• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন

ছয়দফার প্রচারাভিযানে কক্সবাজার

নিজস্ব প্রতিদেক / ৭২৬ বার ভিউ
আপডেট সময় : শনিবার, ৬ জুন, ২০২০

রাশেদুল ইসলাম:

জনমত সৃষ্টি ও সংগঠন গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কক্সবাজার মহকুমার বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ করার উদ্যোগ নিলাম। একদিন আমি ও বন্ধুবর নূর আহমদসহ আমরা ক’জন উখিয়া স্টেশনে গিয়ে আলাপ করার জন্য একটা জায়গায় খুঁজলাম।

কিন্তু আমাদের বসার এবং আলাপ-আলোচনার সুযোগ দিতে আগ্রহী তেমন কাউকেও পাওয়া গেল না। আমরা যখন প্রধান সড়কে পায়চারী করছিলাম, তখন হঠাৎ করে ঠাণ্ডা মিয়ার সাথে দেখা হলে তিনি আমাদের উখিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্য কী জানতে চাইলেন।

আমরা তাঁর কাছে সব কথা খুলে বললাম। তিনি তাড়াতাড়ি করে নতুন তৈরি করা একটি দোকান খুলে দিয়ে সেখানে আমাদের বসার জন্য চাটাইয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং বললেন যে, এটা তাঁরই দোকান এবং যতক্ষণ ইচ্ছা সেখানে আলাপ-আলোচনা ও বৈঠক আমরা চালিয়ে যেতে পারি। ঠাণ্ডা মিয়া আমাদেরই মত তরুণ এবং সম্ভবত তখন তিনি এমএসসি পাশ করেছেন।

যদ্দুর মনে পড়ে তিনি ভাসানী-ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরেরও অধিককালে আগের এই ছোট্ট ঘটনার কথা এবং ঠাণ্ডা মিয়ার রাজনৈতিক উদারতার কথা মনে পড়ে। তাঁকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

আমরা মহেশখালীতে একটি সভা করার শলাপরামর্শ করে বন্ধুবর অ্যাডভোকেট মওদুদ আহমদকে নির্ধারিত তারিখের এক দিন আগে মহেশখালী পাঠিয়ে দিলাম। মওদুদ সাহেব মহেশখালী যাওয়ার পরদিন নূর আহমদ সাহেব ও আমি জনসভা করার উদ্দেশ্যে মহেশখালী পৌঁছলে তিনি আমাদের দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিক একটি মাইকযোগে মিটিং এর প্রচারণা শুরু করিয়ে দিলেন।

আমরা গিয়ে তাদের বাড়িতে উঠলাম। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া পরে অল্পক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা বড় মহেশখালী মাঠের পাশে একটি দোকান ঘরে বসে মাইকে প্রচারণা শুনলাম এবং পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে আছরের আজান হলে মওদুদ সাহেব বললেন, নামাজের পরেই মিটিং শুরু করবেন।

সভাস্থলে মাইক টাঙানো হল এবং নামাজ শেষে মুসল্লীরা বেরিয়ে আসছে দেখে কিছু ছাত্র-যুবক-জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সভা সফল করার উদ্দেশ্যে শ্লোগান তুলল, ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব; তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ; তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।’ শ্লোগানে শ্লোগানে যখন সভাস্থল মুখরিত হচ্ছিল, তখন লক্ষ্য করলাম লাঠি হাতে মোল্লা গোছের ৫-৭ জন লোক সভা মঞ্চের দিকে ছুটে আসছে সভা পণ্ড করে দেয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে।

তাদের অনুরোধ করলাম তারা যেন মঞ্চের দিকে না আসে এবং জানতে চাইলাম আমাদের অপরাধ কী? একজন চিৎকার করে জবাব দিল এখানে আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব শ্লোগান দেয়া যাবে না। শ্লোগান দিতে হবে ‘আমার নেতা তোমার নেতা বিশ্বনবী মোস্তফা।’

আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘তাঁরা মৌলভী ফরিদ আহমদ, খতিবে আযম মৌলানা ছিদ্দিক আহমদ, চৌধুরী মো. আলী এদেরকে নেতা বলেন এবং তাদের নামে জিন্দাবাদ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। সেটি যদি অপরাধ না হয়, তাহলে আমাদের নেতা শেখ মুজিব শ্লোগান হলে তা নিয়ে প্রতিবাদ হবে কেন?

আমি বললাম, বিশ্বনবী মোস্তফা রাহমাতুল্লাহ আ’লামীন, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি জগতের রহমত হিসেবে নাযিল করেছেন। সেই মহান পুরুষকে রাজনৈতিক মাঠের নেতার পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হলে এতে করে আল্লাহর রাসুলকে অপমানিত করা হবে, তাকে ছোট করা হবে।কিন্তু তারা আমার কথা না শুনে ক্রমশ মাইকের কাছে চলে এসেছে।

ওই সময় বন্ধু অ্যাডভোকেট মওদুদ আহমদ হঠাৎ আমার হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অকথ্য গালিগালাজ করে ওই সমস্ত লোকদের বললেন, এক পা অগ্রসর হলে তাদের মাথা ভেঙ্গে যাবে।

মওদুদ সাহেবের শোর চিৎকারে তখন অনেক লোক সভাস্থলের পাশে এসে জড়ো হয়েছে এবং উপস্থিত জনগণও আমাদের সভা শুনতে আগ্রহী এটা বুঝতে পেরে মুসল্লিরা পশ্চাদপসারণ করতে শুরু করল। মওদুদ সাহেবকে মাইক ছেড়ে দিয়ে আমাকে ও নুর আহমদ সাহেবকে বক্তৃতার সুযোগ দিতে বললে তিনি বললেন, আপনারা বসে থাকেন। আমি বক্তৃতা করব।মওদুদ সাহেব তার জীবনের প্রথমবার মঞ্চে দাড়িয়ে জনতার উদ্দেশ্যে দীর্ঘক্ষণ জ্বালাময়ী বক্তৃতা করলেন।

আগে তাকে কোন সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করতে বললে তিনি রাজি হতেন না, ঐদিনের ঘটনার মধ্যদিয়ে মওদুদ সাহেবের হাঁটু কাঁপানির সমাপ্তি ঘটে এবং এরপর তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন মাঠে ময়দানে সাবলীল ভাষায় সুন্দর বক্তৃতা করতেন। মওদুদ সাহেব ঐদিন একটানা এক ঘন্টার বেশি সময় ধরে বক্তৃতা করেন এবং বিপুল শ্রোতার সমাবেশ ঘটে।

এশারনামাজের পর নুর আহমদ সাহেব ও আমি একজন ৬ দফার দফাওয়ারী ব্যাখ্যা জনতার সামনে তুলে ধরি অপরজন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমরা প্রত্যেকেই এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে বক্তৃতা করি। রাত সাড়ে ১০ টায় জনসভা শেষ হলে দেখা গেল প্রায় ৫-৭ হাজার লোকের উপস্থিতিতে একটি সফল ও সার্থক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণ আমাদের উত্থাপিত দাবি-দাওয়া, শোষণ-বঞ্চনার চিত্র উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।

আমার বাবা অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম এর “বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও আওয়ামীলীগ বিরোধী রাজনীতি” বই থেকে নেয়া।

লেখক: প্রয়াত অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের ছেলে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন