এন এ সাগর:
কক্সবাজারে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় অভিযানে বিশাল হোঁচট খেয়েছে কৃষি বিভাগ। লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯০ শতাংশ ধান কৃষি বিভাগকে বিক্রি করেনি কৃষকেরা। দাম কম, ধান বিক্রিতে হয়রানি, টাকা উত্তোলনে বখশিশ ফাঁদ সহ নানা কারণে সরকারের কাছে ধান বিক্রি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কৃষকেরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শেষ হয়েছে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ অভিযান। জেলায় বোরো মৌসুমে ৮ হাজার ২৬৭ মেট্টিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা করেছিল কৃষি বিভাগ। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পুরো মৌসুম জুড়ে ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬ মেট্টিক টন। যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১২.১৮ শতাংশ পূরণ হয়েছে। ঘাটতি রয়ে গেছে বিশাল অংশ।
কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বুরো মৌসুমে আলোর মুখ দেখেনি ধান সংগ্রহ অভিযান। সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহী নয় কৃষকেরা। সরকারের কাছে ধান বিক্রি না করার পেছনে কম দাম, অধিক পরিবহন খরচ, গুদামে হয়রানি, ব্যাংকে বকশিশ সহ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন কৃষকেরা।
কৃষকেরা জানায়, সরকার কৃষকের কাছ থেকে কেজি প্রতি ২৬ টাকা করে ধান ক্রয় করেন। কিন্তু মিল মালিক ও পাইকারী ধান ব্যবসায়ীরা কৃষকের বাড়ি গিয়েই ২৪-২৫ টাকায় ধান কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু সরকারের কাছে ২৬ টাকায় ধান বিক্রি করেও অতিরিক্ত খরচসহ নানা কারণে লাভের মুখ দেখেন না কৃষকরা। যার কারণে খাদ্য গুদামের পরিবর্তে পাইকারী ধান ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করা হচ্ছে। করোনা সংকটে কেজি প্রতি সরকারিভাবে আরও মূল্য বাড়ালে কৃষকেরা লোকসানের পরিবর্তে কিছুটা লাভের মুখ দেখবে।
খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধান ক্রয়ে তালবাহনা নিয়ে কথা বলেছেন সদর উপজেলার কৃষক আফজান হোসেন, মোতালেব উদ্দিন ও মো. শহিদ। তারা বলেন, বিআরডিসির বীজে ৩০০ থেকে ৩৫০ অপুষ্টি ধান থাকে। অন্যান্য কোম্পানীর বীজেও একই পরিমাণ অপুষ্টি ধান হয়। ধান মাড়াইয়ের পরও ১৫০-২০০ অপুষ্টি ধান থেকে যায়। অপুষ্টি ধানের অজুহাতে খাদ্য গুদামে ধান নেয়া হয় না। কিন্তু খাদ্য গুদামের কর্তা ব্যক্তিদের বখশিশ দেয়া হলে পঁচা ধানও নিমিষেই কিনে নেয়। কিন্তু অনেক কৃষক বকশিশ দিতে না পেরে সরকারের কাছে ধান বিক্রি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
তারা আরও বলেন, একজন কৃষক থেকে সর্বোচ্চ ২-৩ টন ধান কেনা হয়। ইসলামপুর, ইসলামাবাদ, জালালাবাদ, ঈদগাঁও, চৌফলদ-ী, মাছুয়াখালী থেকে ধান আনতে একজন কৃষকের পরিবহন খরচ হয় ৬-৭ হাজার টাকা। টন প্রতি পরিবহণ খরচ সহ কষ্ট করে খাদ্য গুদামে ধান আনলে কর্মকর্তারা নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখে। খাদ্য গুদাম অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারিদের বখশিশ দিতে হয়। টাকা না দিলে অপুষ্টি ধান বলে প্রতিবেদন দেয়। আর টাকা পেলেই সব মাফ।
কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন, খাদ্য গুদামে কোনমতে ধান বিক্রি করলেও চেক নগদায়ন করতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একজন কৃষককে চেক প্রতি ২০০ টাকা ঘুষ দিতে হয় সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে। সোনালী ব্যাংকে কৃষকের একাউন্ট না থাকলে অন্য ব্যাংক থেকে টাকা পেতে কৃষকদের দৌঁড়ঝাপ দিতে হয় ২ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত। তাই এতো ঝামেলায় না গিয়েই কৃষকেরা বাড়িতেই পাইকারী ধান ব্যবসায়ী ও মিল মালিকের প্রতিনিধিদের কাছে ২৪ থেকে ২৫ টাকা কেজি প্রতি ধান বিক্রি করে দেন। এতে কোন ধরণের খরচও পড়ে না। দুর্ভোগের জন্য কৃষকরা আর খাদ্য গুদামে ধান নিয়ে যান না।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে কক্সবাজারের ৮ উপজেলার ৬ হাজার ২৩২ জন কৃষক থেকে ৮ হাজার ২৬৭ মেট্টিক টন ধান ক্রয়ের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু মৌসুম শেষে মাত্র ৪২৬ জন কৃষক সরকারের কাছে ১ হাজার ৬ মেট্টিক টন ধান বিক্রি করেছে। তার মধ্যে চকরিয়ার ৫৪ জন কৃষক থেকে ১৮৫ মে. টন, পেকুয়ার ৩ জন কৃষক থেকে ৮ মে.টন, রামুর ১৩৪ জন কৃষক থেকে ৩২২ মে.টন, সদরের ৪৭ জন কৃষক থেকে ১৪৭ মে.টন, উখিয়ার ১৭২ জন কৃষক থেকে ৩০৪ মে.টন, মহেশখালীর ৮ জন কৃষক থেকে ১৯ মে.টন ও কুতুবদিয়ার ৮ জন কৃষক থেকে ২০ মে. টন ধান ক্রয় করা হয়েছে। টেকনাফের কোন কৃষক সরকারের কাছে ধান বিক্রি করেনি।
সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে কৃষকের অনাগ্রহের কারণ নিয়ে কথা বলেছেন কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আবুল কাশেম। তিনি বলেন, সরকারের নিকট ধান বিক্রি করলে তা স্ব স্ব উপজেলা অফিসে পৌঁছে দিতে হয়। এতে কষ্টের পাশাপাশি খরচ হয় অধিক। তাই কৃষকেরা দিন দিন সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। বিষয়টি সরকারের উর্ধ্বতন মহলে জানানো হবে।