• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

তিন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রামুর তেচ্ছিপুলের ইয়াবা কারবার

নিজস্ব প্রতিদেক / ৮৭৯ বার ভিউ
আপডেট সময় : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০

শাহীন রাসেল:

মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে কক্সবাজারের রামু উপজেলার তেচ্ছিপুল। ইয়াবা ও গাঁজাসহ প্রায় সব ধরনের মাদকদ্রব্য মিলছে হাতের নাগালেই। রামু কলেজের ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠেছে মাদকের বিস্তীর্ণ জাল। ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রামু সরকারি কলেজের শিক্ষার পরিবেশ।

এছাড়াও চাকমারকুল-ফতেখারকুল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী হওয়ায় অনেকটা ভৌগোলিক সুবিধার কারণেই মাদকের ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ-তরুণীরাও। মাদকের কারণে এ এলাকায় বাড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী আটক হলেও মাদকের ভয়াবহতা কমছে না।

একদিকে মহাসড়ক অন্যদিকে বাঁকখালী নদী থেকে নদীপথে যাতায়াত করার সবচেয়ে নিরাপদ রুট হিসেবে মাদক ব্যবসায়ীরা কলঘরের নতুন ব্রিজটি বেছে নেওয়ার কারণে এ এলাকাটি মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া এ এলাকার উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের বেশির ভাগই প্রবাসী ও ব্রিক ফিল্ড ব্যবসায়ী থাকায় এইসব পরিবারকে টার্গেট করে মাদক ব্যবসায়ীরা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের রমরমা ব্যবসা। আবার তাদের পরিবারের সদস্যরাও জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়।

শুধু তাই নয়, আশেপাশে অর্ধশত ব্রিক ফিল্ড থাকায় সেখানে নিয়মিত কয়েক হাজার কর্মরত শ্রমিক থাকে। ফলে তেচ্ছিপুল এলাকাটি মাদকসেবীদের পাশাপাশি বেড়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের সংখ্যা। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। এলাকার উঠতি বয়সী তরুণদের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত করা হচ্ছে বলে স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি স্থানীয় সচেতন মহল ও জনপ্রতিনিধিরা মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে প্রশাসনের কাছে প্রতিকার চান।

জানা গেছে, রামু উপজেলার দুইটি ইউনিয়নই মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দুই ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী তেচ্ছিপুল এলাকার। এখানে প্রভাবশালী ও অর্থশালী কয়েক ব্যক্তি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। প্রভাবশালী মহলটি শতাধিক তরুণ-যুবকদের দিয়ে মাদক ব্যবসা করাচ্ছে। এসব তরুণ দামি দামি মোটরসাইকেল নিয়ে চলাফেরা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তেচ্ছিপুল গ্রামে ৩টি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করছে এই এলাকার মাদক ব্যবসা। এদের মধ্যে প্রথমে রয়েছে মৃত গোলাম আকবরের ছেলে নুরু, প্রকাশ নুরাইয়া, রাকিব, সামশুল আলম চৌকিদার ও মনজুর আলমসহ ৬ ভাইয়ের পারিবারিক সিন্ডিকেট। এদের প্রত্যেকের রয়েছে মাদকের মামলাও। সপ্তাহখানেক আগে মনজুর ৪ হাজার ইয়াবাসহ চট্টগ্রামে আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকলেও থামছে না এর বিস্তার।

কারণ মাদক বিক্রি সিন্ডিকেট পরিচালিত হয় এদের পরিবারকেন্দ্রিক। একজন আটক হলে অন্য সদস্য এর হাল ধরে। এতে নানা অভিযানের মধ্যেও অবাধে চলছে মাদক বিক্রি। এছাড়া ইয়াবার চালান সহজ করতে ইয়াবা ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তাদের দুই বোন টেকনাফের দুই মাদক ব্যবসায়ীর সাথে বিয়েও দেয়। এদের বাড়ীতে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে ইয়াবা বিক্রি ও সেবন। এতে এলাকাবাসী রীতিমতো অতিষ্ঠ।

দ্বিতীয় সিন্ডিকেটের শীর্ষে রয়েছে আব্দুল গফুরের ছেলে নাছির যে কিনা এক বছর আগেও এলাকার বিভিন্ন টেইলার্সে দর্জির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে তার কোন দৃশ্যমান ব্যবসা ছাড়া রাজকীয় জীবন-যাপন আর প্রতিমাসে মোটরসাইকেলের মডেল পাল্টানো দেখে রীতিমত অবাক করেছে স্থানীদের। তবে তার প্রধান সহযোগী হিসেবে মৃত নুরুল ইসলাম ড্রাইভারের ছেলে কায়সার কাজ করছে বলে একাধিক সুত্র দাবী করেছে।

এদিকে তৃতীয় সিন্ডিকেটে মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে এক ডজন মামলার আসামি মাদক ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের ও নুরুল হাসিম। এরা বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হলেও স্ত্রী ও মেয়ে আব্দুল কাদেরের মাদক ব্যবসা চালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু তেচ্ছিপুলের প্রত্যন্ত এলাকাই নয়, এই সিন্ডিকেটগুলো মাদক নিয়ে কক্সবাজার জেলাসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন। মাদক বিক্রি করে অনেকেই রাতারাতি বিশাল অর্থ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। মাদক ব্যবসা করে অল্প সময়ের মধ্যে টাকা হাতে আসায় অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে নানা অসামাজিক কর্মকান্ডে। ফলে এ এলাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে অপরাধমূলক কাজ। মাদকের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নারী নির্যাতন, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড তেচ্ছিপুলে বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তাক আহাম্মদ বলেন, এই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে তিন সিন্ডিকেট অবাধে মাদক ব্যবসা করে আসছে। আর এসব চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের প্রকাশ্য অবাধ বিচরণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছে না। আর প্রশাসনও এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

তিনি আরোও বলেন, এদের বাড়ীসহ বেশ কিছু দোকানপাটেও চলছে মাদকের ব্যবসা। আর ওইসব বাড়ী ও দোকান থেকে মাদকসেবীরা ইয়াবা ক্রয় ও সেবন করছে। মাদক বিক্রেতা বা ব্যবসায়ীরা ইদানীং তাদের বাড়ির ভেতরে মাদক বিক্রির নিরাপদ আস্তানা গড়ে তুলেছে। তিনি মাদক ও সন্ত্রাস বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী সচেতন গ্রামবাসীরা বলেন, এসব মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে গোপনে বিভিন্ন দপ্তরে বলা হলেও অজ্ঞাত কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাকমারকুল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তেচ্ছিপুল এলাকাটি মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানা হিসেবে বিবেচিত। এখান থেকেই মূলত উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি হয়ে থাকে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা কমিশনের ভিত্তিতে শতাধিক ছাত্র, তরুণ-যুবককে মাদক ব্যবসার সাপ্লায়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই তিন সিন্ডিকেটের সঙ্গে বেশ কিছু নারীও জড়িত রয়েছেন। যারা বড় ধরনের চালান এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার কাজে সহায়তা করে থাকে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহকারী পরিচালক সুমেন মন্ডল বলেন, তাদের বিষয়ে আমাদের একটি টিম কাজ করছে। এর আগে আমরা বিভিন্ন এলাকার অনেক মাদক ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের গ্রেফতার করেছি। মামলা দিয়েছি। এখনো অভিযান অব্যাহত আছে।

রামু থানার নবাগত ওসি কে এম আজমিরুজ্জামান জানান, মাদকের বিরুদ্ধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। দ্রুত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান শুরু হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন