বিশেষ প্রতিনিধি:
তালিকাভুক্ত চিহ্নিত মাদক সম্রাজ্ঞী দিলরুবা বেগম মিনু মাদক জগতে একনামে পরিচিত। পর্যটন শহর কক্সবাজারে তিনি গড়ে তুলেছেন ফেন্সিডিলের স্বর্গরাজ্য। এ রাজ্যের তিনি একাই রাণী। কেউ তাকে দমাতে পারেনি। তার অবৈধ টাকার কাছে ধরাশয়ী প্রত্যেকে। শহরের ভিআইপি ফেন্সিডিল সেবনকারীদের শেল্টারে রমরমা চালিয়ে যাচ্ছে মাদক ব্যবসা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই দশক আগে শহরের টেকপাড়ার মিনু আরা বিয়ে করেন কৃষি অফিস রোডস্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী অপু শর্মা অপুকে। তিনি ধর্মান্তরিত হয়েছেন। নাম রেখেছেন আদনান ইশতিয়াক অপু। তার বাবার নাম হরিপদ শর্মা।
বিয়ের আগে থেকেই টেকপাড়ার নিজ বাড়িতে মিনুর ফেন্সিডিল ব্যবসার সূত্রপাত। পরে সেখানে স্থানীয় নানা ঝামেলা এড়াতে খুরুশকুল রোড়ের নতুন রাস্তার মাথায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে চালিয়ে যান ব্যবসা। ওই বাড়িতে টানা চলে তাদের ফেন্সিডিল ব্যবসা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঝামেলা এড়াতে সেখান থেকেও সরে যান। বাড়ি ভাড়া নেন উত্তর তারাবনিয়া ছরা পুরাতন কমার্স কলেজ রোডে মো, লিয়াকত আলীর বাড়িতে। এখানে ৪-৫ বছর থাকার পর উত্তর তারাবনিয়া ছরা, পুরাতন কমার্স কলেজ ভবনের বাম পাশের গলিতে কোটি টাকার জমি কিনে গড়ে তোলেন আলিশান বাড়ি। সেই থেকে আজ অবদি সেই বাড়িতেই চলছে ফেন্সিডিলের রমরমা বাণিজ্য। বর্তমানে তার বাড়িটি ফেন্সিডিলের ডিপু হিসেবে বেশ পরিচিত। টেকপাড়া মিনুর নিজ বাড়িতেও কৌশলে এই ব্যবসা চলছে।
জানা গেছে, মাদক ব্যবসা পরিচালনার জন্য মিনু ও তার স্বামী অপুর রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটের অধিকাংশই মিনুর পরিবারের সদস্য। এরমধ্যে মিনুর বোন ইয়াছমিন আক্তার, রওশন আরা, ভাই আবদুল জলিল সহ একাধিক ব্যক্তি।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোরের মাদক সম্রাটদের সাথে তাদের রয়েছে গভীর সখ্যতা। বিশেষ করে কুমিল্লা ও যশোর থেকেই নৌ-পথে আসে ফেন্সিডিলের চালান। বাঁকখালী নদীর বিভিন্ন তীর থেকে খালাস হয় ওইসব চালান। তবে বেশিরভাগ চালান আসে খুরুশকুল ব্রীজ ও টেকপাড়ার বাঁকখালী পাড়ের বিভিন্ন বরফকলের জেটি থেকে। নিরপাদে ব্যবসা ও চালান আসার জন্য মিনু টাকা দিয়ে লালন করেন স্থানীয় সন্ত্রাসীদের। মিনুর আলিশান ওই বাড়িতেই রয়েছে ফেন্সিডিল রাখার অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। আন্ডারগ্রাউন্ডে বিশেষ কৌশলে রাখা হয় ফেন্সিডিল। ফেন্সিডিল রাখার জন্য বাড়ি করার সময় তৈরি করা হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডে একাধিক গোপন কক্ষ।
বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিনুর আস্তানায় অভিযান চালায়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে মিনুর স্বামী অপু ও ভাই জলিল র্যাবের হাতে আটক হয়ে কারাগারে আছেন। মিনু ও তার স্বামী অপুুর বিরুদ্ধে প্রায় ডজন খানেক মামলা রয়েছে। এসব মামলাও মিনুকে দমাতে পারেনি। তিনি কয়েকবার আটক হলেও জামিনে বের হয়ে ফের ফেন্সিডিল ব্যবসার জগতে চলে যায়।
মিনু তার মাদকের রাজ্য জিয়ে রাখতে প্রশাসনের অসাধু কর্তা, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। তাদের প্রতিমাসে দেয়া হয় মোটা অংকের টাকা। যার জন্য দিন দিন বাড়ছে তার মাদকের সম্রাজ্ঞী।
স্থানীয়রা জানান, মিনুর নিয়মিত ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে অনেক ভিভিআইপি ও ভিআইপি ব্যক্তি। সেই তালিকায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা। ভিভিআইপি ও ভিআইপি ক্রেতাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। হোম ডেলিভারির মাধ্যমে তাদের কাছে পৌছে যায় ফেন্সিডিল। এ জন্য একাধিক ডেলিভারি বয়ও রেখেছেন মিনু। তাদের মধ্যে সোহেল, আশিক, ইউনুছ অন্যতম। ডেলিভারি দেয়ার পর টাকা পরিশোধ করা হয় বিকাশে।
গত বিশ বছরে ফেন্সিডিল ব্যবসা করে মিনু ও অপু সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। খুরুশকুল ও শহরের বিভিন্ন স্থানে তাদের একাধিক জমি রয়েছে। কলাতলীতে কিনেছেন ৫-৬টি ফ্ল্যাট। তাদের আত্মীয় স্বজনের নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা রয়েছে ব্যাংকে। এছাড়া আছে দামি দামি গাড়িও। মিনুর চালচলনও বেশ রাজকীয়। বছরে কয়েকবার তার সন্তানের জন্মদিনসহ নানা অনুষ্ঠান পালন করা হয় ঘটা করে। ২-৩টি গরু জবাই করে দাওয়াত দেয়া হয় তার সব ভিআইপি ক্রেতা ও প্রশাসনের কর্তাদের। এটি তার একটি অপকৌশল। এর মাধ্যমে মিনু তাদের বাড়ায় আন্তরিকতা। যেন তার অবৈধ বাণিজ্যে কোন বাঁধা না আসে।
ফেন্সিডিল সম্রাজ্ঞী মিনুর ফেন্সিডিলের অধিকাংশ টাকা লেনদেন তারাবনিয়া প্রধান সড়কের পাশে সিকদার বাড়ির সামনের ‘আর্থ টেলিকম’ নামে বিকাশের দোকানে। ওই দোকানের মালিক মোহাম্মদ রনি। প্রতিদিন লাখ লাখ লেনদেন করে একাধিক বিকাশ নাম্বার থেকে।
ফেন্সিডিলের টাকা লেনদেন করেই কোটিপতি রনি। আর্থ টেলিকম ছাড়াও রনি এখন আরও কয়েকটি দোকানের মালিক। বার্মিজ মার্কেটে সুপারশপ, বাজারে দোকানসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহজাহান কবির বলেন, মিনু একজন চিহ্নিত ফেন্সিডিল ব্যবসায়ী। তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ইয়াছিনকে স্পেশাল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই মিনু সিন্ডিকেটের সবাইকে নির্মূল করা হবে।
এএন/এসআর/এফআর