার ও পিতা নুরুল হকের।
এরপর পিতা-পুত্র মিলে জোরপূর্বক আবু বক্কর গংয়ের জমির লক্ষাধিক টাকার গাছ কেটে নেন। আবু বক্কর গংরা বাধা-নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা জমি দখল করে বসতবাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করে বর্তমানে সেখানে বসবাস করে আসছে দীর্ঘ বছর ধরে। এরপর থেকে জমির মুল মালিকরা জমি ফেরত পেতে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের ধারস্ত হয়েও কোন প্রতিকার পাননি। উল্টো হত্যার হুমকি দেন প্রতারক দিদার ও তার পরিবারের অপরাপর সদস্যরা। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জমির মালিক আবু বক্করের ছেলে ভুক্তভোগী নাছির উদ্দিন কক্সবাজার সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
এ ব্যাপারে আবু বক্করের ছেলে নাছির উদ্দিন বলেন, আমার দাদার কাছ থেকে পৈত্রিক সূত্রে আমার বাবা জমিটি পেয়ে থাকে। দিদারের পিতা নুরুল হক একজন মামলাবাজ নামে পরিচিত। তিনি ক্ষমতার প্রভব খাটিয়ে আমাদের জমিটি দখল করে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছে। তাদের নামে ওই জমির রেজিস্ট্রেশনকৃত কোনো দলিল কিংবা একটি সাদা কাগজও নেই। জমিটি উদ্ধার করতে নানান জায়গায় অভিযোগ করলে তার কোন কাগজপত্র না থাকার কারণে সেখানে তিনি হাজির হন না। উল্টো বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন।
নাছির আরোও বলেন, বসতবাড়ির পাশ্ববর্তী হওয়ায় তারা আমাদের জমির গাছ আত্মসাতের পর জোরপূর্বক বাড়ি নির্মাণ করছেন। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পাশে থাকা খালি জমিও বেদখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নাছিরের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক ইউপি সদস্য আমিন মেম্বার বলেন, দিদার মেম্বার, স্থানীয় গন্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গসহ আমরা গত বছর একটি শালিসি বৈঠকে বসেছিলাম। জমির যাবতীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখেছি, সেখানে দিদার ও তার বাপ-দাদার নামে কোন জমি নেই। দিদার যেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছে সেটিও মুলত নাছির গংদের জায়গা। এতে আমরা একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম; হয়তো জমিটি কিনে নিতে হবে; নতুবা তাদের কাছে জমিটি ফেরত দিতে হবে। এরপর থেকে দিদারের কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
আমিন মেম্বার আরোও বলেন, বিষয়টির কোন প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগী নাছির গত সপ্তাহে আমাদের ধারস্ত হয়। আমরা পুনরায় দিদারকে ফোন দিলে ধরেনি। ডেকে পাঠালেও তা কর্ণপাত করেনি। দিদার বড় প্রতারক মন্তব্য করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রসাশনের প্রতি আহবান জানান সাবেক এই ইউপি সদস্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছোটবেলা থেকে প্রতারণা করাই দিদারের নেশা ছিলো। সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। দিদারের ব্যবসা প্রতিষ্টানে অংশীদার করার আশ্বাস দিয়ে জাফর আলম প্রকাশ পালং জাফর নামের একজনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা মেরে দিয়েছেন। প্রতারক দিদার তার বিভিন্ন ব্যবসা আছে বলে মানুষের সাথে সখ্য গড়ে তোলে। পরে সে অধিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তার ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে বলে। বিনিয়োগের টাকা নিয়ে পরে আত্মসাৎ করে সে। এভাবে তিনি শতাধিক লোকজনকে পথে বসিয়েছেন।
সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গা ঢল আসার পরে কিছুদিন এনজিওতে চাকুরি নেন প্রতারক দিদার। এনজিওর সাইনবোর্ড ব্যবহার করে নিজেকে বড় মাপের একজন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অপরাধের ভাগাড়ে বসে পড়েন তিনি। যদিওবা সেখানে বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি দিদার। এভাবে কিছুদিন যেতে না যেতে সেখানে নারী কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎসহ নানা দুর্নীতির দায়ে চারকিচ্যুত করা হয় তাকে।
একাধিক ভুুক্তভোগী বলেন, কারো সাথে পরিচয় হওয়ার পর দিদার নিজেকে বড় ব্যবসায়ী ও এনজিও কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। পরিচয়ের পর বিভিন্ন সময়ে সে নিজেকে একজন এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসায়ী, নিজের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি টাকা এফডিআর হিসেবে জমা রয়েছে ইত্যাদি বলে নিজেকে কোটিপতি হিসেবে জাহির করে। একই সাথে সে নম্র ও ভদ্র আচরণ করে নিজেকে একজন সৎ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও এনজিও কর্মকর্তা হিসেবে সবার কাছে নিজের বিশ্বস্ততা স্থাপন করে। একপর্যায়ে তার ব্যবসার জন্য উচ্চ হারে লভ্যাংশ প্রদানের শর্তে টাকা বিনিয়োগ করতে বলে। তার পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে অনেকে এখন নিঃস্ব হয়ে পথে পথে ঘুরছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, আগামী নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসবেন এমন ধারনা থেকে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে চিহ্নিত প্রতারক দিদার। যার উপদ্রবে এখনও আঁৎকে ওঠেন সহস্র ভুক্তভোগী। ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন শতাধিক হক্বদার জনসাধারণ। জমি ও টাকা উভয় হারিয়ে পথে বসেছেন অনেকেই।
দিদারের গড়ে তোলা অপকর্মের বিশাল মরুভূমিতে পা চালাতে গিয়ে কেউ ছুটেছেন মরীচিকার পেছনে; আবার কেউ ঝরিয়েছেন চোখের জল। অবশ্য এবার এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আশীর্বাদে সেসব ভুক্তভোগীর কান্না ও চোখের জল যেনো প্রতারণার বিশাল মরুভূমির মাঝে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে নামবে এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
এবিষয়ে জানতে অভিযুক্ত দিদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে জায়গা-জমি দখল, বিচার শালিসের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে শাসিলকারকদের নামসহ বিভিন্ন পাওনাদারের বিষয়ে দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে কেউ তার কাছ থেকে কোন টাকা পাবেনা দাবি করে তিনি বলেন, জায়গা-জমি নিয়ে আগামী শনিবার ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদে বৈঠকের কথা রয়েছে। এরআগে কোনদিন বিচার শালিস হয়নি এবং তিনি কিছুই জানেন না দাবী করে দিদার বলেন, আমি একজন দায়ীত্বশীল সমাজ সেবক; সংগঠনের সাথে লিপ্ত ও বাংলাবাজার মডেল গার্লস হাইস্কুলের ডাইরেক্টর। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তারা আমার আত্মীয়। মুলত এরাই আমার বিরুদ্ধে এইসব ষড়যন্ত্র করছেন।