• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন

পুলিশের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে ঘুরছে শীর্ষ ইয়াবা গডফাদার নফর-আমানু

নিজস্ব প্রতিদেক / ১৩৭৭ বার ভিউ
আপডেট সময় : বুধবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২১
পুলিশের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে ঘুরছে শীর্ষ ইয়াবা গডফাদার নফর-আমানু

নিজস্ব প্রতিবেদক

পুুলিশের কড়া অভিযানের মুখে ২০১৮ সালের শেষের দিকে এই এলাকার ইয়াবা কারবারিরা ‘ক্রসফায়ার’ ভয়ে পালিয়ে গেলেও টেকনাফে মেজর (অব.) সিনহার ঘটনার পর আবার এলাকায় ফিরেছে। পালিয়ে থেকে ইয়াবা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আসলেও এখন পুরনো সব নেটওয়ার্ক সচল করে কারবার চাঙা করার জন্য ইয়াবার আলোচিত মাফিয়া ডন হাজী আবু নফরের বাড়িতে দফায় দফায় বৈঠক করছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিস্ক্রিয়তায় যেন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে কারবারিদের মধ্যে।

হাজী আবু নফর মূলত রোহিঙ্গা। দীর্ঘদিন আবুধাবির দুবাইয়ে থাকার পর বাংলাদেশে চলে আসেন। বাংলাদেশে এসে কক্সবাজার শহরতলীর ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ ডিককুলে বসবাস শুরু করেন। দক্ষিণ ডিককুলের তৎকালিন সমাজ কমিটির নেতা জাফর ও তার ছেলে সালামের সহযোগিতায় উত্থান শুরু হয় নফরের।

শুরু করেন ইয়াবা কারবার। আলোচিত রোহিঙ্গা ইয়াবা কারবারি সিরাজুল ইসলাম সিকুইন্যার সাথে পার্টনারে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন নফর। ধীরে ধীরে ইয়াবা জগতের মাফিয়া ডনে পরিণত হন তিনি। অসাধু কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় বনে যান বাংলাদেশী নাগরিক। দক্ষিণ ডিককুল সহ কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকা এবং ঢাকায় অঢেল সম্পদের মালিক তিনি। দক্ষিণ ডিককুলে অন্তত ২০টি স্পটে জমি কিনেছেন। বাড়িও আছে কয়েকটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবু নফর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারী। ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তৈরী করা সহ¯্রাধিক ইয়াবা কারবারিদের একটি তালিকায় আবু নফর কক্সবাজার সদর এলাকায় ৭ নাম্বার তালিকাভুক্ত ইয়াাবা কারবারী। মানবপাচারেও আন্তর্জাতিক চক্রে জড়িত তিনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবপাচারের তালিকাতেও তার নাম আছে শীর্ষে।

দক্ষিণ ডিককুল এলাকার সমাজ কমিটির একজন নেতা জানান, ২০১৮ সালে কক্সবাজার সদর মডেল থানার তৎকালিন ওসি রনজিৎ কুমার বড়–য়ার নির্দেশে অভিযান চালিয়ে পুলিশ নফরকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। পরে ঢাকা থেকে উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এসময় মোটা অংকের লেনদেন হয়েছিল বলে গুঞ্জন আছে। থানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরই ‘ক্রসফায়ার’ থেকে বাঁচতে এলাকা ছাড়ে নফর ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

সমাজ কমিটির ওই নেতা আরও জানান, টেকনাফে মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডের জেরে পুলিশের ইয়াবা অভিযান থেমে যাওয়ায় এলাকায় ফিরে আবু নফর। ধীরে ধীরে ফিরে আসে তার সিন্ডিকেট সদস্যরাও।

নেটওয়ার্ক পুরোপুরি সচল করতে সিন্ডিকেট সদস্যদের নিয়ে নিজের বাড়িতে দফায় দফায় বৈঠক করছেন সিন্ডিকেট প্রধান আবু নফর। গত ২৭ অক্টোবর (২৭-১০-২০২০) রাত ৮টায় নফরের বাড়িতে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাত ৮ টায় থেকে শুরু হয়ে প্রায় ১২ টা পর্যন্ত চলে এই বৈঠক। ওই বৈঠকে বিভিন্ন এলাকার সিন্ডিকেট সদস্যরা অংশ নেয়।

নফরের নেতৃত্বে ওই বৈঠকে অংশ নেয় দক্ষিণ ডিককুলের আমান উল্লাহ, লারপাড়ার সাইফুল, হাজীপাড়ার তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারী বকুল, মোহাম্মদ শাহ আলম ওরফে বাইট্টা, আলোচিত হত্যা মামলার আসামী জালাল, লারপাড়ার মনির আলম, লারপাড়ার আজিজ ও উত্তর ডিককুলের নুরুচ্ছফা। সেই বৈঠকের পর থেকে কারবার চাঙা হতে শুরু করে নতুন করে।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, পালিয়ে থাকলেও নফরের ইয়াবা কারবার বন্ধ ছিল না। আত্মগোপনে থেকে সিন্ডিকেটের নতুন সদস্যদের দিয়ে কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে এখন এলাকায় ফিরে আবার প্রকাশ্যে নিজের সাম্রাজ্যের হাল ধরেছে। ইয়াবা পাচারের জন্য পরিবহন ব্যবহারের পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডারকেও ব্যবহার করেন তিনি। তার মালিকাধীন মার্কেটের গ্যাসের দোকান আবারও চালু হয়েছে।

গ্যাস সিলিন্ডারের মাধ্যমে ইয়াবা পাচারে তার অন্যতম পার্টনার বাংলাবাজারের আব্বাস উদ্দিন। আব্বাস উদ্দিনের কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে মহাসড়কের মোকামে মোকামে গ্যাসের দোকান রয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের আড়ালে পাচার হয় ইয়াবা। তার চট্টগ্রামের দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই ঘটনায় মামলাও হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে আড়ালে ইয়াবা সাম্রাজ্য চালালেও প্রকাশ্যে নিজেকে সমাজসেবায় নিয়োজিত করেছেন নফর। ডিককুলের খেলাধুলা ও বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে মোটা অংকের ‘ডোনেশান’ করেন তিনি। প্রতিটি অনুষ্ঠানে নফর থাকেন ‘সম্মানিত অতিথি’। নফরকে বর্তমানে শেল্টার দেয় হাজীপাড়ার রাজনৈতিক নেতা ছৈয়দ আকবর। নফরের ডান হাত, বাম হাত হিসেবে দায়িত্বপালন করেন নাপাঞ্জাপাড়ার রাশেদ।

জানা গেছে, নফরের ইয়াবা কারবার দেখাশোনার প্রধান দায়িত্ব ছিল তার দুই ভাইপো হাসমত উল্লাহ (২৪) ও ওবাইদুল্লাহ’র (২৬)। তাদের পিতার নাম নুরুল বশর। নফরের রাজধানী ঢাকার বাড়িতে থাকতেন হাসমত উল্লাহ। কক্সবাজার থেকে ইয়াবার চালান পাঠাতেন ওবাইদুল্লাহ। ঢাকায় রিসিভ করে সরবরাহ করতেন হাসমত উল্লাহ।

দুই বছর আগে নফরের ঢাকার বাড়ি থেকে ২০ হাজার ইয়াবা সহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় হাসমত উল্লাহ। বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে আছেন তিনি।

টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান আনার জন্য ওবাইদুল্লাহকে সিএনজি কিনে দেন নফর। ওই সিএনজি করে টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান নিয়ে কক্সবাজার আসার পথে উখিয়ায় গ্রেপ্তার হন ওবাইদুল্লাহ। দীর্ঘদিন কারাভোগ করার পর কয়েকমাস আগে জামিনে বের হন তিনি। এখন আবারও চাচার সাম্রাজ্যের হাল ধরেছেন।

ভয় উড়িয়ে এলাকায় প্রকাশ্যে নফরের সিন্ডিকেট সদস্যরা:

নফরের সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে অন্যতম হলেন উপজেলা পাড়া এলাকার আব্দুল জলিলের ছেলে ইদ্রিস (৩০)। ইদ্রিস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ২০১৭ সালের তালিকায় কক্সবাজার সদর এলাকার ১৪ নাম্বার তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারী। এখন নিজেকে স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে দাপটের সাথে চালায় ইয়াবা কারবার।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবা সহ একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইদ্রিস। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তিনটি মামলা রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ২০১৭ সালে উপজেলাপাড়ায় ইদ্রিসের বাড়ি ঘেরাও করে র‌্যাব। ওই অভিযানে তার বাড়ি থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ইদ্রিস আটক হলেও অভিযান টের পেয়ে পালিয়ে যায় তার ভাই মিজান ও মামুন।

তারা আরও জানান, ইদ্রিস এক সময় ভবঘুরে থাকলেও ইয়াবা কারবার করে এখন বিপুল সম্পদের মালিক। তার বাড়ি যেন রাজপ্রাসাদ। বাসটার্মিনাল এলাকার বনফুলের স্বত্বাধিকারী। কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে মালিকানা আছে বলেও দাবী করছেন তারা।

নফরের আরেক সহযোগী হলেন দক্ষিণ ডিককুলের আমান উল্লাহ। ইয়াবা ও অস্ত্রের ৬টি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ‘ক্রসফায়ারের’ ভয়ে আত্মগোপনে চলে গেলেও এখন এলাকায় প্রকাশ্যে এসে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা কারবার।

দক্ষিণ ডিককুলের সিরাজ ও নুরুচ্ছফা ইয়াবা জগতে ছিল মানিকজোড়। তারাও নফরের সিন্ডিকেটের সদস্য। প্রায় বছর খানেক আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন সিরাজ। এতে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় নুরুচ্ছফা ২ নাম্বার আসামী। সিরাজের ঘটনার পর নুরুচ্ছফা গা ঢাকা দেন। কিন্তু সেই নুরুচ্ছফাও এখন এলাকায় ফিরে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। সচল করেছেন ইয়াবা কারবার।

আরেক বড় মাপের ইয়াবা কারবারি হলেন দক্ষিণ ডিককুলের নেছার উদ্দিন (৯০)। নেছার উদ্দিন এক সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি চালাতেন। ইয়াবা কারবারি আমান উল্লাহ’র হাত ধরে ইয়াবা জগতে প্রবেশ করেন। শুরু করেন পাচার। পর পর দুইবার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়ায় নেছারের চাকরি চলে যায়। এখন তিনি প্রতিষ্ঠিত ইয়াবা কারবারি।

তিন বছর আগেও গণপরিবহনের ড্রাইভার ছিলেন দক্ষিণ ডিককুলের জুবাইর। ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে তিনি এখন কোটিপতি। তার বহুতল ভবন নির্মাণাধীন। কিছুই করেন না। চলেন রাজার হালে। এক সময় গাড়ি চালালেও তিনি এখন কয়েকটি গাড়ির মালিক। তার ভাই আজিম বিলকিস মার্কেটে দোকান করে। দুই ভাই মিলে রমরমা চালিয়ে যাচ্ছেন কারবার।

দক্ষিণ ডিককুলের নুরুল ইসলামের ছেলে আরফাত এক বছরের মধ্যে দু’বার গ্রেপ্তার হয়েছেন ইয়াবাসহ। তিনি মূলত নফর সিন্ডিকেটের ইয়াবা বহন করে। কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ইয়াবায় সহ গ্রেপ্তার হয়ে টানা কয়েকমাস কারাভোগ করে। জামিনে বের হয়ে ফের শুরু করেন ইয়াবা পাচার। কারাগার থেকে বের হয়ে মাস না পেরোতেই পাবনায় বিশাল চালান নিয়ে গ্রেপ্তার হয়। বর্তমানে পাবনা কারাগারে আছেন।

আত্মগোপন থেকে এলাকায় ফিরে বর্তমানে রমরমা ইয়াবার কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন লারপাড়ার লাল মোহাম্মদের ছেলে আবুল কালাম, ছৈয়দের ছেলে ফজল করিম (দুটি ইয়াবা মামলার আসামী), নুরুল হকের ছেলে আনসার (তিনটি ইয়াবা মামলার আসামী), ফকির আহমদের মেয়ে বুলবুলি (১টি ইয়াবা মামলার আসামী), মো. কালুর ছেলে চাঁদ মিয়া (১ টি ইয়াবা মামলার আসামী)।

এক রোহিঙ্গা পরিবারের সকলেই ইয়াবা কারবারে জড়িত:

দক্ষিণ ডিককুলে নফরের মত বেশকিছু পুরাতন রোহিঙ্গা বসতি গড়ে তুলেছে। তারাও ইয়াবা কারবারে জড়িত। সেখানে এমন এক পরিবার আছে যে পরিবারের প্রত্যেকেই ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত।

পারিবারিক এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান হলেন ফাতেমা বেগম। ফাতেমা বেগমের অন্যতম সহযোগী তার স্বামী রশিদ উল্লাহ। তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে তিনটি ইয়াবা মামলা আছে। ইয়াবার চালান পাচারের সময় উখিয়া, কক্সবাজার সদর ও চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হয় তারা। সর্বশেষ লকডাউনের পরে স্বামী-স্ত্রী ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়।

ফাতেমার বোন হাসিনা বর্তমানে কারাগারে। ইয়াবা সহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে দু’বার গ্রেপ্তার হয়।
ফাতেমার ভাই ছৈয়দ উল্লাহ একজন প্রবাসী। তার স্ত্রী অর্থাৎ ফাতেমার ভাবী মুন্নী অন্যতম ইয়াবা সরবরাহকারী।

ফাতেমার ভাই কামালও চিহ্নিত ইয়াবা পাচারকারী। তার বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলা রয়েছে। এক সময় ক্রসফায়ারের ভয়ে সাগরপথে ট্রলারে করে মালয়েশিয়া পাড়ি জমায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফাতেমার কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক দিয়ে ইয়াবা সংগ্রহ করেন জমির ও ইকবাল। এসব ইয়াবা কলাতলীর মোড়ে বিক্রির সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয় তারা।

নফর, আমানু সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নজরদারিতের রাখা হয়েছে বলে জানান জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন