কক্সবাজারের সীমান্ত এলায়ায় ৩৪টি শরনার্থী শিবিরে অশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরানো নিয়ে বাংলাদেশ পড়েছে উভয় সঙ্কটে! আরাকান আর্মি এখনও বড় সমস্যা। আরাকান আর্মি নন-স্টেট অ্যাক্টর হওয়ায় বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা বসতে পারছে না। আবার তাদের এড়িয়ে যেতেও পারছে না।
কক্সবাজারস্থ শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের সীমান্ত এলায়ায় ৩৪টি শরনার্থী শিবিরে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। যার মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ৫ হাজার ৫২০ জন। পরিবার রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি। আশ্রিতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক এবং ৪ শতাংশ বয়স্ক রয়েছে। যার মধ্যে ৪৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৫১ শতাংশ নারী। আর প্রতিবছর ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মগ্রহণ করে। তাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সম্প্রতি আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্রের খবর, এই সঙ্কটের কথা জানানো হয়েছে ঢাকা সফররত আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দক্ষিণ ও সেন্ট্রাল এশিয়া ব্যুরো ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি নিকোল এন চুলিক এবং পূর্ব ও প্যাসিফিক ব্যুরোর ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যান্ড্রু হেরাপকে।
তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না-হলে মিয়ানমারে শান্তি আসবে না।
১৯৭১-এর ১৮ এপ্রিল ৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে কলকাতায় গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের ডেপুটি হাইকমিশন।
মুক্তিযুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত তৈরিতে কলকাতার ওই কূটনৈতিক দপ্তর থেকেই কাজ শুরু করেছিলেন ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এ দিনটি বাংলাদেশের ‘ফরেন সার্ভিস ডে’ হিসেবে উদ্যাপন করা হয়ে থাকে।
শুক্রবার এই উপলক্ষে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্যে অন্তর্বতী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরাকান আর্মি বড় সমস্যার জায়গা।’
এর পাশাপাশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তৌহিদ হোসেনের বার্তা— ‘প্রবাসীদের সমস্যা সবার আগে সমাধান করতে হবে। দূতাবাসের সীমাবদ্ধতা থাকলেও মানুষকে আগে পরিষেবা দিতে হবে।
জুলাই-অগস্টের ঘটনার প্রভাব বিদেশনীতিতেও পড়েছে উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, ‘তার পরেও বিশ্ব-দরবারে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের।’
গত বৃহস্পতিবার ঢাকা সফররত আমেরিকার দুই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তৌহিদ। পরে এই দুই কর্মকর্তা আলাদা ভাবে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, জানতে চাইলে তৌহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘মিয়ানমার ইস্যু নিয়েই আলোচনা হয়েছে বেশি।
এর পাশাপাশি আমেরিকার চাপানো এবং প্রস্তাবিত বাড়তি শুল্ক নিয়েও কথা হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে যে মিয়ানমারে শান্তি আসবে না, সে কথা আমি শক্ত ভাবেই তাঁদের বলেছি।
এ-ও বলেছি যে, এক অর্থে আমরা এখন নতুন প্রতিবেশীর মুখোমুখি; যারা আবার নন-স্টেট অ্যাক্টর! কাজেই তাদের সঙ্গে আমরা না পারছি সরাসরি আচরণ করতে, না পারছি উপেক্ষা করতে। এটি একটি কঠিন পরিস্থিতি।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি বলেছি যে হয়তো একটা সময়ে সমস্যাটি থিতিয়ে আসবে এবং সমাধানের দিকে যাবে। তখন যারা আমাদের বন্ধু ও শক্তিশালী রাষ্ট্র আছে, তাদের সেখানে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যেন সেখানে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা রোহিঙ্গাদের মানবিকভাবে বিবেচনা করে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়।’
প্রসঙ্গত,সর্বপ্রথম ১৯৭৭-৭৮ সালে ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার মিয়ানমারে ফিরে যায়। এরপর ১৯৯১ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন মিয়ানমারে ফিরে যায়। ২০১২ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। তারপর ২০১৭ সালে ৮ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। আর ২০২৪ সালে ৬৪ হাজার ৭১৮ জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে ৫ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু তার বিপরীতে রোহিঙ্গার সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি। আর এটি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির।
সম্প্রতি প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য শনাক্ত করেছে মিয়ানমার। তাই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ট্রানজিট সেন্টার। নতুনভাবে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ট্রানজিট সেন্টার হস্তান্তর হচ্ছে শিগগিরই। টেকনাফ ও ঘুমধুমে আগে থেকেই প্রস্তুত আছে দুটি। আর প্রত্যাবাসনের জন্য সম্মত রোহিঙ্গাদের তালিকা হালনাগাদ করার কথা বলছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সাল থেকে নানা প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। কিন্তু নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে মিয়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি।