অরিজিৎ বিশ্বাস:
২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট মিয়ানমার থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোহিঙ্গার ঢল নামে বাংলাদেশে। প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে এই দেশের মাটিতে। যদিও এটি প্রথমবার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নয়।
৮০ এবং ৯০ এর দশকেও রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ঘটে, তবে সেটা সংখ্যায় এতো বেশি ছিলোনা। কিন্তু এই দীর্ঘসময় ধরে তাদের অবস্থান কিংবা ২০১৭ সালের ঘটনা কোনোটাই সুখকর নয়। রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশকে পরিবেশ বিষয়ক চ্যালেঞ্জগুলো খুব ভোগ করতে হচ্ছে।
তাদের বর্ধিষ্ণু বাসস্থান ক্রমাগত পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। নিরাপত্তার দিক থেকে স্থানীয়দের জন্য এসব মোটেও সুখকর অভিজ্ঞতা হচ্ছে না। অপরাধ বেড়েই চলেছে। বলা যায়, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ।
এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ শুরুতে প্রতিবেশী বন্ধু ভারতকেও পাশে পায়নি। লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছে একাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশে থাকার প্রকাশ ঘটছে বিবৃতি ও রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্যের মাধ্যমে। তখনই আবির্ভূত হয়েছে গাম্বিয়া।
অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কো-অপারেশনের (ও.আই.সি ) সদস্যভুক্ত দেশ হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা করে। এই মামলার প্রেক্ষিতে সত্যিকার অর্থে চাপ সৃষ্টি হয় মিয়ানমারের উপর। বিশ্ব সম্প্রদায় আরো শক্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের পক্ষে।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তরুণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি এর অবশ্যই টেকসই ও গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ প্রয়োজন-
১. রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র দিতে হবে এবং স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের এলাকায় পরিবেশ ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়াও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য সাময়িকভাবে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী থাকবে।
৩. বাংলাদেশ থেকে নিবন্ধিত সকল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করে নিতে হবে। অনিবন্ধিতদের সংখ্যা নিবন্ধিতদের চাইতেও বেশি, তাই ওদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।
৪. ২০১৭ সালে ২৫শে আগস্টের রোহিঙ্গা ঢলের পেছনে যারা ইন্ধন দিয়েছে, গণহত্যা – ধর্ষণ, অত্যাচারে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলো; তাদের যথাযথ বিচার করতে হবে।
৫. রোহিঙ্গা সমস্যার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেক্ষেত্রে যথাযথ রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তাদের সামাজিক ও আর্থিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, এই সমস্যা একান্তই বাংলাদেশের নয়। ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, আফ্রিকাসহ বেশ কিছু দেশেই রোহিঙ্গাদের অবৈধ উপস্থিতি রয়েছে।
এতেই বোঝা যায়, রোহিঙ্গা সমস্যাটা বৈশ্বিক। তারা নিপীড়নের শিকার যুগের পর যুগ ধরেই। এতোদিন ভারত চুপ থাকার পর তারা বাংলাদেশের পক্ষে সরব হয়েছে।
আগামী জানুয়ারিতে ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পাবে, সেখানে তারা রোহিঙ্গা বিষয় উত্থাপন করবে বলে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে। যদিও আগে বেশ কয়েকবার বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে উঠলেও, রাশিয়া এবং চীনের আপত্তির কারণে তা বেশিদূর আগায়নি।
কিন্তু, আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের অন্তবর্তীকালীন আদেশ নিশ্চিতভাবে চাপে ফেলেছে চীনকে। তাই তারা আলোচনার উদ্যোগও নেয়, কিন্তু খুব ফলপ্রসূ পদক্ষেপ বা সমাধান এখনো আসেনি। মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপও তাই আরো বৃদ্ধি করা খুব প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে ও কানাডা সরকার তা করবে বলেই বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে। কূটনৈতিক চাপ ও আলোচনা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যা অচিরেই সমাধান হবে বলে বিশ্বাস করি।
যদিও ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ বেশ কয়েকবার আলোর মুখ পেলেও, ফলপ্রসূতা আসেনি। তারপরও সময় বলছে খুব অচিরেই আমরা টেকসই কোনো পদক্ষেপ দেখতে যাচ্ছি।
লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।