ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়েছে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমের নাম। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর পেশি শক্তি ও অবৈধ উপায়ে কামিয়েছেন শতকোটি টাকা। এমপি জাফর আলম, তার স্ত্রী ও ছেলে তানভীর আহমদ সিদ্দিকীর লুটপাটের মহোউৎসবে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসনের (চকরিয়া ও পেকুয়া) পাঁচ লাখ মানুষ এই জনপ্রতিনিধির হাত থেকে মুক্তি চান।
স্থানীয়রা এই আসনটিতে হাতঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে বর্তমান সংসদ সদস্যকে লালকার্ড দেখিয়ে দেবেন সাধারণ ভোটাররা; এমন জোর গুঞ্জন চায়ের দোকানসহ সর্বত্র।
জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান সাংসদ জাফর আলমের নানা বির্তকিত কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ কক্সবাজার-১ আসনের সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন তার জুলুম অত্যাচার চললেও মানুষ মুখ খুলতে পারতেন না। এবার জাফর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সরকারি বনভূমি দখল, জমি দখল, চিংড়ি ঘের দখলের অভিযোগ এনেছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে মানুষের জমি দখল করে মার্কেট নির্মাণের ঘটনা বেশ আলোচিত।
অভিযোগ আছে, গত ১৫ আগস্ট দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর গায়েবানা জানাজায় গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেন তিনি। এসব অপকর্মের কারণে দল তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দেওয়া হয়নি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন। তাকে প্রতিহত করতে এখন দুই উপজেলার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর গত পাঁচ বছরে জাফর আলমের সম্পদ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। বেড়েছে স্ত্রী ও পুত্রের সম্পদও। চকরিয়া-পেকুয়ায় তাঁর কথাই যেন আইন! রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। পাহাড় কাটা, নদী দখল ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ওই বাহিনীকে কাজে লাগান তিনি। গত ১৫ আগস্ট অস্ত্রধারীর পাশে দাঁড়িয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় আসেন এমপি জাফর আলম। স্ত্রী শাহেদা বেগমের নামে ক্রয় করা জমি দখল নিতে সোহেল নামে এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হন। এ পর্যন্ত জাফর আলমের নেতৃত্বে মিছিল থেকে তার বাহিনী গুলি চালিয়ে অন্তত প্রতিপক্ষের পাঁচজন রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যা করেছে। তার ভাতিজা জিয়াবুল হক ও ভাগিনা মিজানুর রহমান গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনী। এই বাহিনীর নেতৃত্বে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এদিকে গত ১৯ ডিসেম্বর পেকুয়ার একটি নির্বাচনি সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে সমালোচনা করেন জাফর আলম। পরে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতিও পান।
২০১৮ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাফর আলম। অল্প সময়ে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমপি হওয়ার পাঁচ বছরে বছরে তাঁর সম্পদ বেড়েছে দশ গুণ। তাঁর স্ত্রী শাহেদা বেগম স্কুল শিক্ষিকা। স্বামী এমপি হওয়ার পর ফুলে ফেঁপে উঠেছে তাঁর সম্পদও। এবারের নির্বাচনি হলফনামায় তার সম্পদের পরিমাণ উঠে এসেছে।
অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এমপি জাফর আলম ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমেদ সিআইপি বলেন, জাফর আলম এমপি হওয়ার পর চকরিয়া-পেকুয়ার সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারী ও ডাকাতদের নিয়ে ‘জাফর লীগ’ গঠন করেছেন। জায়গা দখল, পাহাড় কাটা ও নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে তাঁর বাহিনী। এমন কোনো অপরাধ নেই যেটি তাঁর বাহিনী করছে না। ভয়ে কেউ মুখও খুলতে পারছেন না।
গত বছরের ১৫ আগস্ট চকরিয়া পৌরশহরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা ঘিরে সংঘর্ষের সময় মিছিলে অস্ত্রধারীদের সঙ্গে ছিলেন এমপি জাফর আলম। সেই মিছিল থেকে করা গুলিতে ফোরকান নামে একজন প্রাণ হারিয়েছেন। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা পাঞ্জাবি পরা সংসদ সদস্য জাফরকে মাঝখানে রেখে শহরে মিছিলটি হয়। মিছিলের সামনে হেলমেট, হাফহাতা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তির হাতে ছিল ভারী অস্ত্র। তার পেছনে ছিলেন জাফর আলম, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আমিন চৌধুরী, পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলমগীর ও পৌরসভা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক আহ্বায়ক জয়নাল হাজারী। তাদের পাশে কালো পাঞ্জাবি ও হেলমেট পরা আরেকজনের হাতে অস্ত্র হাতে দেখা যায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে জাফর আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
এদিকে আসনটিতে জয়ের হিসাবে এগিয়ে রয়েছেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। কারণ বর্তমান সংসদ সদস্য ও নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জাফর আলম থেকে সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সবাই চাচ্ছেন পরিবর্তন ও উন্নয়ন।
ভোটাররা বলছেন, তারা জাফর বাহিনীর সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অতিষ্ঠ। তারা এর থেকে নিস্তার চান। তাদের পছন্দ ক্লিন ইমেজের সৈয়দ ইবরাহিম।