তানভিরুল মিরাজ রিপন:
চলতি মাসের শুরু থেকে হঠাৎ সহিংস হয়ে উঠে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। গ্রুপে গ্রুপে একটানা চলে সশস্ত্র সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে ৮ জন নিহত হয়। আহত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। অপহরণেরও শিকার হয় একাধিক রোহিঙ্গা। ঘরছাড়া হয় শত শত সাধারণ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সহিংসতার ঘটনাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হলেও এবারের লাগাতার সংঘর্ষ ছিল অনেকটা ভয়ংকর। স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কোনভাবেই তোয়াক্কা করছিল না আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকেও।
কিন্তু গত কিছুদিন ধরে ক্যাম্পে সংঘর্ষ বা অপহরণের কোন ঘটনা ঘটেনি। বিরাজ করছে শান্ত পরিবেশ। আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে দাবী রোহিঙ্গা নেতাদের। কিন্তু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা সাময়িক গা ঢাকা দিলেও ফের তৎপর হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাই গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করার দাবী জানান সাধারণ রোহিঙ্গারা।
তথ্যমতে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহিংসতার ফলে গত ছয়মাসে খুন হয়েছে ৬১ জন। রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা যেনো নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। সেখানে ঘটনা না হওয়ায় যেনো একটি আশ্চর্যেরও বিষয়। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৮ জন রোহিঙ্গা দু-গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হয়। এতে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। ইউএনএইচসিআর বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিল কর্মবিরতির কথা। এবং সে সাথে ইউএনের এই এনজিওটি জানিয়ে দিয়েছিল তাদের উদ্বেগের কথাও। পরে সেটা তারা তুলে নিয়েছিল।
মাদক চোরাকারবার, সোনা চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার, অস্ত্র ব্যবসাসহ রোহিঙ্গারা প্রায় ১৪ ধরনের অপরাধে জড়িত। রাত নামলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প রাজ করে অঘোষিত ১৪ টি ডাকাত দল। যেনো তাদের কথাতেই ওঠবস করতে হয় সাধারণ রোহিঙ্গাদের। ক্যাম্পেই গড়ে ওঠেছে অনুমোদনহীন বাজার। যে বাজারগুলোতে পাওয়া যায় না এমন কিছু নেই। তাই বাজার দখল আর চাঁদাবাজি কারাটাই যেনো রোহিঙ্গা ডাকাতদের কাজ। ত্রাস সৃষ্টি, গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষে আকস্মিকভাবে জড়িয়ে পড়ে তারা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও রোহিঙ্গা নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফরিদুল আলম বলেন, রোহিঙ্গারা সহিংস হওয়ার পেছনে কাজ করে কিছু স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী। তাদের আশ্রয় পশ্রয়ে রোহিঙ্গারা সহিংস কাজ করতে সাহস পাচ্ছে। তবে ঘটনা কমে যাওয়ার কারন সরকারের উপরমহল মনোযোগ সহকারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প নজরদারি করছে। আর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া নির্মানের ফলে সহিংসতার ঘটনা কমে আসবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, খুন ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ধর্ষণ ৩৫টি এবং অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি। গত তিন বছরে প্রায় ১৪ ধরনের অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ৭৩১টি মামলা হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে জেলে আছে প্রায় ৫৬০ জন পুরুষ ও ৪৮ জন নারী রোহিঙ্গা।
কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা যুবক কলিম উল্লাহ বলেন, আগে আমাদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করতো। এখনো তাদের ত্রাস আছে। পুলিশ তৎপর আছে তাই ইদানীং কম দেখতে পাচ্ছি।
নয়াপাড়া ক্যাম্পের মাঝি ওসমান বলেন, পুলিশ খুব অপারেশন চালাচ্ছে তাই তারা আর সুযোগ পাচ্ছে না। এগুলো যারা করে তাদের পুলিশকে ধরিয়ে নিলে আমরা আরও স্বস্তিতে থাকবো। তবে আমরা স্বদেশে (মিয়ানমারে) ফেরত যেতে চাই।
১৪ এপিবিএন এর সেকেন্ড কমান্ডিং অফিসার (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) রাকিব খান বলেন, আমাদের কন্ট্রোলে নিয়ে আসার সকল চেষ্টা আমরা করেছি। পাশাপাশি বিভিন্ন সংঘর্ষের নেতৃত্বে থাকা ৫ টি গ্রুপের সাথে আমরা বসেছি। কথা বলেছি। তাদের মধ্যে যে অবিশ্বাস ও দূরত্ব আছে তা কমিয়ে আনবার চেষ্টা করছি আলোচনার মাধ্যমে৷ সে সাথে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে পুলিশের সম্পর্ক তৈরী করছি যাতে পুলিশকে সহায়তা করে ও বন্ধুভাবে।
তিনি আরও বলেন, যারা যারা সংঘর্ষে জড়িত তাদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলমান। এবং ডাকাতরা যে যে পয়েন্টগুলো দিয়ে ক্যাম্পে প্রবেশ এবং বের হয় তা আমরা চিহ্নিত করে চেকপোস্ট বসিয়েছি। আমরা রোহিঙ্গাদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করেছি বলেই কমে আসছে ক্যাম্পের সংঘাত।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৬ এপিবিএন এর কমান্ডিং অফিসার (পুলিশ সুপার) মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম বলেন, আমরা তৎপর আছি। এবং নেটওয়ার্কিং বাড়াচ্ছি যাতে ঘটনা কমে আসে।
এ দিকে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নেতারা ক্যাম্পের সহিংসতা বিরোধী বিবৃতি দেওয়াতে গুরুত্বপূর্ন ৯ জন রোহিঙ্গা নেতাকে জাতির শত্রু বলে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে অবস্থান করেছে রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ। এই গ্রুপটি চায় না ক্যাম্পে সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ হোক।

অন্যদিকে সহিংস কর্মকাণ্ড কমে আসাতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ও স্থানীয়দের জন্য স্বস্তিকর একটি খবর। সাধারণ রোহিঙ্গাদের কেউই এই সহিংসতার পক্ষে নয়। তারা চায় নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও নিজদেশে ফেরত গিয়ে নিরাপদ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে কূটনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে। গাম্বিয়া ৫০০ পৃষ্ঠার স্মারক জমা দিয়েছে আইসিজেতে। চীন বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছে করোনা মহামারীর পর ফেরত যাবে রোহিঙ্গারা। অন্যদিকে মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচন আগামী মাসে। তারপরেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থামিয়ে রাখেনি মিয়ানমার। এরপরও সাধারণ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাশা তারা ফিরে যাবে নিজদেশে।