বিশেষ প্রতিবেদক:
কক্সবাজার শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, উখিয়ার কুতুপালং থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর কুমির প্রজনন কেন্দ্র। এই কুমির ফার্ম দেখতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করছেন। ব্যতিক্রম এই কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি বনাঞ্চল ঘেরা মায়াবী পরিবেশে বিধায় পর্যটকদের পাশাপাশি টানছে প্রকৃতি প্রেমীদেরও।
বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমঘুম ইউনিয়নের মায়ানমার সীমান্তবর্তী তুমব্রু এলাকায় অবস্থিত হলেও বান্দরবান জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। ফলে কক্সবাজারে আগত পর্যটকরাই সহজে ও কম খরচে এই কুমির প্রজনন কেন্দ্র দেখতে যান। কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের উখিয়া কুতুপালং টিভি টাওয়ার পর্যন্ত পৌছলেই হাতের বাম দিকে বড় সাইনবোর্ডে লেখা আছে আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম। সেখানেই হচ্ছে কুমির প্রজনন কেন্দ্র।
সাড়ে তিন হাজার কুমির নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম খামারটির যাত্রা শুরু হয়। আকিজ গ্রুপের এ খামারটি এবার বিদেশে কুমির রফতানি করতে যাচ্ছ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এটি পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে হিসাবে দ্রুত বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কুমির রপ্তানি করে বছরে ৪০০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা জাগাচ্ছে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প সন্নিকটের এ খামার। নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তুমব্রু গ্রামের ২৫ একর পাহাড়ি জমিতে আকিজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ২০০৮ সালে গড়ে তোলে ‘আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম’। ২০১০ সাল থেকে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে কুমিরের চাষ শুরু হয়।
কুমিরের এ খামারটি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরত্বে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের কাছাকাছি ঘুমধুম পাহাড়ি এলাকার তুমব্রু গ্রামে। বর্তমানে ঐ খামারে কাজ করছেন দুই প্রকল্প কর্মকর্তার অধীনে ২০ জন কর্মচারী।
চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম থেকে চার শতাধিক কুমির মালয়েশিয়ায় রফতানি হতে যাচ্ছে। ২০১০ সালের আগস্টে অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে ৫০টি অস্ট্রেলীয় প্রজাতির কুমির আনা হয়। এর একেকটির দাম পড়ে তিন লাখ টাকা। পরে নাইক্ষ্যংছড়ির ওই খামারের উন্মুক্ত জলাশয়ে সেগুলো ছাড়া হয়। এরমধ্যে মারা যায় চারটি কুমির। ৪৬টি সুস্থ কুমিরের মধ্যে পরে স্ত্রী কুমিরের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১টি এবং পুরুষ কুমির ১৫টি।
সেই ৪৬টি কুমির থেকে নাইক্ষ্যংছড়ির আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্মে বর্তমানে বাচ্চাসহ ছোট-বড় কুমিরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৪০০টি। খামারে দুভাবেই রাখা হয়েছে কুমির- উন্মুক্ত জলাশয় ও খাঁচায়।
এখানে কুমিরের বাচ্চা ফোটানো হয় ইনকিউবেটরে। ডিম ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ছোট বাচ্চাদের সংগ্রহ করে আরেকটি ইনকিউবেটরে রাখা হয়। কারণ বাচ্চাগুলোর নাভি থেকে কুসুম ছাড়তে সময় লাগে ৭২ ঘণ্টা। এরপর ছোট কুমিরদের নার্সারিতে নিয়ে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়। জন্মের পর একটি কুমির প্রায় ১২ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। প্রায় দুই বছর বয়স হওয়ার পর বাচ্চা কুমিরগুলোকে আকারভেদে পুকুরে স্থানান্তর করা হয়।
কুমিরের চামড়া বেশ দামি। এ চামড়া দিয়ে ব্যাগ, জুতাসহ অনেক দামি জিনিস তৈরি করা হয়। এছাড়া কুমিরের মাংস, হাড়, দাঁত এসবও দামি। কুমিরের হাড় থেকে তৈরি হয় পারফিউম। দাঁত থেকে গহনা বানানো হয়। আবার পায়ের থাবা থেকে চাবির রিং তৈরি হয়। কুমিরের মাংসও বেশ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। তাই দেশে ও বিদেশে চাহিদা প্রচুর। এক-কথায় কুমিরের কোনো কিছুই ফেলনা নয়।
আকিজ গ্রুপের এই কুমির খামার রফতানির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এসব কুমির গড়ে ৫ ফুট লম্বা। এগুলোর ওজন ২০ থেকে ২৫ কেজি। চামড়া ছাড়াও কুমিরের প্রতি কেজি মাংস ৩০ ডলারে বিক্রি হয় বিদেশে। ১২ ডলার দামে বিক্রি হয় ১ বর্গ সেন্টিমিটার চামড়া। কুমির রফতানি থেকে বছরে কমপক্ষে ৪০০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, এসব কুমির প্রায় ১০০ বছর বাঁচে। প্রাপ্তবয়স্ক হতে একেকটি কুমিরের সময় লাগে অন্তত ৮ থেকে ১২ বছর। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তারা হাঁস-মুরগির মতো ডিম দেয়। তবে কুমিরের ডিমের আকৃতি রাজহাঁসের মতো বড়। এরা ডিম দেয় সাধারণত বর্ষাকালে এবং একবারে ২০-৮০টি করে ডিম দেয় একেকটি প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী কুমির। ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৮০ থেকে ৮৬ দিনেই ডিম থেকে কুমির ছানারা ফুটে বের হয়।
উল্লেখ্য সরকারী একমাত্র কুমির প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে বাগের হাটের সুন্দরবনের করমজলে। এটি ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে। ঘুমঘুমের তুমব্র এলাকার আকিজ গ্রুপের এই কুমির ফার্ম দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক একশ টাকায় টিকেট কেটে বৈচিত্র্য ময় কুমিরের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।
কীভাবে যাবেন:
কক্সবাজার শহরের বাসটার্মিনাল থেকে টেকনাফ ও উখিয়া গামী বাস মিনিবাসে চড়ে মাত্র ৬০ টাকা ভাড়া দিয়ে পৌঁছে যেতে পারেন কুতুপালং এর টিভি টাওয়ার নামক স্থানে।সেখান থেকে রিকশা বা পায়ে হেটে ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারেন সেই কুমির প্রজনন কেন্দ্রে।
পাহাড় আর সমতল ভূমির সবুজ সমারোহ এমনিতেই মন জুড়ে যায়। নেই কোন কোলাহল। প্রকৃতির নিরব নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যেতে কার না মন চায়! হাতে ৩ থেকে চার ঘন্টা সময় নিয়ে যেন কোন সময় কক্সবাজার থেকে সরাসরি ঘুরে আাসা যায় এই কুমির প্রজনন কেন্দ্র।