‘রামু ট্রাজেডি’র ১১ বছর। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে ধর্মীয় সম্প্রীতির লীলাভূমি খ্যাত কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধ পল্লীতে ঘটেছিলো নারকীয় ও বর্বর সহিংসতার! যেটি ‘রামু ট্রাজেডি’ নামে পরিচিত। উগ্র ধর্মান্ধদের দেয়া আগুনে পুড়েছিলো বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধদের বহু বাড়িঘর। এ ঘটনায় শত বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বড় ধরনের ফাটলের সৃষ্টি হয়। বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগে হারানো সেই সব বৌদ্ধ স্থাপনা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তবে সেই ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি।
কিন্তু এঘটনায় দায়ের করা ১৯ মামলার ১৮টি বিচারাধীন। কিন্তু বিচার কার্যক্রমের কোনো অগ্রগতি নেই। কারণ হিসেবে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধরা এ হামলার আর বিচায় চায় না! তাই মামলার সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসে না আদালতে।
একারণে এখনো আলোর মূখ দেখেনি এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো। মামলার চার্জশিট দাখিল নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ। বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন বলছেন, এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে চিহ্নিত অনেক মানুষ মামলার আসামি নন। তদন্তে অনিয়মের কথা বলছেন তারা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনার পর কক্সবাজারের চারটি উপজেলায় ১৮টি মামলা করে পুলিশ। যেখানে আসামি করা হয় ১ হাজার ২০ জনকে। যারা বর্তমানে সবাই জামিনে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আরও একটি মামলা করা হলেও তা পরে উঠিয়ে নেয়া হয়। পুলিশের করা ১৮ মামলা এখনও চলমান। অভিযোগপত্র দেয়া হলেও সাক্ষীদের অনীহার কারণে এখনও মামলাগুলো আলোর মুখ দেখছে না। সম্প্রতি তিনটি মামলার অভিযোগপত্রে অসংগতি থাকায় পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। বাকিগুলো এখনও বিচারাধীন।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের রামুতে আলোচিত সম্প্রদায়িক সংঘাত হয়েছিল। যেদিন উত্তম বড়ুয়া নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডিতে পবিত্র কোরআন অবমাননাকর ছবি পোষ্ট করার অভিযোগ তুলে উস্কানিমূলক মিছিল সহকারে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা চালিয়ে বিহারে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এতে কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ১৩ টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০ টি বসত বাড়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ১৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রামু থানায় আটটি, উখিয়ায় ছয়টি, টেকনাফে দুটি ও কক্সবাজার সদর থানায় দুটি মামলা রেকর্ড হয়।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতের ঘটনার পর পুলিশ বাদি হয়ে এজাহারভুক্ত ৩৭৫ জন এবং অজ্ঞাত আরও ১৫/১৬ হাজারজনকে আসামী করে ১৮টি মামলা করে পুলিশ। পরবর্তীতে এসব মামলায় প্রায় ১ হাজারেরও বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র জমা দেয় পুলিশ। কিন্তু ১১ পার হলেও এখনো পর্যন্ত একটি মামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি। এ অবস্থায় বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা।
আর যার ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ নিয়ে ওই ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়, উত্তম বড়ুয়া নামের সেই বৌদ্ধ যুবকের সন্ধান মেলেনি আজও।
তবে তার মা মাধু বড়ুয়ার ধারনা, উত্তম বেঁচে আছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে অর্থকষ্টে চরম দুরাবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানালেন উত্তমের বাবা সুদত্ত বড়ুয়া।
অভিযোগ, উত্তম বড়ুয়া নামের এক বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুক প্রফাইলে পবিত্র কোরআন অবমাননা করা হয়েছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে উত্তজনা বাড়তে থাকে রামুর বৌদ্ধপল্লীগুলোতে। পরে ঘটনা আর শুধু উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
মিছিল মিটিং, ভাংচুর লুটপাট চালিয়ে ওইদিন পৌনে ১২টার দিকে প্রথম অগ্নিসংযোগ করা হয় ফতেখাঁরকুলের শ্রীকুল গ্রামে অবস্থিত কয়েকশ’ বছরের পুরনো বৌদ্ধ পুরাকীর্তি লালচিং-এ। এরপর সাদাচিং, মৈত্রী বিহার, অপর্ণাচরণ বৌদ্ধ বিহার, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার, জাদীপাড়া আর্য্যবংশ বৌদ্ধ বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার, বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রসহ ১২টি বৌদ্ধ বিহারে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় রামু সীমা বিহার সংলগ্ন ২৬টি বসত ঘর। একই অভিযোগে পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ার বিভিন্ন বৌদ্ধমন্দিরে একই ধরনের হামলা হয়।
১১ বছরেও সন্ধান মেলেনি সেই উত্তম বড়ুয়ার:
যার ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা চালানো হয়, ঘটনার পর থেকে সেই উত্তম বড়ুয়া নিখোঁজ। এদিকে একমাত্র ছেলের সন্ধান না পেয়ে আর্থিক অভাব অনটনের মাঝে চরম দুর্দিন যাচ্ছে উত্তমের পরিবারে। একমাত্র ছেলে ফিরে আসবে এমন আশায় বুক বেঁধে আছেন রামুর ফতেখাঁরকুলের হাইটুপী গ্রামের বাসিন্দা উত্তমের বাবা সুদত্ত বড়ুয়া ও মা মাধু বড়ুয়া।
উত্তমের মা মাধু বড়ুয়া জানান, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ঘটনার দিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে মোবাইলে উত্তমের সঙ্গে কথা হয়েছিল। আমাদের যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে তখন তাকে ফোন দিয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছে, মা এই কাজ আমি করিনি, এটা ষড়যন্ত্র। এর পর পুলিশ আমার কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়। এটাই ছিল উত্তমের সঙ্গে শেষ কথা।
এরপর থেকে আর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ছেলে বেঁচে আছে কিনা জানি না। তবে আমার মন বলছে উত্তম বেঁচে আছে, বলেন মাধু বড়ুয়া।
তিনি বলেন, উত্তম ছিল সংসারের উপার্জনের একমাত্র ব্যক্তি। ১১ বছর হয়ে গেছে ছেলের কোনো হদিস নেই। অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছে এখন। এখন কেউ আর খবরও রাখে না।
উত্তমের বাবা সুদত্ত বড়ুয়ার বয়স এখন প্রায় ৬১ বছর। তিনি বলেন, বয়স হওয়াতে এখন কাজকর্ম করতে পারি না। হাঁপানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত। ছোট মেয়েটা প্রতিবন্ধী। এ অবস্থায় পরিবারের ভরণ পোষণ নিয়ে খুব কষ্টে আছি। এমন পরিস্থিতিতে ছেলের সন্ধানে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান উত্তমের বাবা সুদত্ত বড়ুয়া।
রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া আব্বু বলেন, এ ঘটনায় যে ১৮ মামলার বিচার কাজ এখনও ঝুলে আছে, সবকটি মামলার বাদী হচ্ছে পুলিশ। ১১ বছর পার হলেও কোনো মামলার বিচার শেষ হয়নি।
এসব মামলার প্রকৃত অপরাধীদের অনেককেই অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা খবর নিয়ে জেনেছি, ১১ বছরে এসে মামলাগুলোর সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃত অপরাধীদের অনেককে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ায় সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন, বলেন বিপুল।
এদিকে শুক্রবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এসব মামলার দ্রুত বিচারের দাবিতে রামু লালচিং-সাদাচিং-মৈত্রবিহার প্রাঙ্গনে মানববন্ধন কর্মসুচি পালন করে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ।
কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছিল ১৯ টি। এরমধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে ১৮ টি মামলা করেন। অপর একটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে মামলা করলেও পরবর্তীতে বিবাদীদের সঙ্গে আপোষনামা দিয়ে খালাস করেছেন। বিচারাধীন ১৮টি মামলায় স্বাক্ষী না পাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনকর্মকর্তা আরোও জানান, মামলায় কোনভাবেই স্বাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে রাজী হচ্ছে না। ফলে মামলা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকট হচ্ছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাও সাক্ষ্য দিতে বা হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী হচ্ছে না। তবে তিনি রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী হিসেবে এসব মামলার বিচারকার্য শেষ করতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি স্বাক্ষীদের আদালতে আসার অনুরোধ জানান।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা কেতন বড়ুয়া জানান, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে রামুতে মিছিল, মিটিং হয়েছে। অনেকেই চেনা গেছে। কিন্তু মামলার পরবর্তী যে প্রক্রিয়া তাতে অনেক চিহ্নিত ব্যক্তি যেমন বাদ পড়েছে তেমনি নিরাপরাধ অনেকেই হয়রানী হতে দেখা গেছে। বৌদ্ধ ধর্ম শান্তির। এখন সকলেই শান্তি চান; যে সম্প্রীতিতে রামুবাসি বসবাস করছে তা যে রক্ষা হয়। যদি বিচার করতে হয় তবে চিহ্নিতদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়।
কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রিয় সীমা বিহারের আবাসিক ভিক্ষুক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, আলোচিত এ হামলার ঘটনায় এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে সংকট তৈরী হয়েছিল তা অনেকটা ঘুছিয়েছে। এটা ধারাবাহিক রক্ষা করা জরুরী। বিচারের নামে প্রকৃত অপরাধিদের চিহ্নিত করা জরুরী। এটা করতে গিয়ে নিরাপরাধ কেউ হয়রানীতে শিকার হোক তা কোনভাবেই কাম্য নয়।
তিনি আরোও বলেন, আলোচিত এ হামলার ঘটনায় এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, গত ১১ বছরে তা অনেকটা ঘুচে গেছে। ঘটনার পর পর সরকার ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও বাড়ি ঘরগুলো পুণঃনির্মান করে দিয়েছে। বিশেষ করে পুনর্বাসনের দিকটায় সরকারের কোনো অবহেলা ছিল না। তবে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম অসন্তোষ রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয় এবং এক রাতে পুড়ে যাওয়া হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারে সবাইকে কাজ করার আহবান জানান এই বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু।
বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল এই রামু। কিন্তু ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এক রাতেই পুড়ে গেছে আমাদের হাজার বছরের গর্বের ধন সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি। আমরা বৌদ্ধ সম্প্রদায় শান্তিকামী জাতি। আমরা শান্তি চাই। ঘটনার পর পর সরকার ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ বিহার ও বসতঘর পূণ:নির্মাণ করে দিয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এবং সরকারের প্রচেষ্ঠায় বৌদ্ধ সম্প্রদায় সেই হারানো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বর্তমানে অনেকটা ফিরেছেও। কিন্তু সেই ঘটনার ১৮টি মামলার একটির বিচার কাজ শেষ হয়নি। এটাই আমাদের জন্য আশংকার বিষয়। কারণ অপরাধীর শান্তি না হলে ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এর আগে দিনটি উপলক্ষে সংঘদান, অষ্ট পরিষ্কার দান, ধর্ম সভায় দেশ জাতীর মঙ্গল ও সমৃদ্ধি এবং জগতের সকল প্রাণীর সুখ শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করা হয়। সংঘদান ও ধর্ম সভায় সভাপতিত বিজয় রক্ষিত মহাথেরো। প্রধান ধর্মদেশক ছিলেন সত্যপাল মহাথেরো। ধর্মালোচনা করেন শিলপ্রিয় মহাথরে, প্রজ্ঞাতিলক থেরো, প্রজ্ঞা বিনয় ভিক্ষু প্রমুখ।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক শাহীন ইমরান বলেন, বর্তমানে রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায় খুবই ভালো আছে। তাদের মধ্যে আবারও সেই শত বছর আগের সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। যে ঘটনা ঘটেছে, তার ক্ষত এখন আর নেই। সবকিছু বদলে গেছে। আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে যা যা করা প্রয়োজন, সব করব।