সিরাজুল ইসলাম:
‘হঠাৎ ভোর রাতে তীব্র গতিতে একটি গাড়ি ছুটে আসার শব্দ শোনা যায়। গাড়িটি এতই তীব্র গতির ছিলো যে আমার দোকানের তাক থেকে বেশকিছু মালামাল নিচে পড়ে যায়। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। পরে ফজরের নামাজ শেষে ৬ টার দিকে রাস্তার পাশে একটি লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে ৮ টার দিকে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়।’
গত ৩০ আগস্ট সকালে কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের তেতৈয়া গ্রাম থেকে একটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই লাশটি প্রথম যে’কজন ব্যক্তি দেখেছিলেন তাদের একজন স্থানীয় মুদির দোকানদার মো. আরফাত (৩৬)। উপরের বর্ণনাটি প্রত্যক্ষদর্শী আরফাতই দিয়েছেন ভয়েসওয়ার্ল্ডকে।
এঘটনায় স্থানীয়দের দেয়া খবরের ভিত্তিতে রবিবার (৩০ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে কক্সবাজার সদর মডেল থানার এসআই আরিফ উল্লাহ মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছিলেন। একই দিনে ময়না তদন্ত শেষে লাশটি শহরের বড় কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
উদ্ধারের ৭ দিন পার হলেও এখনো সেই লাশের পরিচয় বা খুনের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশ জানিয়েছে, লাশের পরিচয় সনাক্তের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করছে। পরিচয় সনাক্ত হওয়ার পর খুনের রহস্য দ্রুত উদঘাটন করা সম্ভব হবে।
খুরুশকুলের তেতৈয়ার রাস্তার পাশের যে স্থান থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এর ৫০ ফুট দূরত্বে স্থানীয় মুদির দোকানদার আরফাতের দোকান। তার দোকানের সামনে একটি স্পীড ব্রেকার আছে। গাড়িটি দ্রুত গতিতে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্পীড ব্রেকারে ধাক্কা লেখে তার দোকান লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। তখনই তার সন্দেহ হয়েছিল।
লাশ উদ্ধারের স্থান থেকে পশ্চিম দিকে ৫০ ফুট দূরত্বে পূর্বদিকে রয়েছে স্থানীয় সেলিম কাকা নামে এক ব্যক্তির টমটমের গ্যারেজ। দুইটি দোকানের মাঝখানে এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয়রা। দোষীদের শাস্তির আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান তারা।
সেই অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ৭ দিনেও মৃত্যু রহস্য বা লাশের পরিচয় উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। অজ্ঞাত লাশটি রাস্তার পাশে কিভাবে এলো, কোন গাড়ি থেকে ফেলেছে কি না, নাকি ওখানে হত্যার পর রক্তাক্ত অবস্থায় মরদেহটি ফেলে রাখা হয়েছিল তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। তবে মৃত্যুর রহস্য বের করে গ্রামে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যার রহস্য উদঘাটন করে দ্রুত বিচার দাবি করেন এলাকাবাসীরা।
পুলিশের দাবী, অজ্ঞাত লাশটি উদ্ধারের পর থেকেই লাশের পরিচয় খুঁজছেন তারা। কিন্তু গত ৭ দিনেও মৃত ব্যক্তির কোন পরিচয় কিংবা স্বজনদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই ব্যক্তির লাশের ছবি তুলে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবী করেন পুলিশ। আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তির বিষয়ে নিখোঁজ কিংবা অপহরণের সাধারণ ডায়েরীও থানায় কেউ দায়ের করেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অপরিচিত এই ব্যক্তিকে হয়তো অপহরণ করে হত্যার পর রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার পাশের ঝোপে ফেলে গেছেন। তেতৈয়া সওদাগরপাড়া এলাকাবাসীকে হত্যার অভিযোগ চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই লাশটি সেখানে ফেলা হয়েছে বলে দাবী করেন অনেকে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পরপরই হত্যার আলামত সংগ্রহ করে। একই দিনে এসআই আরিফ উল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলার আবেদন করেন। পরে সেই মামলাটি রুজু হয়।
পুলিশের দাবী, সুরতহালে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাথা, নাক ও মুখে জখম এবং রক্তাক্ত অবস্থায় ছিল। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার ক্ষতচিহ্নও রয়েছে তার হাতে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া লাশের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখারও চিহ্ন দেখা গেছে। হয়ত কেউ হত্যা করে রাস্তার পাশে ঝোপে ফেলে পালিয়ে যায়। কি কারণে বা কারা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে সেই রহস্য এখনো উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। মৃত ব্যক্তির কোন পরিচয় কিংবা স্বজনদেরও খোঁজ পাওয়া যায়নি।’
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া লাশের এখনো মৃত্যু রহস্য মেলেনি। ঘটনাস্থল থেকে একটি টমটমের পার্স ও একটি মাস্ক পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা পাওয়া যায়নি। এটি পাওয়া গেলে তদন্ত সহজ হতো। আমাদের টিম হত্যা রহস্য উন্মোচনে কাজ করছে। আশা করছি দ্রুত রহস্য উদঘাটন হবে।’
বাংলাদেশ সময় ২০৪৪ ঘণ্টা, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০।