বিশেষ প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের চকরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনেও সরকার দলীয় সাংসদ জাফর আলম নৌকার প্রার্থী ও তার অপছন্দের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংসদ সদস্যদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন ধরণের মাথা না ঘামানোর নির্দেশনা থাকলেও নৌকার প্রার্থীসহ অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপক্ষে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জয় করাতে সরকারদলীয় এ এমপি নানা ধরণের বক্তব্য দিচ্ছেন।
চকরিয়া ৮ ইউপিতে ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন একাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থী। এর আগে তৃতীয় দফায় সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনে চকরিয়া-পেকুয়ার ১১ ইউপির নির্বাচনে নৌকার ভরাডুবির জন্য এমপি জাফর আলমকে দায়ি করেছেন আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
তাদের দাবি, চকরিয়া-পেকুয়ায় তার অনুসারি ছাড়া যারা নৌকা পেয়েছেন তাদের নানা ভাবে পরাজিত করিয়েছেন তিনি। এর ফলস্বরুপ চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের নৌকার প্রার্থী জন্নাতুল বকেয়া রেখা মাত্র ৯৯ ভোট পেয়ে দেশে ইতিহাস গড়েছেন। আবার নিজের পছন্দের স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের গরুচোর সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে পরিচিত আলোচিত নবী হোসেন ওরফে নইব্যা চোরাকে চেয়ারম্যান হিসেবে জয় পেতে তিনি সহযোগিতা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সদ্য সমাপ্ত হওয়া তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে গেছেন পেকুয়া উজানটিয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শহিদ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্বতন্ত্রপ্রার্থী তোফাজ্জাল করিমকে জেতানোর জন্য নৌকার বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার সবই করেছেন এমপি জাফর আলম।নির্বাচনের আগেও একই অভিযোগ করেছিলেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন,নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে যাওয়া কয়েকজন প্রার্থী।
এদিকে চতুর্থ ধাপে আগামী ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচানকে সামনে রেখে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের একজন মোটরসাইকেল প্রতীকের কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন স্থানীয় সাংসদ জাফর আলম এমপি।
এমন অভিযোগ করে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন,আমার বিপুল সমর্থনে ইর্ষান্বিত হয়ে চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সাংসদ জাফর আলম আমার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন এবং তিনি হুংকার দিচ্ছেন যেকোন মুল্যে প্রতিটি ভোট কেন্দ্র দখলে নিয়ে আমাকে চেয়ারম্যান হতে দিবেন না।
তিনি আরও বলেন,নির্বাচন উপলক্ষে ফাঁসিয়াখালীতে অবৈধ অস্ত্রধারী বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়েছে। ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচনে ইউনিয়নের ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্র দখলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি (এমপি)। ডুলাহাজারা ইউনিয়নের লাঙ্গল প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল আমিন এবং স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী কলিম উল্লাহ কলি এমপি জাফর আলামের বিশেষ বাহিনী দিয়ে দখলে নিয়ে (এমপির) সাবেক পিএস বিদ্রোহী প্রার্থী হাসানুল ইসলাম আদরের (আনারস মার্কায়) পক্ষে ভোট ছিড়ে নেয়ার আশংকা প্রকাশ করে সাংবাদিকদের কাছে দেয়া বক্তব্য দুটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
অপর দিকে, চিরিংগা ইউনিয়নে এমপি জাফরের বেয়াই স্বতন্ত্র প্রার্থী জামাল হোসেনকে নির্বাচনে জেতানোর কৌশল হিসেবে তার (জামাল চৌধুরীর) আপন ভাইপো তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতাহীন প্রার্থীকে নৌকার মনোনয়ন এনে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এমপি জাফরের বিরুদ্ধে।
চিরিংগা ইউনিয়নের টানা তিনবারের নির্বাচিত বর্তমান চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, আমাদের এমপি (জাফর) উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও নৌকার পক্ষে প্রচারণা না করে, আমাকে হারানোর অপকৌশল হিসেবে প্রকাশ্যে আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন এবং ভোট কেন্দ্র দখলে নিবেন এবং এমন ঘোষণা দিয়েছেন।
একই ইউনিয়নের সবেক তিনবারের চেয়ারম্যান ও মোটরসাইকেল প্রতীকে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা খাজা সালাহউদ্দিনও এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন চলাকালে ওনি (এমপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণ বিধির ১২ ধারার তোয়াক্কা না করে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ওনার পছন্দের প্রার্থী (বিদ্রোহী প্রার্থী) জামাল হোসেন চৌধুরীর আনারস প্রতীকে ভোট চাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চকরিয়া-পেকুয়ার উপজেলা আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতা বলেন, মূলত চকরিয়া-পেকুয়ায় এমপি জাফর লীগই শেষ কথা। তার (এমপির)অনুসারীরা নৌকা না পেলে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা প্রার্থীদের ডুবাতে যা যা করা দরকার সবই করছেন জাফর আলম। এবং অনুসারীদের বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে জয়ের জন্য ভূমিকা রেখেছেন তিনি। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখে ও একই পথ অবলম্বন করেছেন এমপি জাফর আলম। এতে করে অসহায় হযে পড়া আওয়ামীলীগের প্রার্থীর করুন পরিণতি হতে পারে উল্লেখ করে এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে জেলা ও কেন্দ্রের কাছে অভিযোগ করা হবে বলে জানান আওয়ামীলীগ নেতারা।
এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নৌকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করেছেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, এমপি জাফর আলমের বিরদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এরমধ্যে কেন্দ্রে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে বলে জানান মুজিবুর রহমান।
তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাংসদ জাফর আলম। তিনি বলেন, নির্বাচনি আচারণ বিধি অনুযায়ী একজন সাংসদের পক্ষে- বিপক্ষে নির্বাচনে প্রচার-প্রচারনার সুযোগ নেই। অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীর হাতে নৌকা দেয়ায় তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কয়েকটি ইউনিয়নে নৌকার সূচনীয় পরাজয় হয়েছে দাবি করে তার বিরুদ্ধে একটি মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্রে নিপ্ত বলে জানান এমপি জাফর আলম।