তানভিরুল মিরাজ রিপন:
সুবীর ভৌমিক। প্রায় ১৪ বছর বিবিসির ইস্ট ইন্ডিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। ভারতীয় এই সাংবাদিক ও বিশ্লেষক কাজ করেছেন মিয়ানমার ও বাংলাদেশের প্রধান সারীর গণমাধ্যমেও। সম্প্রতি ভারতের বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ও সেনাপ্রধান এম এম নরবান সফর করেছেন মিয়ানমারে। সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি কতখানি গুরুত্ব পাবে, পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনার দুয়ার আদৌ খুলবে কি না সে বিষয়টি নিয়ে সুবীর ভৌমিক কথা বলেছেন আমাদের কূটনৈতিক প্রতিবেদক তানভীরুল মিরাজ রিপন এর সাথে। সাক্ষাৎকারটি আমাদের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
ভয়েসওয়ার্ল্ড: ভারতের আর্মি চিফ ও বিদেশ সচিবের মিয়ানমার সফর কি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে?
সুবীর ভৌমিক: ভারতে উত্তর পূর্বাঞ্চলের কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠি সাগাইন প্রদেশে অবস্থান করে জঙ্গি হামলা চালায়। বিচ্ছিন্নতাবাদী কিছু কার্যকলাপকে তারা ত্বরান্বিত করে। এটা নিয়ে ভারত চিন্তিত। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি যা কার্যকলাপ করছে এবং রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে তাদের যে সম্পর্ক হয়ে গেছে সেটা নিয়ে মিয়ানমার চিন্তিত।
ফলে এখানে সাংঘাতিক রকমের একটি মিলিটারি কো-অপারেশনের ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে৷ সে কারণে বিদেশ সচিব একা নয় সেনাপ্রধানও সঙ্গে গেছেন।
ভারতের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্কটা শুধু ট্রেন বা রাজনৈতিক নয় এখন সেটা মিলিটারী সাপ্লাইজের ফলে বিরাট মিলিটারি কম্পোনেন্টে চলে এসছে। মিয়ানমারকে ভারত মিলিটারি সাপ্লাইজ বাড়িয়েছে। মিজোরাম, নাগা, মনিপুরীর এসব জঙ্গিদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কার্যকলাপ করবে। আর আরাকান আর্মি মিজোরামের দক্ষিণাঞ্চলে যে ঘাঁটি গেড়ে বসে তৎপরতা চালাচ্ছিল এ জায়গায় ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালাবে। বিভিন্ন অপারেশন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এমন গুজবও রটে গিয়েছিল যে আমেরিকা থেকে আনা ভারতের অস্ত্রসজ্জিত ড্রোনগুলোর প্রথম পরীক্ষা নিরীক্ষা এই অঞ্চলে হবে। তাও আবার আরাকান আর্মির ওপর।
ইদানীংকালে আরাকান আর্মি বেশি ক্যাজুয়ালিটি সাফার করেছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা মিয়ানমার পাচ্ছে। কারণ মিয়ানমার স্যাটেলাইট, টেকনিক্যাল ইন্টেলিজেন্সে এতো ডেভলপ না। সাগাইন হল ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিদের শেষ বিদেশি ঘাটি। জঙ্গিরা ভুটানে ছিল, ভুটান তাদের সেনা অপারেশনের মাধ্যমে তা নিধন করে। বাংলাদেশে যেটা ছিল সেটা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর গ্রেফতার করে এবং অভিযান চালিয়ে সেটাও নির্মুল করেছে। সাগাইন প্রদেশে যেখানে বার্মিজ আর্মিরও খুব একটা কন্ট্রোল নেই, সে বর্ডারটা উত্তর পূর্বাঞ্চলের লাস্ট বর্ডার। এ জায়গাটা ভারতের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে আরাকান আর্মিকে নস্যাৎ এর পাশাপাশি উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করার জন্য সম্পর্কের নতুন মাত্রা দিতে এ সফর।
২২ জন উত্তর পূর্বাঞ্চলের বড় মাপের জঙ্গি নেতা যারা বার্মা গ্রেফতার হয়েছিল এবং একেবারে প্লেনে করে তাদের ভারতের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছিল । এখানে মিলিটারি ডাইমেনশনটা স্পষ্ট। ভারতের বার্মার সাথে এনগেজমেন্টের যে মূল কারনগুলো রয়েছে তার একটি কারন হল ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ও ভুটানের পর বার্মাও ভারতের সাথে সামরিক সম্পর্ক তৈরী করেছে। এর ফলে উত্তর পূর্বাঞ্চলের জঙ্গি আন্দোলনগুলো অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে৷ অনেক ক্ষেত্রে তারা বাধ্য হচ্ছে টেবিলে বসতে। আর ভারতের সাথে টেবিলে বসলে আন্দোলন শেষ।

ভয়েসওয়ার্ল্ড : ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার ও আরাকান আর্মির সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধে ভারত মিয়ানমার সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে?
সুবীর ভৌমিক: শুধু বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড নয়, ভারতের মোস্ট ইমপোর্টেন্ট ট্রান্স বর্ডার প্রজেক্ট এই অঞ্চলে। বাংলাদেশ সবসময়ই একটি রুট। কিন্তু এটিকে ভারত আরেকটি রুট হিসেবে দেখে, কারণ বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই উষ্ণ, মাঝেমধ্যে টানাপোড়েন হয়। কিন্তু বেগম জিয়া সরকার যখন ছিলেন তখন তারা রুট দিতে রাজি হয়নি এবং নানা রকম সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মদদ দিতো তারা। এখানের মাল্টি মডেল প্রজেক্টটা খুবই ইম্পর্ট্যান্ট কারন এটা দ্বিতীয় রুট উত্তর পূর্বাঞ্চল টু মধ্যপ্রদেশ। এটা ডেভলপ করার ফলে প্রচন্ড রকম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মি মূলত বার্মা সরকারের জন্য সমস্যা। এখানে আরাকান আর্মির একটা ভুল আছে, সেটি হল তারা মিয়ানমারের সরকারকে তাদের শত্রু ভাবছে। ফলে তারা জঙ্গি হামলা চালাচ্ছে। তবে তার কিছু যৌক্তিক কারনও আছে৷ কারন মিয়ানমার আর্মি সংখ্যালুঘুদের ওপর বৈষম্য ও নির্যাতন চালাচ্ছে । কিন্তু ভারতকেও শত্রু বানিয়ে ফেলা সেটা নিশ্চয় বুদ্ধিমানের কাজ করছে না আরাকান আর্মি।
ভয়েসওয়ার্ল্ড: ভারত আশ্বাস দিয়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কাজে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে ঠিক কতখানি মিয়ানমারের ওপর প্রভাব খাটাতে পারবে ভারত?
সুবীর ভৌমিক: প্রত্যাশা করার সংগত কারন আছে। এতদিন বাংলাদেশ ভারতকে বারবারই বলেছে রোহিঙ্গা বিষয়টিতে আপনারা একটি কার্যকরী ভূমিকা নিন। দু’বছর আগে ভারতের তখন সে প্রভাব কাটানোর সুযোগটা ছিল না৷ চীনের সেটা ছিল। চীন এ সমস্যার সমাধান কোনো করেনি, করবেও না। চীন সবাইকে নিয়ে খেলবে। চীন একদিকে বার্মিজ সেনাবাহিনীকে অস্ত্র বিক্রি করে অন্যদিকে আরাকান আর্মিকেও অস্ত্র বিক্রি করে। চোরকে বলে চুরি করো আর গৃহস্থকে বলে সজাগ থাকো। এটাই চীনের ব্যবসায়িক লাভ। একসময় তারা বার্মিজ কমিউনিস্ট পার্টিকে হেল্প করেছে। এখন বার্মিজ আর্মিকে সহায়তা করছে। এর ক্লাউডটা অনেক বেড়েছে৷ আজকে ভারতকে মিয়ানমার সরকার অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারন বার্মার কাছে ভারতের সামরিক প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে আরাকান আর্মির কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে। আজকে ভারত এ জায়গাতে আছে। গত দু বছর আগে অতটা ছিল না এমনকি এক বছর আগেও ছিল না। আরাকান আর্মির আন্দোলন যতই তীব্রতর হচ্ছে ততই বার্মা ভারতের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। কারন মিয়ানমার বুঝে গেছে চীন এ ব্যাপারে কিছুই করবে না। ফলে ভারতের একটা প্রভাব বেড়েছে৷ এরফলে ভারত চাপ দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারটা খানিকটা ত্বরান্বিত করতে পারে। এর আগেও ভারত পদক্ষেপ নিয়েছে। অনেকে চেচামেচি করে না জেনে।
আমি সেখানে থাকতে তখন বিদেশ সচিব চিল এস জয়শঙ্কর। এখন যিনি বিদেশমন্ত্রী। ওনি নিজে গিয়ে চুক্তি করেছিলেন।প্রত্যাবাসনের পরে কোন কোন জায়গায় রিসেটেলমেন্ট হবে সেগুলোর ছক করে এসেছিলেন। কিন্তু ওখানে নানারকম গণ্ডগোল বাধিয়ে ইউএন এর লোকগুলো বলা শুরু করলো ওখানে ফিরে গিয়ে নিরাপদ থাকবে না। কারণ ওদের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। প্রত্যাবর্তন শুরু হলে বিভিন্ন এনজিওর দোকান বন্ধ হবে। আমি পরিষ্কারভাবে বলছি আমি তাদের চিনি। ভারত নিজেই চাপ দিয়ে চুক্তিটা করেছিল, আমি সেখানে ছিলাম। এটা ভারত কার্যকর করতে পারেনি কারন এখানে মিয়ানমার আর্মির নানা রকম এজেন্ডা আছে। এখন ভারতের প্রভাব বেশি, ভারত বলতেই পারে স্ট্যাবিলিটির জন্য তোমরা প্রত্যাবাসন করো। তোমরা যদি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে এ জায়গায় শান্তি ফিরিয়ে না আনো তাহলে রোহিঙ্গাদের সাথে রাখাইনদের আন্দোলনটাও বাড়বে। এ আন্দোলনটা তোমরা কন্ট্রোল করতে পারবে না, এখানে শুধু ডান্ডা বাজি করলে হবে না। পলিটিক্যালি সমাধান করতে হবে। তোমাকে (মিয়ানমার) এটির জন্য ইন্ডিয়াকে ইনগেজ করতে হবে, সাধারণ মানুষকে ইনগেজ করতে হবে, রোহিঙ্গা রাজনৈতিক নেতাদের ইনগেজ করতে হবে। সন্ত্রাসীদের নয় । আজকে ভারত এ কথা বলবার জায়গায় আছে। দু বছর আগে চীনের প্রভাব খুব বেশি ছিল। এখন মিয়ানমারে এন্টি চীন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হওয়াতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল। তবে এটি সময় সাপেক্ষ। দুদিনে হয়ে যাবে তা নয়। ভারত যদি বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়ে থাকে এখন আমরা এটা করতে পারবো, তাহলে ব্যাপারটা ভুল নয়। চীন কোনোভাবে এ সমস্যার সমাধান করবে না৷
ভয়েসওয়ার্ল্ড: রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে প্রোপাগান্ডাগুলো প্রচলিত আছে বিভিন্ন মিডিয়াতে এগুলোর সত্যতা কতখানি?
সুবীর ভৌমিক: রোহিঙ্গাদের খুব ছোট অংশ, প্রায় দু-লক্ষ লোক পাকিস্তানে আছে। বিদ্রোহী সংগঠন কোত্থেকে গজায়? যেখানে সাধারণ লোকেদের ওপর অত্যাচার হয়। সেটাকে মূলধন করেইতো তারা এগুই। আগে যে সংগঠন গুলোর উত্থান হয়েছিল RSO, RO, তাদের অনেককেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাদের মধ্যে দুটো ধারা ছিলো একটা ইসলামিক যার ইন্ধনটা আসতো সৌদি আরব- পাকিস্তান থেকে। মানে তারা আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফোরাম। এবং আরেকটা ছিলো আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনালিস্ট অর্গানাইজেশন। তারা কিন্তু স্বাধীন আরাকানে বিশ্বাস করতো। তারা মনে করত আরাকান মুসলিম এবং আরকান রাখাইনদের একসাথে অত্যাচার করা হচ্ছে। আরকান এক সময় স্বাধীন প্রদেশ ছিল৷ তারা এটাকে আবার নিজেদের মতো স্বাধীন করে মুসলিম আর রাখাইনরা পাশাপাশি বসবাস করবে। আরসা, যাদের পুরোপুরি কর্মকাণ্ড ২০১৬ সালে খুব বেড়ে যায়, এটা পুরোপুরি পাকিস্তানের আইএসআইয়ের তৈরী করা গোষ্ঠি। এরা প্রত্যেকে পাকিস্তানি রোহিঙ্গা। এদের পুরোপুরি ইন্ধন পাকিস্তান থেকে দেওয়া হয়। এরা দুর্দান্ত উর্দুতে ইন্টারভিউ দেয়। কোনো আরকানি মুসলমান এভাবে এতো ভালো উর্দুতে ইন্টারভিউ দিতে পারে না।
এদিকে আরসার মূলত দুটো পার্পাস ছিল, বর্ডারে একটা টেনশন ক্রিয়েট করা। মূলত রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরী করে শেখ হাসিনা সরকারকে বিপাকে ফেলা। পাকিস্তান চায় না শেখ হাসিনা সরকার থাকুক। ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের মধ্যে জঙ্গি তৎপরতা আছে এটি একদমই সত্য নয়। এক্সপোর্টেড কিছু রোহিঙ্গা এখানে আর্টিফিশিয়াল টেরোরিস্ট এক্টিভিটিগুলো করছে। এদের কিছু আন্তর্জাতিক সমর্থন আছে। রোহিঙ্গাদের উপর যেভাবে নির্যাতন করেছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে মিয়ানমান সেনাবাহিনী সে জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের রাগ ক্ষোভ থাকবে সেটা খুব স্বাভাবিক।
ভয়েসওয়ার্ল্ড: সুচি কেনো হেগে মিয়ানমার রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে কাজ করেছেন? যদি তাঁর রোহিঙ্গা সংকটে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভূমিকা না থাকে।
সুবীর ভৌমিক: আমাকে সুচি বলেছিলেন, ‘আমি পুরো বিশ্বের গণতন্ত্রের আইকন। কিন্তু আমি বার্মিজ পলিটেশিয়ান। আমাকে এখানে সার্ভাইব করতে হয়’। আর্মির বিরুদ্ধে গিয়ে সুচির পক্ষে সার্ভাইব করা সম্ভব না। এখন ওনি যদি বিরুদ্ধাচারণ করে সিভিল সরকার ফেলে দিয়ে আর্মি গণতন্ত্র টনতন্ট্র লাটে তুলবে। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আর্মিকে ডিফেন্ড করে যে রুলটা তিনি প্লে করেছেন তা ন্যাক্কারজনক, কিন্তু ওনার অপারগতাটাও আমাদের দেখতে হবে। বার্মায় আর্মি ৫০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে