আরফাতুল মজিদ:
সাগরে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, মেরিন লাইফ হাসপাতাল ও আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, রিভিউ কমিটি গঠন, সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ ১০টি সুপারিশ দিয়ে ১৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বরাবরে জমা দিয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে হঠাৎ অধিক পরিমাণে বর্জ্য, কাছিম ও অন্যান্য প্রাণী ভেসে আসার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটি।
এবিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘অনুসন্ধান কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কিছুদিন আগে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য ও সুপারিশ সমূহ বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। ইতিমধ্যেই ‘এনভায়রনমেন্ট পিপল’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।’
এদিকে অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্ট পিপল’।
বিবৃতিতে সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করায় কয়েকটি খাল ও নদী দিয়ে সরাসরি সাগরে গিয়ে পতিত হচ্ছে জৈব ও অজৈব বর্জ্য। এছাড়া জেলেদের অসচেতনতায় মারা পড়ছে ডলপিন, হাঙ্গর, কাছিমসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী। এতে করে সাগর দূষণের পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রাণী ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এসব সুরক্ষায় অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, কমিটির ১০টি সুপারিশের মধ্যে দুটি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই সংগঠনটি কুতুবদিয়া দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপ পযর্ন্ত কক্সবাজার উপকূলে জেলে, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের মধ্যে বছরব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।
২ সেপ্টেম্বর বিকালে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়ায় বাঁকখালী নদীর তীরে বছরব্যাপী এ কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে হঠাৎ অধিক পরিমানে বর্জ্য, কাছিম ও অন্যান্য প্রাণী ভেসে আসার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার।
কমিটির সদস্যরা জানান, ভেসে আসা বর্জ্য সমূহের মধ্যে দেশি ও বিদেশী উভয় প্রকার বর্জ্যের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭-৮% জৈব এবং ৯১-৯২% নানা ধরণের অজৈব বর্জ্য। এসব বর্জ্য সাগরের মহেশখালী চ্যানেল মুখ থেকে পাটুয়ারটেক বিচ পযর্ন্ত উপকূল হতে আনুমানিক ২০০ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বিভিন্ন সময়ে জমা হয়ে পরবর্তীতে প্রবল সমুদ্র স্রোত তীব্র বাতাস ও সুউচ্চ জোয়ারের সমন্বিত শক্তির প্রভাবে বর্জ্য সমূহ সমুদ্র সৈকতে ভেসে আসে।
কাছিম ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর বিষয়ে কমিটির সদস্যরা জানান, শারিরীক দূর্বলতা ও আহত হওয়ার কারণে কাছিম এবং অন্যান্য প্রাণী ভেসে আসে। জেলেদের জালে কাছিমের জড়িয়ে যাওয়া, জাল মুক্ত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাছিমকে আঘাত করা, জড়িয়ে যাওয়া কাছিমসহ জাল কেটে দেয়া, সামুদ্রিক ঝড়ে জেলেদের ফেলে দেয়া জালে কাছিমগুলো আটকে যাওয়াসহ নানা কারণ রয়েছে। এছাড়া কাছিমগুলো বর্জ্যাধার এলাকায় কাছিমগুলো বিচরণ করে থাকতে পারে বলেও ধারণা করছেন তারা।
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী- অন্ত্রনালীর প্রদাহ, ক্ষুধামন্দা ও দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার কারণে অস্থি কঙ্কালসার হয়ে কাছিমগুলো মারা যায় বলে উল্লেখ করা হয়। ১৭২টি কাছিম ভেসে আসলে তার মধ্যে ২২টি মারা যায় এবং ১৫০টি জীবিত অবস্থায় সমুদ্রে অবমুক্ত করা হয়। এর মধ্যে অধিকাংশই জলপাই রং এর অলিভ রিডলে এবং বাকিগুলো গ্রীন টার্টল। সামুদ্রিক সাপ ও মাছের ক্ষেত্রে বর্জ্যের সাথে আটকে ভেসে আসার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়।
অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশগুলো হলো যথাক্রমে-
১. বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা এলাকায় বর্জ্য আধার বা বর্জ্যবলয় এর অবস্থান, আয়তন ও গভীরতা চিহ্নিত করা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের উপর উক্তরূপ বর্জ্যের প্রভাব নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর অধীনে একটি বিশদ গবেষণা পরিচালনা করা।
২. সাগরে পতিত সকল খাল/নদীতে বিভিন্ন উৎস হতে আগত সকল ধরণের বর্জ্যের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করার জন্য জেলা প্রশাসক, কক্সবাজারের নেতৃত্বে একটি স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহন করে তা বাস্তবায়ন করা, বর্জ্যের বৃহত্তর উৎস কক্সবাজার পৌরসভাসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্টান সমূহের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করা।
৩. দেশের জলসীমায় নদী ও সাগরে যে সব নৌযান নিয়ে জেলেরা মৎস্য আহরণ করতে যায় সে সব নৌযানের তালিকা প্রনয়ন ও নৌযানে রাখা মালামালের ইনভেনটরী করা এবং উক্ত ইনভেনটরী মৎস্য অধিদফতর কর্তৃক যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা।
৪. সমুদ্র ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রে চলাচলকারী সকল নৌযান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় সাধন, জেলেদের মাছ ধরার নিয়ন্ত্রণসহ সামুদ্রিক প্রতিবেশ ও পরিবেশ রক্ষার্থে জেলা প্রশাসকের অধীন একটি রিভিউ কমিটি গঠন করা, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করে দেশি/বিদেশী জাহাজ থেকে নিক্ষিপ্ত/ নির্গত বর্জ্য বিষয়ে উক্ত সংস্থার মাধ্যমে তদারকি করা, সমুদ্র সম্পদ রক্ষায় উক্ত কমিটিকে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা।
৫. কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে ভেসে আসা সকল আহত কাছিম, ডলপিনকে সুরক্ষা ও চিকিৎসা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর অধীনে মেরিন লাইফ হাসপাতাল ও আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন।
৬. আন্তর্জাতিক আইন মেনে পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহের সাথে ‘সামুদ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক যৌথ কমিটি গঠন করা যাতে স্ব স্ব দেশ তাদের উপকূলীয় আবর্জনার সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জেলেদের সমুদ্র দূষন কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
৭. মার্চেন্ট এবং ফিশিং ভ্যাসেলসমূহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পিরিওডিক্যালি মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা।
৮. জেলেদের জালে সামুদ্রিক কাছিম বা মাছবিহীন অন্যকোন প্রাণী বাধলে জাল না কেটে জালগুলো যথাসম্ভব উঠিয়ে নিয়ে আসার জন্য ডিভাইস ব্যবহার করে কাছিম/সামুদ্রিক প্রাণীকে সাগরে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করা।
৯. জেলেরা মাছ ধরার ছোট/বড় সামুদ্রিক জাহাজ/নৌযানে উৎপাদিত বর্জ্য যেন সাগরে না ফেলে সে বিষয়ে মৎস্য অধিদফতর ও পরিবেশ অধিদফতরের মাধ্যমে জেলেদের সচেতন করা।
১০. সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার জনপ্রতিনিধি, মৎস্যজীবী এবং পর্যটকদের মাঝে সচেতনতা তৈরীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় সচেতনতামূলক কর্মশালা গ্রহন করা।
উল্লেখ্য, ১১ ও ১২ জুলাই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্ট থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত এলাকায় অত্যধিক পরিমান জৈব ও অজৈব বর্জ্য সৈকতে ভেসে এসে জমা হয়। ভেসে আসা কাঁচের বোতল, প্লাস্টিক সামগ্রী, ছেঁড়া জালসহ নানা বর্জ্য প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যহানি এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্বক হুমকি সৃষ্টি করে।
এসবের সাথে ভেসে আসে জীবিত ও মৃত কাছিম, সাপ, কাঁকড়া প্রভৃতি। এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) আহবায়ক করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।