কয়েকজন সমাজ নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কক্সবাজারের পূর্ব কলাতলী চন্দ্রিমা এলাকায় থামছে না গাঁজার ব্যবসার। তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই প্রকাশ্যে গাঁজা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে সুমন ওরফে পিচ্চি সুমন। একযুগের বেশি সময় ধরে চন্দ্রিমা এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে গেলেও সমাজের সবাই চুপ। এসব মাদক কারবার বন্ধ না করে উল্টো সুমনকে আশ্রয় দিচ্ছে সমাজে বেশ কয়েকজন নেতা। এমনকি পুলিশ ও মাদক দ্রব্য অধিদপ্তরের সোর্স পরিচয়ে গাঁজা সুমন থেকে এখনো মাসোহারা নিচ্ছে অনেকেই। যার কারণে সুমন এলাকায় প্রকাশ্যে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি করে যাচ্ছে সমানতালে।
জানা যায়- সুমনের বিরুদ্ধে একডজনের অধিক মামলা রয়েছে। এরমধ্যে বেশির ভাগ মাদক মামলা। এসব মামলায় বেশ কয়েকবার কারাগারেও যান তিনি। জেল থেকে জামিনে বের হয়ে ফের শুরু করে মাদক কারবার। গাঁজা বিক্রির সাথে সাথে যোগান দেন ইয়াবাও। এসব বিক্রি করতে লোকজনও নিয়োগ করেছে সুমন।
সুমনের মাদক বিক্রির সিন্ডিকেটে রয়েছে চন্দ্রিমা এলাকার রফিক। কয়েকমাস আগেও গাঁজাসহ আটক হয়েছিল রফিক। মাদকের টাকায় রফিককে জামিন করান সুমন। এক মাস জেল কেটে এসে ফের সুমনের গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি জড়িয়ে যান তিনি। রফিকের সাথে আটক হয়েছিল চৌদ্দগ্রাম এলাকার কাঞ্জনও। তবে জেল থেকে বের হয়ে সুমনের মাদক কারবার থেকে অবসর নেন কাঞ্জন। কাঞ্জনের জায়গায় যোগ হয়েছে চন্দ্রিমা এলাকার জাহাঙ্গীর ছেলে শাহজাহান। শাহজাহানের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক মামলাও। চন্দ্রিমা এলাকা এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের রেস্ট হাউজের পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা করে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি করে যাচ্ছে শাহজাহান। সুমনের সিন্ডিকেটে রয়েছে জুলুর ঘোনা এলাকার কামাল। বেশ পুরাতন মাদক কারবারি কামাল।
সুমনের ইয়াবা ও গাঁজার আস্তানা রয়েছে জুলুর ঘোনা এলাকায়। সেখানে বিশাল জায়গা কিনে আস্তানা তৈরি করেছে সুমন। হাজী নামে একব্যক্তি এসব দেখাশুনা করেন। জুলুর ঘোনার ওই আস্তানায় গাঁজা প্যাকেটিং করেন হাজী। হাজীর নামে জায়গাটি কিনেন সুমন। এমনকি কামালের ভাই বাবুকে সুমন নিজের টাকা সিএনজি টেক্সীও কিনে দেন। মাদকের টাকায় সম্পদ করেছে অনেক। সুমনের আস্তানায় গাঁজা তৈরি করে পরে এসব গাঁজা গুলো নিয়ে আসা হয় সরকারি রেস্ট হাউজের পাহাড়ি এলাকায়। অনেক সময় ওয়ার্ল্ড বীচ রিসোর্টের সামনের রাস্তায় হেঁটে হেঁটেও বিক্রি করেন। সুমনের হয়ে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মাদক বিক্রি করে টাকা তুলেন কামাল ও শাহজাহান। রাতে বিক্রি করেন রফিক। সকাল থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত চন্দ্রিমা এলাকা এবং কলাতলীতে মাদক বিক্রি করে তারা আয় করেন দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। তাদের এসব বেতন দেন পিচ্চি সুমন।
সুমনকে পাইকারি দামে এসব গাঁজা যোগানদেন পূর্ব কলাতলী ঝরঝরিকোয়া এলাকার মালয়েশিয়ানী। ওই এলাকার গাঁজার বড় ভেন্ডার তিনি। কুমিল্লা থেকে গাঁজা আনতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আটক হয়েছিল মালয়েশিয়ানী। আটক হলেও তার ব্যবসা থেমে নেই। মালয়েশিয়ানী থেকে প্রতিকেজি ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকায় পাইকারি দামে গাঁজা কিনেন পিচ্চি সুমন। আর খুচরা পর্যায়ে সুমন এসব গাঁজা বিক্রি করে আয় করেন ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মালয়েশিয়ানীর এক ছেলে কামাল ওরফে কালু। কালুও মাদক কারবারি। গাঁজা আনতে গিয়ে তিনিও আটক হয়েছিল। মা-ছেলে দুজনেই পাইকারি দামে গাঁজা বিক্রি করে সুমনকে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি করে আসলেও চন্দ্রিমার সমাজ নেতারা চুপ। সুমনের বড় ভাই আয়ুব। আয়ুব ওই এলাকার সমাজে একজন নেতাও। তাছাড়া একসময়ের সন্ত্রাসী হিসেবেও পরিচিত আয়ুব। নিজ ভাই ছাড়াও সমাজের বেশ কয়েকজন নেতার আশ্রয়ে সুমনের মাদক কারবার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একই সাথে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের সোর্স পরিচয় দিয়ে সুমনকে মাসোহারা নেন এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি ও চিহ্নিত থানার দালালরা। যার কারণে সুমনের এই মাদক কারবার দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
তারা কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের সরকারি পাহাড়টি গাঁজার পাহাড় বানিয়েছে। সরকারি বাউন্ডারির ভিতরেই বসে তারা মাদক বিক্রি করে। এই পাহাড়ের পশ্চিমে একটি কর্ণার রয়েছে। ওই কর্ণার দিয়ে মূলত গাঁজা কিনতে আসেন অনেকেই। কলাতলীর প্রায় হোটেলের কর্মচারীরা এই কর্ণার দিয়ে মূলতে এই পাহাড়ে উঠেন। পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরে স্তরে উঠেই মূলত গাঁজা কিনেন। বলতে গেলে সরকারি রেস্ট হাউজের এই পাহাড়টি অরক্ষিত। শুধু গাঁজা নয়, ইয়াবাও বিক্রি হয় এই পাহাড়ে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে বিক্রি করা হয় গাঁজা ও ইয়াবা।
এই রেস্ট হাউজের পাহাড়ে উঠতে কয়েকটি পথ রয়েছে। একটি হলো প্রধান গেইট, অন্য দুটি হলো পাহাড়ের পশ্চিম। অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড বীচ রিসোর্টের পূর্ব পাশে। অন্যটি হলো মূল রেস্ট হাউজের পিছন দিয়ে। বিভিন্ন দিক দিয়ে এই পাহাড়ে অবস্থান নেন মাদক কারবারিরা। এই পাহাড়ের একাধিক জঙ্গলের ভিতরেও গাঁজা ও ইয়াবা মজুদ রাখা হয়।
সরকারি এই রেস্ট হাউজের পাহাড়টি মাদকের আস্তানা বানিয়েছে মূলত কলাতলী চন্দ্রিমা এলাকার পিচ্চি সুমন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়- রেস্ট হাউজের কর্মচারীরা এক প্রকাশ অসহায় এসব মাদক কারবারিদের কাছে। তাদেরও হামলা চালায় এসব মাদক কারবারিরা। শুধু দিনে নয়, রাতের অবস্থা আর ভয়াবহ এই পাহাড়ে।