রায়হান আজাদ:
এবারে আমার সফল ও স্মরণীয় ঈদ পালিত হলো। ব্যতিক্রম কিছু অর্জন আছে। লকডাউনের কাকডাকা ভোরে বাইক চেপে চলে এলাম ঘরে। একা একা; মায়ের টানে। অনলাইনে মিডটার্ম নিয়ে বড্ড ব্যস্ততা। বৃষ্টি ও সবুজ দুটোই ছিল আমার ক্যামেরা ব্যাকগ্রাউন্ড।
ইউজিসির নির্দেশনা মত সহজ শর্তে সেরে নিলাম ভাইভা। শবে কদরের জন্য যে একাকীত্ব প্রত্যাশা ছিল তা মিলেছে আমার মাসকান আজাদে। গ্রামে আমি একটা চিরাগ জ্বেলেছি; এটি গত ১০ বছর ধরে জ্বলছে। গ্রামে আমার স্বপ্ন ও ভালবাসা এ চিরাগকে ঘরে। এর নাম পশ্চিম টইটং রহমানিয়া আদর্শ মাদরাসা।
এ মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দেখভাল করাই আমার গ্রামীণ কর্মতৎপরতার কেন্দ্রীয় বিষয়। পরপর দুইদিন শিক্ষকদের সাথে বৈঠক হয়। এতে তাদের চলমান সমস্যার সমাধান দেয়া হয়। সে ছোটবেলাকার কথা, আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়তাম, তখন থেকে এলাকার লোকদের সৌজন্যে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করতাম।
এ বছর লকডাউনে বর্তমান প্রজন্ম এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারলেও তারা এলাকায় বেশ খাবার-দাবার বিতরণ করেছে। বিশেষত বিচারিক কর্মকর্তা আমার অনুজ মুজাহিদের তরফ থেকে ইফতারি ও ফিতরাহ‘র চাল বিতরণ করা হয়। আমাদের পিছিয়ে পড়া এলাকায় মহিলারাই বেশী বঞ্চিত গোষ্ঠী। তাদের শিক্ষাদীক্ষা নেই। সারাক্ষণ তারা খেটেই চলে স্বামীর ঘরে।
আমার ইচ্ছে হল এ ঈদের আগে তাদের সাথে মিলিত হবো। পরিকল্পনা মোতাবেক ঈদের আগের দিন নতুনপাড়া,পূর্বপাড়া ও হাজীরপাড়ার হতদরিদ্র মহিলাদের ঘরে ঘরে যাই। আমার দুই ভাইপো আনিস ও আসিফ সাথে থাকে। বিপন্ন পড়শীদের সাথে কুশল বিনিময়ের আনন্দ আমার জীবনের দুর্লভ অর্জন। এ যাত্রায় বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, অসুস্থ ও অশীতিপর বুড়ো মহিলাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত শেষে তাদেরকে ঈদ বখশিশ স্বরূপ একটি হলুদ খাম ধরিয়ে দেয়ার সৌভাগ্য হয়।
তাদের আকুতি-মিনতি আমার হৃদয়ে রেখাপাত করে। তাদের প্রাণখোলা দু‘আ আমার শিরা-উপশিরায় প্রফুল্লধারা বইয়ে দেয়। তিরিশ রোজা শেষে ইফতারের পর মাগরিব পড়ে আসার পথে চাঁদ দেখার আকুল আগ্রহে আমার নজর যায় পশ্চিমাকাশে। ওখানে ঘন কালো মেঘের অবাধ উড়াউড়ি। তবু কাঁচির মতো বাঁকা একখানা চাঁদ দেখতে বেশী কসরত করতে হয়নি। চাঁদ দেখে ঘরে এসে লিখে ফেলি-আজ মেঘের কোলে চাঁদ উঠেছে বাঁকা একটি চাঁদ।ঈদ এসেছে প্রাণ খুলেছেভাঙ্গছে খুশীর বাঁধ।
পূবের ঝিলে উড়ছে সাদা বকঘড়ির কাঁটা কোরছে টক্ টক্ঘরদোর সাজছে তক তকজানাই তোমায় ঈদ মোবারক।চাঁদরাত পূণ্যময় রাত। এ রাতের বহু ফজিলত রয়েছে। রমজানের প্রাথমিক পর্যায়ে পত্রিকায় কলাম লেখার ব্যস্ততায় কুরআনখানির যে অসমাপ্তি ছিল তা সেরে নেয়ার সৌভাগ্য হয় এ রাতে। ঈদের দিন সকালে শীতল ঝর্ণায় গোসল শেষে যথরীতি জুব্বা পড়ে মসজিদে যাই।
এটি আমাদের পূর্বপুরুষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এলাকার সবচেয়ে পুরাতন মসজিদ। এ মসজিদে আমার বাবা প্রায় ৪০ বছর যাবত অনেকটা অবৈতনিকভাবে ইমামতি করেছেন। আমার ছোট বয়স থেকে এ মসজিদের সামনেকার ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতে ঈদের নামাযের পূর্বে আমি আলোচনা রেখে আসছি। যথারীতি এ বছরও আলোচনা রাখলাম। সংক্ষিপ্ত সময়ে করোনা দুর্যোগে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কতিপয় বিধি-নিষেধ উপস্থাপনই ছিল আমার আলোচনার সারবস্তু।
দেখলাম, এলাকার লোকজন সরকারি নির্দেশনাগুলো পালন না করেই সব কাজ সারছে। তাদেরকে বললাম, এ বছর ঈদের নামাযের পর কোন কোলাকুলি ও করমর্দন চলবে না আর সালাম জানানো ও সেমাই খাওয়ার জন্য ঘরে ঘরে যাওয়াও সীমিত পর্যায়ে রাখতে হবে। তারা আমার কথা রাখে। দেখলাম, মুনাজাত শেষে লম্বা সালাম দিয়ে সবাই কবর যিয়ারতে চলে যায় আর সেখান থেকে যে যার যার মতো নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়ায় ।
এদিকে বহু গেরস্থে বিপত্তি ঘটে; তারা প্রচুর সেমাই-ফিন্নি ও নানান খাদ্যদ্রব্য পাকায়, যা খাওয়ার পর্যাপ্ত মানুষ মেলেনি, বেছে যায়। ফলে অনেক গৃহিনীর রাগ এসে পড়ে আমার উপরে। আমি ঈদের নামায শেষে ঘরে ফেরে মাকে সালাম দিয়ে আমার রুমে গিয়ে আস্ত একটা ঘুম দেই। দুপুরের আজান হলে ঘুম ভাঙ্গে। নামায শেষে চাচীমাকে সালাম করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম, তিনি একাই আছেন উনাদের পুরনো ভবনে। শহর থেকে চাচাতো ভাইবোনরা কেউ যায়নি।
চাচীর জোরাজুরিতে ঘরে ঢুকলাম আর কয়েকটা লিচু নিলাম। সেখান থেকে এসে আবার ঘুমের কোলে হারিয়ে গেলাম। আছরের পরে আমার মাসকান আজাদের ছাদে মায়ের সাথে গল্প-গুজবে গোধূলী এসে পড়ে। সন্ধ্যায় আমার প্রিয় স্যার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান ও মো: তাজুল ইসলাম বিরচিত‘আল মাহমুদের ছোটগল্প বিষয়ভাবনা’ বইখানা পড়া শুরু করলাম। বইটি নিয়ে আলাদা আরেকটা আলোচনা ভিন্ন সময় করার ইচ্ছে আছে।
ঈদের ২য়দিন আমার এক ফুফাত বোন আমার জন্য দুটি দেশী মুরগী হাদিয়া নিয়ে আসে। তার বাড়ি বঙ্গোপসাগরের তীরে বাঁশখালীর ছনুয়া গ্রামে। এদিন আমার এক শিশুকালের ক্লাসমেট নাসিমাও আসে আমাদের বাড়িতে। মা তাদেরকে আপ্যায়ন করালেন। গ্রামে এখন আম-কাঁঠালের মরসুম চলছে। কাঁঠাল এখনও না পাকলেও আমাদের আমগুলো পেকেছে।
প্রচুর আম খেয়েছি এ ঈদে। ঈদের ২য় ও ৩য় দিন রোদ-বৃষ্টির লুকুচুরিতে আমাদের গ্রামটা নবরূপে সাজে। আমি ফজর পড়ে এসে নিয়মিত ছাদে চলে গিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে শুয়ে পড়তাম, পাশে আমার মোবাইল সেটে বাজিয়ে দেই আল কুরআনের প্রিয়তম সূরাগুলো শুনে পরিতৃপ্ত হতাম। বিশবিখ্যাত ক্বারী মিশারী আলাফাসীর তিলাওয়াতে আমার মন জুড়িয়ে যায়। হৃদয়ে রিদম উঠে।
আবেগ ও আশায় কম্পন জাগে। মাতোয়ারা হয় মন ও মনন। মধুর আবৃত্তির সূর, ভাষা ও ভাবে আমার নৈসর্গিক পরিবেশ আরো নান্দনিক হয়ে উঠে। কুরআনিক সাহিত্য নিয়ে আরকেদিন স্বতন্ত্র লিখা তৈরীর ইচ্ছে আছে, কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে এখানে তার অবতারণা করছি না । আমাদের মাদরাসায় দুটি কাঠামো আছে। ৩য় আরেকটি কাঠামো নির্মাণ বহুদিন যাবত থমকে আছে।
এবার দীর্ঘদিন গ্রামে থাকার সুযোগ পেয়ে সে কাজটি সম্পাদন করিয়ে নিলাম। ঈদের পঞ্চম দিন গ্রামে খুশী বিতরণের মূলকাজটি করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা মাদরাসা খোলা থাকলে নিয়মিত বিস্কুট পায় কিন্তু লকডাউনের কবলে পড়ে প্রায় দুইমাস ধরে মাদরাসা বন্ধ থাকায় তারা কিছুই পায়নি। গ্রামে আমার আগমন তাদের জন্য খুশীর খবর।
দেখলাম, কয়েকদিন যাবত তারা ঘুরাফিরা করছে কিছু না কিছু পেতে। শেষতক ১লা জুন আধো আধো বৃষ্টির দিনে মাদরাসার প্রায় ২০০ ছেলেমেয়েকে ৫০ প্যাকেট করে বিস্কিট বিতরণ করা হয়। যাদের ভাইবোন ৪ জন আমাদের মাদরাসায় পড়ে তারা ২কার্টন বিস্কিট লাভ করেছে, যার অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১৫,০০০ টাকা। এভাবে প্রায় ৮ লক্ষ টাকা মূল্যের বিস্কুট বিতরণ করা হয়।
তাদের বিস্কিট প্রাপ্তির খুশী আমার ঈদের খুশীতে রূপান্তরিত হয়। কয়েকদিন আগে যে আমি পত্রিকায় লিখেছিলাম,“ঈদ মানে খুশী। ফিতর মানে দান। সুতরাং ঈদুল ফিতর মানে দানের খুশী। এ দান ব্যাপক অর্থবোধক। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এ দিনে নিজেদেরকে বিলিয়ে দেন। দরিদ্র ও অসহায়দের মাঝে আনন্দ ও ভালবাসা বিতরণ করেন। শিশু-কিশোরদের সাথে হাসি-খুশী ও আদর-স্নেহ ভাগাভাগি করে নেন”। এ কথাগুলো অন্ততপক্ষে আমার ক্ষেত্রে যথার্থ প্রতিফলন ঘটানোর সৌভাগ্য লাভ করাই এবারের ঈদ আমার সবচে‘ সফল ও স্বার্থক ঈদে পরিণত হয়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি।