তানভিরুল মিরাজ রিপন:
‘পরিণতি খারাপ হবে’ বলে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল মালয়েশিয়া থাকা আব্দুল খালেক নামের এক রোহিঙ্গা যুবক। তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোচনাও হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের লাগামহীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কক্সবাজারের ৩১ টি ক্যাম্পে চলমান আছে। ডাকাতি, ইয়াব ব্যবসা, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, মানব পাচারের মত এমন কোন অপরাধ নাই রোহিঙ্গারা করছে না।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আতংকের নাম আরসা তথা আল ইয়াকিন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটি। আরসা (আরকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি) থেকে ২০১৬ সালে নাম পাল্টে আল ইয়াকিন নাম ধারন করে।সৌদি আরব এবং পাকিস্তানে বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গাদের একটি ছোট্ট গ্রুপ এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছে।
বিচ্ছিন্নতবাদী সংগঠনটি যেনো রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কারণ। সংগঠনটি ক্যাম্প জুড়ে হুমকি, রাহাজানি, এবং তাদের কথা মেনে না নিলে বীভৎসভাবে খুনও করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গুলোর খবরের শিরোনামও হয়েছে বহুবার। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আল ইয়াকিন গোষ্ঠী চায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কঠোর ইসলামিক বিধান জারি করতে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আরসা এমনই এক নাম, যেটি শুনলে যেকারো কান খাড়া হয়ে যায় এবং এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এই গোষ্ঠীর চর, যাদের মধ্যে শিশু-কিশোররাও আছে, সবখানে ছড়িয়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।
এ বিষয়ে সাধারন রোহিঙ্গারা মুখ খুলতে নারাজ। শুধুই কি রোহিঙ্গারা আতংক গ্রস্থ? ক্যাম্পের বাইরেও এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গুলোর তৎপরতা গণমাধ্যমের নজরে এসেছে। যদিও বাংলাদেশ সরকারের দাবি বাংলাদেশ এ কোনো আরসা (আল ইয়াকিন) সদস্যদের উপস্থিতি নেই। নিজেকে আরসা সদস্য দাবি করা এক রোহিঙ্গার দাবি ৩১ টি ক্যাম্পে এখন প্রায় তিন হাজারেরও বেশি সদস্য আছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে আলাদা আলাদা গ্রুপে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারে চলে যান।
তার দাবি, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে মিয়ানমারের চর হিসেবে কাজ করে এমন কাউকে পেলে তাকে হত্যা করে আরসা। ইতোমধ্যে এরকম কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও জানান ৷ তিনি দাবি করেন, আরসা কখনো কখনো মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপহরণও করে।
আল ইয়াকিন গোষ্ঠীর বিষয়ে মুখ খোলতে নারাজ রোহিঙ্গারা । রোহিঙ্গা শিবিরে এনজিও সংস্থাগুলোতে সেচ্ছাসেবী হিসেবে চাকরি করছে এমন অনেক নারী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের দাবি, পরিবারের ওপর হুমকি আসছে। মহিলারা চাকরি করা ইসলাম সমর্থন করে না তথা আল ইয়াকিনও সমর্থন করে না। এর ফলে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছে। ২০১৯ এ খুন হওয়া এক রোহিঙ্গার স্ত্রীও এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
ক্যাম্পগুলোতে শুধু আল ইয়াকিনের তৎপরতা নয় ব্যক্তির নামে গড়ে ওঠছে ভিন্ন ভিন্ন ডাকাত দল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ফাঁকি দিয়ে করছে ডাকাতি, অপহরণ। ১ মে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এক কৃষককে খুন করে। সাথে আরও টেকনাফের ৬ জন স্থানীয়কে অপহরণ করে দাবি করেছে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ। ২০ জানুয়ারি উখিয়ার এক স্থানীয় যুবককে অপহরণ করে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
যদিও ইয়াবা কারবারি নিয়ে এ অপহরণ। অপহরণ,ডাকাতি খুন তো নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। গত মার্চে র্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে অজি উল্লাহ নামে এক রোহিঙ্গা ডাকাত নিহত হয়েছে। এসময় তার কাছে সেনাবাহিনীর জ্যাকেট ও র্যাবের পোশাক পাওয়া যায়। র্যাবের সাথে বিভিন্ন সময় চলা বন্দুক যুদ্ধে সাতজন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নিহত হয়। এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলমান আছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬৮ জন নিহত হয়েছে। তার মধ্যে ৫১ জন রোহিঙ্গা ছিল। তাদের মধ্যে ২৬ জন সক্রিয় ডাকাত ছিল। বাকিরা মাদক কারবারি।
গত দুই বছরে ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে অন্তত ৪৫টিরও বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ বলছে, টেকনাফে ২০১৮ সালে ৯ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।চলতি বছরের ২৪ আগস্ট ১৩ লাখ ইয়াবা পাচার কালে দুই রোহিঙ্গা র্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হয়৷ র্যাবের দাবি এটি দেশের সবচেয়ে বড় ইয়াবার চালান। এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে ১২৩ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তার মধ্যে ৩৭ জন রোহিঙ্গা ছিল।
সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রকাশ করা একটি প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ১১ ধরণের অপরাধে ৭৩১ টি মামলা হয়েছে। এতে আসামী হয়েছে ১৬৭১ জন রোহিঙ্গা।
ওই প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হত্যা মামলা হয়েছে ৫৩ টি। এতে আসামী করা হয়েছে ১৯২ জন রোহিঙ্গাকে। অস্ত্র মামলা হয়েছে ৫৯ টি, এতে আসামী হয়েছে ১৪৮ জন। সর্বোচ্চ বেশি হয়েছে মাদক মামলা। মামলার সংখ্যা ৪১০ টি এবং আসামী ৭০২ জন। ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টায় মামলা হয়েছে ৩৫ টি, আসামী হয়েছে ৬০ জন। ফরেনার অ্যাক্ট (বিদেশ আইন) মামলা ৩৮টি, আসামী ৭৬ জন। অপহরণ মামলা ১৬ টি, আসামী ৮২ জন। বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা ২৬টি, আসামী ৫১ জন। ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপরও হামলা করেছে রোহিঙ্গারা। পুলিশ আক্রান্ত সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩টি, আসামী ২৮ জন। ডাকাতি ও ডাকাতি প্রস্তুতির মামলা হয়েছে ১০ টি, আসামী ৪৬ জন। মানবপাচারের মামলা হয়েছে ২৮ টি, আসামী ১৩৭ জন। অন্যান্য আইনে মামলা হয়েছে ৫৩ টি, আসামী ১৪৯ জন রোহিঙ্গা।
কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে সক্রিয় রয়েছে ১৫টির বেশি সন্ত্রাসী বাহিনী। এসব গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যেমন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটাচ্ছে, তেমনি স্থানীয় অর্থাৎ দেশের জন্যও হুমকি হয়েছে উঠছে সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা। যার বড় প্রমাণ অল্প সময়ে খুনের মামলা হয়েছে ৫৩ টি।
২০১৬ সালের ১৩ মে টেকনাফের মুছনী রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায় হাকিম বাহিনী। সে সময় আনসার কমান্ডার আলী হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে নিয়ে যায় ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র।
স্থানীয় জনসাধারণদের অনিরাপত্তা, আতংকের মধ্যে কাটাতে হচ্ছে দিন।
আরসা তথা আল ইয়াকিন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে জানতে চাইলে ১৬ আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়ান কমান্ডিং অফিসার মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম ভয়েসওয়ার্ল্ডকে জানান, রোহিঙ্গাদের অনেকগুলো গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ জড়ায়। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আমরা একশন নিচ্ছি। আরসা তথা আল- ইয়াকিনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে জানান, যদি ব্যানার ব্যবহার, সংগঠনের নামে স্লোগান, মিছিল, মিটিং করে তখন আমরা সে বিষয়টি খতিয়ে দেখব। এখন পর্যন্ত এসব নিয়ে কোনো তথ্য আমরা পাইনি সেহেতু এ নামের কোনো সংগঠনের কারাযক্রম নেই। তবে রোহিঙ্গাদের বলতে শুনি আল-ইয়াকিন বনাম সালমান গ্রুপের সাথে সংঘর্ষ চলে৷ আমাদের কাছে এরা অস্ত্রবাজ। এবং ক্যাম্পে যারা অস্ত্রবাজি করবে তাদের বিরুদ্ধে আমরা সবসময়ই অ্যাকশন নিই।
আল-ইয়াকিনের অস্তিত্ব প্রসঙ্গে নৃবিজ্ঞানি ড. রাহমান নাসির উদ্দিন ভয়েসওয়ার্ল্ডকে জানান, আরসার উপস্থিতি বাংলাদেশে নেই। আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ থেকে সে দাবি করছি। এতোগুলো মানুষ ছোট একটি জায়গায় বসবাস করছে, এর ফলে একটা মানসিক প্রভাব পড়েছে তার ফলে সংঘর্ষে জড়িয়ে যাচ্ছে৷ এটি ঘটা স্বাভাবিক, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আরসা নেই৷
কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১০ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা শরনার্থীর বসবাস। সাড়ে দশ-লাখের অধিক রোহিঙ্গা বিভিন্ন গ্রুপ উপগ্রুপ ভাগ হয়ে করছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। অনুসন্ধান বলছে আরসার উপস্থিতি আছে৷ অন্যদিকে আর্ম পুলিশের দাবি আরসা নেই। তবে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে প্রচলিত আছে আরসা তথা আল ইয়াকিন আছে।