দিদারুল আলম (৩২)। গায়ে দামি স্যুট-কোট পরে চলাচল করেন। কথা-বার্তায় অমায়িক; চালচলনেও তার আভিজাত্যের ছাপ। এক সময়ের ছাত্রদল নেতা এখন যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে। সেগুলো ব্যবহার করেন সাইনবোর্ড হিসেবে। কথা-বার্তার ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটি মুখস্থ করা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে নিজেকে স্মার্ট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। অধিকাংশ সময় নিজেকে জাহির করেন কক্সবাজার সদরের বাংলাবাজার ষ্টেশনে গড়ে তোলা মডেল গার্লস হাইস্কুলের ডাইরেক্টর হিসেবে।
শুধু তাই নয়, বিভিন্ন এলাকার উচ্চ শ্রেণীর লোকজনের সাথে সখ্যতা গড়ে বসে আড্ডা দেন নামি-দামি রেস্টুরেন্টে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত দাবি করতে অভিজাত হোটেলে বসে ভোজন এবং তার পাতানো ফাঁদে পা দেওয়া লোকজনের সঙ্গে করেন আলোচনাও। ধোপ-দুরন্ত চলন-বলন দেখে এতদিন বোঝার উপায় নেই তার আসল পরিচয়।
ঝিলংজা ইউনিয়নের ৬ নং ওয়াডের মধ্যম মুক্তারকুল এলাকার মামলাবাজ নামে পরিচিত নুরুল হকের ছেলে দিদারুল আলম। একসময় দর্জির দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করা সেই দিদার এখন প্রতারণাকেই বেছে নিয়েছেন পেশা হিসেবে। নিজেকে কখনো স্কুলের ডাইরেক্টর, আবার কখনো এনজিওর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহ ক্ষেত্র বিশেষে নিজেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে উপস্থাপন করে জাল দলিল বানিয়ে জমি আত্মসাতের চেষ্টা, চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ট্রেড লাইসেন্স তৈরী, অধিক লাভের লোভ দেখিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্টানের বিনিয়োগের কথা বলে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। লোটপাট করেছেন একাধিক প্রতিবেশির আসবাবপত্রসহ জমিজমাও।
তার প্রতারণার টার্গেট থেকে বাদ যায়নি ঘনিষ্ট বন্ধুও। পরিজন-প্রতিবেশীসহ অনেকে বুক ভরা আশা নিয়ে তার ব্যবসায় অংশীদার হতে গিয়ে ফিরে আসেন নিঃস্ব হয়ে। এই দুষ্ট প্রতারক এভাবে নানা প্রলোভন দিয়ে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা। অথচ তিনি এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় জনসাধারণের মতে, কার বা কাদের ছত্রছায়ায় তার এমন বেপরোয়া জীবন যাপন তা খুজে বের করা দরকার।
অবশেষে শেষ রক্ষা হয়নি। ভুক্তভোগীদের পাহাড়সম অভিযোগ গড়িয়েছে থানা-কোর্টে। এইসব কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। এছাড়া গৃহ কর্মীকে ধর্ষণ চেষ্টাসহ পিলে চমকানো তথ্যের যাবতীয় কাগজপত্র এসেছে প্রতিবেদকের হাতে।
হাসপাতালের ছাড়পত্র ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে মধ্যম মুক্তারকুল এলাকার এক প্রবাসীর ১৩ বছর বয়সী এক গৃহকর্মীকে ধর্ষণ করেন প্রতারক দিদার। ভুক্তভোগী মেয়েটির গৃহকর্তা সিরাজ উল্লাহ বাদী হয়ে অভিযুক্ত দিদারকে আসামী করে আদালতে একটি ধর্ষণ মামলা করেন।
মামলাটির নথি থেকে জানা যায়, প্রতিবেশী দিদার ওই গৃহকর্মীকে কৌশলে নিজ বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এসময় মেয়েটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন চলে এলে দিদার দৌড়ে পালিয়ে যান। মেয়েটিকে উদ্ধার কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেল (ওসিসি) ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে স্বজনেরা ঘটনাটি গ্রামের প্রধানদের জানালে তারা বিষয়টি মীমাংসা করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানালে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
যদিওবা যথাযত স্বাক্ষী ও তৎবিরের অভাবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে সেসময় রক্ষা পেয়ে যান ধর্ষণে অভিযুক্ত দিদার। এরপর থেকে দিদারের টার্গেটে পরিণত হয় মামলার বাদী প্রবাস ফেরত সিরাজ উল্লাহ।
সম্প্রতি সদর থানায় করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে সিরাজ উল্লাহ তার পরিবারের সদস্যদের দিদার ও তার সহযোগীরা প্রতিনিয়ত প্রাণ নাশের হুমকি ও হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পূর্বে বেশ কয়েকবার হামলা করে। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার টেকপাড়ায় বসবাস করছেন। এই সুযোগে মুক্তারকুল এলাকাস্থ সিরাজের বাড়িতে ঢুকে দিদার ও তার সহযোগীরা ৬টি জানালার গ্রিল, ২টি পানির মটর, ঘরের ব্যবহারের ডেকসি-পাতিল, ব্লেন্ডার মেশিন, প্রেশার কুকার, থালা বাসন, কাপড় ছোপড়সহ তার পরিবারের ব্যবহারের প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় দিদার।
অভিযোগে উল্লেখ করে, এই ঘটনার বিষয় স্থানীয়ভাবে আপোষ মীমাংসা করার চেষ্টা করলেও দিদার লাঠিয়াল বাহিনী ব্যবহার করে স্থানীয় মেম্বার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের কথা কর্ণপাত করেনি। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য নাছির উদ্দিন আইনের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেন। এঘটনার প্রতিকার পেতে প্রশাসনের ধারস্ত হন ভুক্তভোগী সিরাজ।
অন্যদিকে দিদারের বাবা নুরুল হকও প্রতারণায় পিছিয়ে নেই ছেলের কোন অংশে। একটি ৫০টাকা দামের স্ট্যাম্পে দেখা যায়, ২০১১ সালে দেড় কড়া জমি বাবদ ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন সিরাজ উল্লাহর কাছ থেকে। ওই কাগজটিতে স্বাক্ষী হিসেবে নাম রয়েছে ঝিলংজার সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিদার মেম্বার।
সিরাজের দাবি, তার বাড়ির সীমানায় বাউন্ডারি দেয়াল দিতে গেলে নুরুল হক সেখানে তার জমির কিছু অংশ আছে দাবী করে এক ধরনের চাঁদাবাজি শুরু করেন। এতে তাকে প্রত্যক্ষ এবং প্ররোক্ষভাবে সহযোগীতা করেন দিদার মেম্বার।
সিরাজ উল্লাহ বলেন, আমি প্রবাসে থাকায় বাড়ির বাউন্ডারি দিতে গেলে নুরুল হক সেখানে তার জমি রয়েছে দাবি করে বাঁধা দেন। বিষয়টি দিদার মেম্বারকে অবগত করলে তিনিও আমার উঠানে নুরুল হকের দেড় কড়া জমি রয়েছে দাবি করে ২০ হাজার টাকা তাকে দিতে বলেন। তখন আমার দাবি ছিলো ওই দেড় কড়া জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দিদার মেম্বার একটি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে আমার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করে। যদিও পরে দেশে ফিরে জানতে পারি স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা দাগটি আশেপাশের কোথাও নেই। যা আমার কাছে এক ধরনের চাঁদাবাজি করেছে বলে মনে করেছি। বিষয়টি নিয়ে আমি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এব্যাপারে জানতে চাইলে দিদার মেম্বার বলেন, ২০১১ সালের ঘটনা তেমন মনে থাকার কথা না। স্ট্যাম্পে আপনার স্বাক্ষর দেখা যাচ্ছে ও রিজিস্টার্ড জমি এভাবে বিক্রি করার কোন সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে কখনো কখনো এই ধরণের কিছু অনিয়ম করে থাকি। আপনি অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে স্ট্যাম্পে একটি ভুয়া দাগ উল্লেখ করেছেন কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন সদোত্তর দিতে পারেন নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিচার-সালিশের নামে ওই এলাকার একটি প্রবীণ চক্র বিচার বানিজ্য করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। টাকা পেলে সাদাকে কালো আর কালাকে সাদা অর্থাৎ যেকোন রায় উল্টাতে সময় নেন না। এভাবে করে বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন চক্রটি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দিদারের কব্জায় রয়েছে ঝিলংজা ও পিএমখালী ইউনিয়ন পরিষদসহ সদরের ভূমি অফিস। দিদারকে টাকা দিলেই যেকোন কাগজপত্র হাতের কাছেই পাওয়া যায়। যদিওবা এইসব কাগজপত্র নকল ও ভুয়া। দর্জি ব্যবসার পাশাপাশি দিদারের ফোন-ফ্যাক্সের দোকান ছিল একসময়, তাই নকল ট্রেড লাইসেন্স, ভুয়া দলিল তৈরী সহ বিভিন্ন ডকুমেন্টস দিদার অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করতে পারে। দীর্ঘদিন থেকে প্রতারণা করে আসলেও দিদারের ব্যাপারে কেউ প্রতিবাদ করার সাহসও পান না।
সম্প্রতি একটি জাল দলিল ও নকল ট্রেড লাইসেন্সসহ নানা অপকর্মের চিত্র সামনে আসে। সেইসঙ্গে মুখ খুলতেও শুরু করেন ভুক্তভোগীরা। স্থানীয় ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিনের একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দিদারের তৈরি করা জাল দলিল ও ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তবে প্রতারক দিদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।
স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, দিদার এক শিক্ষকের যোগসাজশে শিক্ষার্থীদের ব্লাকমেইল বা বিভিন্ন উপায়ে অনৈতিক সম্পর্ক করে। এমনকি হোটেল-মোটেলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণও করা হয়। এইসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়। শুধু তাই নয়, এরপর থেকে দিদার ওই শিক্ষককে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেবেন ও প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে আসছেন প্রতিনিয়ত।
দিদারের ব্যাপারে জানতে চাইলে সেটি লম্বা ইতিহাস দাবী করে স্থানীয় যুবক ব্যাংকার হামিদ বলেন, সংক্ষেপে এতটুকু বলতে পারি; দিদার আমার বন্ধু। তার সাথে আর্থিক লেনদেন করার কারণে বর্তমানে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটি আর নেই।
মডেল গার্লস হাইস্কুলের পরিচালনা পষদের সভাপতি আনোয়ার স্যার বলেন, কোন ব্যাক্তির অপর্কমের দায়ভার স্কুলকতৃপক্ষ নেবেনা। কিছুদিন ধরে দিদারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ শুনা যাচ্ছে। তিনি যদি দোষী প্রমাণিত হয় পরিচালনা পষদ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
এইসব বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত দিদারের ব্যাক্তিগত মুঠোফোনের 01818059014 এই নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার এএসআই আবছার বলেন, দিদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত স্বাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।