• মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন
শিরোনাম
কক্সবাজারের পুত্রবধূ হালিমা খাতুন উপসচিব পদে পদোন্নতি টেকনাফে মাদক মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার ৫৩৩ উপজেলা হাসপাতাল ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী একই জমি দুইবার বিক্রির অভিযোগ : টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রারকে ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজার পৌরসভার অর্থায়নে সেগুনবাগিচায় ৪টি রাস্তা নির্মাণ শুরু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিএনপির করণীয় বিষয়ে যা পরামর্শ দিলেন : ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজ উদ্দীন যে ৫ কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিততে পারে আর্জেন্টিনা! টি-টোয়েন্টি সিরিজেও হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের ইয়াবা পরিবহনের দায়ে রোহিঙ্গা তরুণীর কারাদন্ড নিয়োগ দেবে কারিতাস এনজিও : কর্মস্থল কক্সবাজারের উখিয়া

কক্সবাজারে ইয়াবা কারবারি মানবপাচারে

নিজস্ব প্রতিদেক / ৭৫ বার ভিউ
আপডেট সময় : সোমবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৩

ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক:
মালায়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্য ছোট ট্রলারে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন রোহিঙ্গারা। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে তারা বেছে নিচ্ছেন গভীর রাত। ভাগ্য বদলে তাদের যাত্রাকে স্থানীয়রা মৃত্যুকূপে লাফ দেয়ার শামিল বলে মনে করছেন। মাঝে-মধ্যেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে তাদের এই যাত্রায় ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে দেখা যাচ্ছে মাঝ সমুদ্রে।

মানবিক এমন পরিস্থিতিতে তাদের উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ডের সদস্যরা। রোহিঙ্গাদের এমন যাত্রাকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহ করা হলেও দালাল চক্রের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। মানবপাচারে নিয়োজিত চক্রের সদস্যরা এলাকায় এক সময় ইয়াবাকারবারি হিসেবে পরিচিত ছিল।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কক্সবাজার সফরকালে মানবপাচারের দালাল চক্র ও মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সাংবাদিকদের জানান। একই সঙ্গে বিভিন্ন এজেন্সির দেয়া তালিকা সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে ১৩ থেকে ১৫টি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রত্যেক চক্রে ১৫ থেকে ২৫ জন সদস্য রয়েছে। ওই চক্রের সদস্যরা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ওই টাকার একটি অংশ প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য ভাগ পেয়ে থাকেন।এই চক্রের সদস্যরা ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার মানুষ পাচার করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। জনপ্রতি তারা হাতিয়ে নিয়েছে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। এছাড়া জিম্মি করেও টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে।

সূত্রমতে, সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ মানবপাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট হলেও পাচারকারী চক্রের বিস্তৃতি রয়েছে মহেশখালী থেকে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর পর্যন্ত। মহেশখালীতে পাচারকারী চক্রের প্রধান ‘ঘাঁটি’ হচ্ছে কুতুবজোন ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে রয়েছে অন্তত অর্ধশত মানবপাচারকারী। উখিয়ার সোনারপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় ২০ জনের বেশি এবং টেকনাফে রয়েছে অর্ধশত পাচারকারী। এসব পাচারকারীদের সমন্বয়ে পৃথকভাবে রয়েছে ১০টির বেশি চক্র।

গোয়েন্দা সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে এসব চক্র সক্রিয় হয়ে পাচারের তৎপরতা চালাচ্ছে। গত দুই মাসে চক্রগুলো কয়েকটি চালান পাচার করে দিয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে। এসব চক্রে রয়েছে মহেশখালী, উখিয়া, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও টেকনাফের অন্তত অর্ধশত পাচারকারী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূল দিয়ে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর কাজে জড়িত অন্তত ৫শ’ দালালকে তারা চিহ্নিত করেছে। মূলত রোহিঙ্গাদের ঘিরেই এই চক্রটি বেশি সক্রিয়। কারণ রোহিঙ্গারা এখন আর বন্ধ অবস্থায় থাকতে চান না।

এ কারণে তারা অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। মাদক বিক্রির টাকাই মূলত তারা দালালদের হাতে তুলে দিচ্ছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর দালাল হিসেবে কাজ করছে ১৬নং ক্যাম্পের মো. সায়ীদের ছেলে রোহিঙ্গা মো. রফিক ও বাদশা মিয়ার ছেলে হারুনের নেতৃত্ব অন্তত ৫০ জন।

এই চক্রের সদস্যরা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও বাহারছড়া উপকূল দিয়ে বেশিরভাগ মানুষ মালয়েশিয়ায় পাচার করছে। এখানে দালালচক্রের নেতৃত্বে আছে শাহপরীর দ্বীপের ধলু হোসেন ও শরীফ হোসেন। তাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় অন্তত ১২টি মামলা রয়েছে। অদৃশ্য কারণে ধলু ও শরীফ সব সময় থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

টেকনাফের সাবরাং এলাকার আকতার কামাল, সাঈদ কামাল, মোয়াজ্জেম হোসেন, রামুর কালিমারছড়ার মোহাম্মদ হোসেন, শাহপরীর দ্বীপ মাঝরপাড়ার জায়েত উল্লাহ, সব্বির আহাম্মদ, সাজেদা বেগম, আব্দুল্লাহ, ইউনুচ, কলিম উল্লাহ, আব্দুস শুক্কুর, ঘোলাপাড়ার শামসুল আলম, কবির আহমদ, হাজীপাড়ার মুজিব উল্লাহসহ অন্তত ২৫০ জনের নাম এসেছে।

টেকনাফের বাইরে দালাল হিসেবে পুলিশ চিহ্নিত করেছে নরসিংদীর মো. শাহজালাল, নুর মোহাম্মদ প্রকাশ ইমরান, জিয়াউর রহমান, আবদুর রহমান, নারায়ণগঞ্জের রফিকুল ইসলাম, শহিদ উল্লাহ, আবদুস সাত্তার, চুয়াডাঙ্গার মো. আকিম, মো. কাশেম, আকিল উদ্দিন, সিরাজগঞ্জের সাত্তার মোল্লা, কুড়িগ্রামের মো. সালাম, সাতক্ষীরার আশরাফ মিয়া, বগুড়ার সাহাব উদ্দিন, যশোরের আবুল কালাম, মেহেরপুরের আহাম্মদ উল্লাসহ অন্তত ৩০০ জনকে।

এই চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষের নিয়ে টেকনাফের দালালদের হাতে তুলে দেন। এরপর ছোট ছোট ট্রলারে মাছ ধরতে যাওয়ার অজুহাতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের পাচার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এজন্য গভীর রাতকে তারা বেছে নিচ্ছেন।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মানবপাচারের তালিকায় থাকা কয়েকটি বড় চক্র রয়েছে মহেশখালীর কুতুবজোনে। এর মধ্যে বড় চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে তাজিয়াকাটা এলাকার করিম উল্লাহর ছেলে মো. নূর প্রকাশ বার্মাইয়া নূর। এই চক্রটি এই মৌসুমে ব্যাপক সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

নূর চক্রের অন্যতম প্রধান হোতা টেকনাফের সাবরাংয়ের কাটাবনিয়ার হাসান আলীর পুত্র শহিদ উল্লাহ, যাকে বিভিন্ন মানবপাচার মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে। তার কাজ জাহাজের সঙ্গে লেনদেন করা। তার মাধ্যমে জাহাজ ম্যানেজ করে চূড়ান্তভাবে যাত্রীদের মালয়েশিয়া পাঠানো হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এক্ষেত্রে খালি কনটেইনারে তাদের স্থান হয়। নাওয়া-খাওয়া বন্ধ অবস্থায় তাদের কাটাতে হয় মাসের পর মাস। মাঝে মধ্যে শুকনা কিছু খাবার পরিবেশন করা হয় বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এদের মধ্যে কারও মৃত্যু হলে ফেলে দেয়া হয় মাঝ সমুদ্রে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ করে এনে কুতুবজোনসহ বিভিন্ন গোপন আস্তানায় একত্রিত করে পাচারকারী চক্র। তাজিয়াকাটা ঘাট থেকে রাতেই যাত্রা করে বঙ্গোপসাগরের উখিয়ার সোনারপাড়া, টেকনাফের বাহারছড়া শীলখালী ও নোয়াখালীপাড়াসহ এসব স্থান থেকে বোটে ওঠানো হয়। এরপর গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ মালয়েশিয়াগামী জাহাজের উদ্দেশ যাত্রা করে বোটগুলো।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিটি বোটে পাচারকারী চক্রের অন্তত ১০ জন লোক থাকে। যাদের কাজ হুমকি দিয়ে ও মারধর করে মালয়েশিয়াগামীদের কাছ থেকে টাকা আদায় ও জিম্মি করে রাখা। অনেক সময় বোট ডুবে গেলে তারা সাঁতরে মাছধরার ডিঙি নৌকায় আশ্রয় নেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে কুতুবজোনের তাজিয়াকাটা বসতি গড়ে নূর প্রকাশ ওরফে বার্মাইয়া নূরের পরিবার। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে তারা ইয়াবার পাচারের সঙ্গে সক্রিয়। নূরের নেতৃত্বেই তার চার ভাই মিলে গড়ে তুলেছেন একটি কঠিন সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের রয়েছে মিয়ানমার থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।

মিয়ানমারে থাকা আত্মীয়দের মাধ্যমে ইয়াবা এনে ইয়াবার সামাজ্য গড়েছে এই চক্রটি। ভাড়া করা বোটের মাধ্যমে ইয়াবার চালান এনে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে। এই চক্রের সক্রিয় নেতৃত্বে রয়েছে, মো. নূর, তার ভাই মো. সেলিম, তাদের দূর সম্পর্কীয় ভাগিনা মো. সোহেল। কুতুবজোন পশ্চিমপাড়ার বাদশা মেম্বারের পুত্র আবদুর রহিম, তার ফুফাতো ভাই লুতু মিয়া জড়িত বলে দাবি করছে স্থানীয়রা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এই চক্রটি ইয়াবা পাচারের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারে জড়িয়ে পড়ে। গত পাঁচ বছর ধরে তারা মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। মূলত, মো. নূরের পরিবার রোহিঙ্গা হওয়ায় উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের বহু আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজন রয়েছে। এই সুযোগকে ব্যবহার করে গড়ে তোলে মানবপাচারের কারবার। ভাই মো. সেলিম ক্যাম্পে গিয়ে স্বজনদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার ফাঁদে ফেলে। ইয়াবা ও মানবপাচারের জন্য সোনাদিয়ার পশ্চিমপাড়ার প্যারাবনের ভেতর গোপন আস্তানাও গড়ে তুলেছে এই চক্রটি।

মো. নূরের এই চক্রের নেটওয়ার্ক মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মহেশখালীর কুতুবজোনের চক্র প্রধান নূর ও তার ভাইসহ অন্তত ১০জন এই চক্রে রয়েছে। অন্যদিকে উখিয়ার সোনাপাড়ায় রয়েছে পাঁচজনের বেশি। আর উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে ২০ জনের বেশি। এছাড়া টেকনাফের রয়েছে কয়েকজন। মালয়েশিয়ায় রয়েছে পাঁচজনের বেশি।

তারা জাহাজ সরবরাহসহ সবকিছু বিষয় ম্যানেজ করেন। কিছুদিন আগে রোহিঙ্গাবাহী বোটডুবির পর থেকে চক্রের প্রধান হোতা নূরসহ অন্যরা গা ঢাকা দিয়েছে। তবে বোটের মালিক কুতুবজোনের মৌলভী গফুর এলাকায় দেখা যায়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে কুতুবজোনের ইউপি চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, ‘কুতুবজোনকেন্দ্রিক মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে এটা ঠিক। মূলত চিহ্নিত ইয়াবা পাচারকারী চক্রগুলোই মানবপাচারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কম ঝামেলায় বেশি টাকা আয়ের লোভেই ইয়াবা কারবারিরা শুষ্ক মৌসুমকে কেন্দ্র করে মানবপাচারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই বিষয়টি আমি বিভিন্ন সময় প্রশাসনকে জানিয়েছি। ইয়াবা ও মানবপাচার রোধে আমার যা সহযোগিতা করা দরকার; প্রশাসন চাইলে আমি করব।’ সূত্র-নয়া শতাব্দী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন