• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন

এনাম-কুতুব সিন্ডিকেট: কক্সবাজারে এমপিওভুক্তির নামে হাতিয়ে নেন অর্ধকোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিদেক / ২২৪ বার ভিউ
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মাহমুদ রাসেল:

এমপিওভুক্তি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ১৭ জন শিক্ষকের নিকট থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে লাইব্রেরিয়ান এনাম। মাদ্রাসা সুপারের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে এই ঘটনা ঘটেছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

কক্সবাজার সদরের বাংলাবাজার স্টেশনস্থ আয়েশা ছিদ্দিকা বালিকা মাদ্রাসায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি আত্মসাতকৃত সেই টাকা এনাম এখন ব্যবহার করছেন আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে নিজের প্রার্থীতায়। মাদ্রাসাটির এমপিওভুক্ত শিক্ষক হবার পরও তথ্য গোপন করে অংশ নিয়েছেন ইউপি নির্বাচনে। লড়ছেন ঝিলংজার ৬ নাম্বার ওয়ার্ডের সদস্য পদে।

অনুসন্ধানে জানা যায়- মাদ্রাসাটির লাইব্রেরিয়ান মৌ. এনাম এবং মাদ্রাসা প্রধান মৌ. কুতুব উদ্দিনের পরস্পরের যোগসাজসে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় নানা অজুহাতে এই বিপুল সংখ্যক অর্থ হাতিয়েছেন। গত বছরের শুরুতে মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্ত করতে প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচ দরকার পড়ছে এমন অজুহাত দেখিয়ে প্রতিজন শিক্ষককে নির্দিষ্ট সংখ্যক টাকা ধার্য করে দেন। এটি বিভিন্ন স্তরভেদে কাউকে আড়াই লাখ, কাউকে তিন লাখ আবার কাউকে চার লক্ষ টাকা দিতে হবে বলে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারি করেন এনাম-কুতুব সিন্ডিকেট। এভাবে ১৭ জন শিক্ষকের কাছ ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।

নারী শিক্ষকদের হয়রানি:

প্রতিষ্ঠানটি বালিকা মাদ্রাসা হলেও নারী শিক্ষকদের তেমন উপস্থিতি নেই বললেই চলে। মাত্র তিনজন নারী শিক্ষক এখানে রয়েছেন। এই তিনজন নারী শিক্ষকের উপস্থিতিও যেনো মাদ্রাসাটি ঘিরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠা মৌলবাদী চক্র সহ্য করতে পারছেন না। তারা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেলেই যেনো বাঁচে।

জানা গেছে, এনাম-কুতুব সিন্ডিকেটের কাছে সবচেয়ে বেশি হয়রাণির শিকার হচ্ছেন মুস্টিমেয় এই কজন নারী শিক্ষক। যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন, কর্মস্থলে অসৈজন্যমূলক আচরণ, ঘরবাড়িতে গিয়ে হুমকি ধমকিসহ আরও বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনের তথ্য নাম প্রকাশ না করা শর্তে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। যার অডিও ও ভিডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত আছে। ভিকটিমের আপত্তি থাকায় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।

এছাড়াও আরও একজন নারী শিক্ষকের গ্রেড সংশোধনের কথা বলে ওই নারী শিক্ষকের কাছ থেকে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা আত্মসাত এবং এক লক্ষ দশ হাজার টাকার একটি চেক জমা রাখেন এনাম-কুতুব সিন্ডিকেট।

এসব বিষয় নিয়ে ওই নারী শিক্ষকদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ান লাইব্রেরিয়ান এনাম এবং মাদ্রাসা সুপার কুতুব উদ্দিন। এমনকি ঝগড়ার খবর পৌঁছে যায় ঝিলংজার ইউপি চেয়ারম্যান টিপু সুলতানের কাছেও। তিনিও তাদের এসব অনিয়ম দুর্নীতির ভাগ বাটোয়ারার সমাধান দিতে ব্যর্থ হন।

এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম:

লাইব্রেরিয়ান এনামের ভাই বীমাকর্মী এহসানও এখন মাদ্রাসাটির এমপিওভুক্ত শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে জড়িত ছিলেন প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের সাথে।

শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য মতে, বীমাকর্মী এহেসান ওই প্রতিষ্ঠানে একটা ক্লাসও নিয়েছেন এমন নজির নেই। কিন্ত গত বছরের জুনের দিকে যখন প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয় সেখানে শিক্ষক হিসেবে নাম নথিভুক্ত থাকতে দেখা যায় এহেসানেরও। এহেসান এখন মাদ্রাসাটির সহকারী সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মাদ্রাসাটির ৭ জন নারী-পুরুষ শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাদ্রাসাটিকে এনাম-কুতুব সিন্ডিকেট এখন অনিয়ম দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন। মূলত মাদ্রাসা সুপার কুতুব উদ্দিনের নিরবতা এবং প্রত্যক্ষ মদদে লাইব্রেরিয়ান এহেসান এখন মাদ্রাসাটির সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে। এহেসানের কথায় উঠবস করতে হয় সুপারসহ অপরাপর সকল শিক্ষকদের। তার কথার বাইরে গেলেই নেমে আসে নানাবিধ নির্যাতনের খড়গ।

মাদ্রাসাটির সহকারী শিক্ষক গিয়াস উদ্দিনের সাথে কথা হলে তিনিও অভিযোগগুলো অস্বীকার করেননি। তবে এসব বিষয়ে লেখালেখি হলে মাদ্রাসার ক্ষতি হতে পারে এমন মন্তব্যও করেন তিনি। বরং নিউজ না করে অভিযোগকারী শিক্ষক ও অভিযুক্ত ব্যাক্তিদের সামনাসামনি বসিয়ে বিষয়টি সুরাহা করে দেওয়ার পরামর্শ দেন প্রতিবেদককে।

মাদ্রাসাটির পরিচালনা পর্ষদের একজন দায়িত্বশীল নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এমপিওভুক্তির সময় কিছু টাকা খরচ হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়েছে একথা সত্য। এই টাকা দিতে গিয়ে সকল শিক্ষকের নিকট থেকে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক নির্দিষ্ট হারে টাকা ধার্য্য করা হয়। শিক্ষকরা এখন ওইটাকা পূর্ণ পরিশোধ না করে উল্টো বিবাধ সৃষ্টি করছে। এমপিওভুক্তি করতে সরকার কোনো টাকা নিয়েছে কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার এই টাকা নেয়নি। তবুও এই টাকা বিভিন্ন জায়গায় দিতে হয়।

অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে কথা হলে লাইব্রেরিয়ান এনাম শিক্ষকদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি বলে দাবি করেন। যদি এধরণের দাবি নিয়ে কোনো শিক্ষক অভিযোগ করে থাকে তাহলে তাদের সামনে উপস্থিত করতে বলেন।

এবিষয়ে মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক মৌলানা কুতুব উদ্দিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

ঘটনার বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বিভীষণ কান্তি দাশের নজরে দেওয়া হলে তিনি জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করতে কোনো টাকা খরচ হয় না। এমপিওভুক্তির কথা বলে কেউ কোনো অনিয়ম করে থাকলে কিংবা অনিয়মের আশ্রয় নিলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন