• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৫ পূর্বাহ্ন

‘পছন্দের ব্যক্তিকে’ ঈদগাঁও বাজার ইজারা দিতে প্রশাসনের যত কারসাজি

নিজস্ব প্রতিদেক / ৮৪১ বার ভিউ
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

কক্সবাজার অফিস:

ইতিহাস করলো এবারের ঈদগাঁও বাজারের ইজারা। পছন্দের ব্যক্তিকে ইজারাদার নিয়োগ দিতে নানা নাটকীয়তার আশ্রয় নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু অসাবধানবশতঃ নতুন নিয়োগকৃত ইজারাদারের ভুলে ফাঁস হয়ে গেছে সকল নাটকীয়তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কক্সবাজার শহরে রেডজোন ক্যাটাগরির লকডাউন চলছে, তাই যানবাহন চলাচল বন্ধ। সিন্ডিকেটটি রেডজোনের সময়কে বেছে নেয় ইজারার জন্য।

হঠাৎ কয়েকদিন আগে তড়ঘিড়ি করে টেন্ডার ড্রপিং আহ্বান করে। লকডাউনে বাঁধাগ্রস্ত হয়ে অন্যান্যরা পে-অর্ডার করতে না পারায় টেন্ডার ড্রপিং করতে পারেনি। কিন্ত পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রমজানুল আলম দরপত্র ড্রপিং করে।

১৪ জন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান দরপত্র সংগ্রহ করলেও লকডাউনের কারণে কেউ দরপত্র জমা করতে পারেননি। শুধুমাত্র রমজানুল আলম নামে ওই ব্যক্তি একা দরপত্র জমা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে লকডাউন বিবেচনা না করে তাকে ঈদগাঁও বাজারের ইজারাদার নিয়োগ করে প্রশাসন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঈদগাঁও বাজারের ইজারা মিশন বাস্তবায়ন করতে ব্যাপক কারসাজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। গত ১০ মার্চ সদর উপজেলা প্রশাসন দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্র আহ্বানের পর থেকে সর্বমোট ১৪ জন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান দরপত্র সংগ্রহ করে। এরমধ্যে টেন্ডারে ফাইট হতো মূলত আরমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী আরমান উদ্দিন ও আরএন এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (নিজে দাবীদার) রজমানুল আলমের মধ্যে। বাকি দরপত্র সংগ্রহকারীরা রমজানের সাথে নিকোজিশন করেছেন বলে অভিযোগ আছে।

দরপত্র আহ্বানের পর অন্যান্যদের মত গত ২২ মার্চ আরমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আরমান উদ্দিন দরপত্র সংগ্রহ করেন। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী সর্বমোট ১৪ জন ব্যক্তি দরপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। আরমানের দরপত্রের ক্রমিক নাম্বার ছিল ১০। অর্থ্যাৎ ১০ নাম্বার সিডিউলটি সংগ্রহ করেন আরমান। আরমানের পর আরও ৪ জন ব্যক্তি দরপত্র সংগ্রহ করেন।

সূত্রমতে, আরমান ১০ নাম্বার দরপত্রটি সংগ্রহ করলেও তাকে সিন্ডিকেটের কারসাজির অংশ হিসেবে ঈদগাঁও বাজার ইজারা সংক্রান্ত সদর উপজেলা প্রশাসনের রেজিস্ট্রারে ফরম সংগ্রহকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আরমানকে বাদ দিয়ে অন্যান্য সিডিউল সংগ্রহকারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় সদর উপজেলার রেজিস্ট্রারে। আরমানের সিডিউলটি সংগ্রহ করেছিলেন সদর উপজেলা প্রশাসনের গোপনীয় সহকারী উত্তম চক্রবর্তীর কাছ থেকে। তার ফরমে উত্তম চক্রবর্তীর স্বাক্ষরও রয়েছে।

এদিকে অনৈতিকভাবে কথিত নিয়ম-কানুনে টেন্ডার পাওয়ার পর পূর্ব পরিকল্পনায় সফল হওয়ায় খুশিতে আত্মহারা ইজারাদার রমজানুল আলম নিজের ফেসবুক আইডিতে কারসাজির ঘটনাটি প্রকশ্যে নিয়ে আসে। ভুলে ফাঁস করে দেয় সকল পরিকল্পনা।

ইজারাদার রমজানুল আলম তার ফেসবুকে আইডিতে ঈদগাঁও বাজার ইজারা সংক্রান্ত সদর উপজেলা প্রশাসনের রেজিস্ট্রার বইয়ের ছবি তুলে পোস্ট করে। যেখানে দরপত্র সংগ্রহকারীদের নাম রয়েছে। সেই ফেসবুক পোস্টটির স্ক্রিটশর্ট প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

রমজানুল আলমের ফেসবুকে দেওয়া ছবিতে দেখা যায় সেখানে ১৩ জন সংগ্রহকারীর নাম ঠিকানা ও স্বাক্ষর রয়েছে। যদিও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী দরপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ১৪ জন। তাছাড়া রমজানুল আলমের ফেসবুকে দেওয়া রেজিস্ট্রারের ছবিতে দরপত্র সংগ্রহকারী হিসেবে আরমানের নাম ঠিকানা স্বাক্ষর কোনটাই উল্লেখ নেই। অর্থ্যাৎ আরমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আরমানের সিডিউলটি সংগ্রহকারীর তালিকায় না তোলায় টেন্ডার ড্রপিংয়ে আরমানের পক্ষে সুযোগই ছিলনা। তাছাড়া লকডাউনকে কাজে লাগিয়ে মোটা অংকের লেনদেন করে গোপনে ভাগিয়ে নিয়েছে আলোচিত ঈদগাঁও বাজারের ইজারা।

ঈদগাঁও বাজার ইজারা সংক্রান্ত রেজিস্ট্রারে আরমানকে অন্তর্ভুক্তি না করার বিষয়ে জানতে সদর উপজেলা প্রশাসনের গোপনীয় সহকারী উত্তম চক্রবর্তী ফেসবুকে যে ছবি পোস্ট হয়েছে সেটি সরকারি রেজিস্ট্রারের ছবি নয় বলে দাবী করেন। তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র ড্রপিং করায় আরএন এন্টারপ্রাইজ ইজারা পেয়েছে। নিকোজিশন এবং কারসাজির অভিযোগটি সত্য নয় বলে দাবী করেন তিনি।’

এবার ঈদগাঁও ইজারা হয়েছে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। এর সাথে যুক্ত হয় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ আয়কর।

ঈদগাঁও বাজারের সদ্য নিয়োগকৃত ইজারাদার রমজানুল আলম বলেন, “১৩ জন দরপত্র সংগ্রহ করেছে। এরমধ্যে শুধুমাত্র আমিই দরপত্র ড্রপিং করেছি। একারণে আমাকে ইজারাদার নিয়োগ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এতে কোন ধরণের নিকোজিশন হয়নি। তবে তার প্রতিষ্ঠান আরএন এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান কারও সাথে নিকোজিশন করেছে কিনা সেটি তার জানা নেই।”

ফেসবুকে পোস্ট করা রেজিস্ট্রারের ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

এদিকে পূনরায় ইজারা আহ্বানের জন্য সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করেছেন সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বাদ পড়া দরপত্র সংগ্রহকারী আরমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আরমান উদ্দিন। তিনি বলেন, “যথাযথ নিয়ম মেনে আমি দরপত্র সংগ্রহ করি। গত ৮ জুন দরপত্র ড্রপিং এর সময় ছিল। কিন্তু রেডজোন থাকাকালীন সময়ে সকল ব্যাংক বন্ধ ছিল। যার কারণে আমি পেÑঅর্ডার করতে পারিনি। দরপত্রে সর্বমোট ১৪টি দরপত্র সংগ্রহ করলেও তাতে ড্রপিং করে মাত্র ১টি। ১টি দরপত্রের মাধ্যমে কিভাবে ইজারা দেওয়া যায় সেটা বুঝে আসে না। উক্ত দরপত্র বাতিল করে পূণরায় ইজারা আহ্বানের আবেদন জানাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, ‘সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে উপজেলা প্রশাসন আমার সংগ্রহ করা সিডিউলটি পর্যন্ত রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত করেনি। সফলভাবে সব পরিকল্পনা সফল করে সিন্ডিকেট।”

এবিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মু. মাহমুদ উল্লাহ মারুফের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, “অভিযোগটি পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে অবশ্যই পূণরায় বিবেচনা করা হবে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন