নিজস্ব প্রতিবেদক:
কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া ও ফিশারীঘাট কেন্দ্রিক ইয়াবা কারবার বেড়েই চলছে। প্রশাসনের অভিযানে কয়েকদিন পর পরেই ইয়াবা নিয়ে ধরা খাচ্ছে কেউ না কেউ। তবে অনেকেই রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফিশারীঘাট কেন্দ্রিক নদী পথে এবং মাছের ট্রাকে করে সহজেই ইয়াবা কারবার গড়ে তুলেছে একাধিক সিন্ডিকেট। তবে বর্তমান সময়ে নুনিয়াছড়া, নতুন ফিশারী পাড়া, মগচিতা পাড়ায় বেশ কয়েকটি ইয়াবা সিন্ডিকেট অধরা থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে জমজমাট ইয়াবা কারবার। এরিমধ্যে জেল থেকে ফিরে অনেকেই মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।
এরিমধ্যে ২৩ এপ্রিল নুনিয়াছড়া নতুন ফিশারী পাড়া থেকে ৩০ হাজার ইয়াবাসহ আমিনুর রশীদ (৪০) ও এবাদুল হক (২৮) নামের দুই যুবককে আটক করে র্যাব। আটক এবাদুল হক নতুন ফিশারিপাড়ার বদিউল আলম প্রকাশ বদুরার ম্যানেজার। তবে, অভিযানের আগেই সটকে পড়ে বদিউল আলম প্রকাশ বদুরা। শুক্রবার নতুন ফিশারিপাড়া বাইতুল নুর জামে মসজিদের উত্তর পাশের গলিতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।
নতুন ফিশারীপাড়া থেকে দুইজন আটক হলেও অধরা রয়েছে বদুরা এবং তার সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য। যারা নিয়মিত মাছের ট্রাকে করে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। ওই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হলেন নতুন বাহারছড়া এলাকার ছৈয়দুর রহমানের ছেলে ফরিদুল আলম। ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক আইনে মামলাও। ২০২০ সালের আগষ্টে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ উখিয়ায় আটক হয়েছিল ফরিদুল আলম। সম্প্রতি জেল থেকে বের হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা কারবার।
ফরিদের সিন্ডিকেটে রয়েছে তার বোনের জামাই মো. আলী। মো. আলীর বাসা টেকনাফের হ্নীলা মৌলভী বাজার হলেও মাছের ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা পাচারের সুবিধায় হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নতুন ফিশারী পাড়ায় বসবাস করছে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম অর্থ যোগানদাতা হিসেবে রয়েছে মধ্যম নুনিয়াছড়া এলাকার মৃত নুরুল আলমের ছেলে মো. রুবেল।
মূলত নতুন ফিশারী পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে মাছের ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা কারবার পরিচালনা করছে এই সিন্ডিকেটটি। সপ্তাহে প্রতি মঙ্গলবার এবং শুক্রবার ট্রাকে করে চট্টগ্রাম মাছ পৌছে দেয় এই সিন্ডিকেট। মাছের ট্রাকের আড়ালে মো. আলী ও ফরিদ ইয়াবা সহজেই বহন করে যাচ্ছে। বেশির ভাগ সময় তারা নাজিরারটেক থেকে ট্রাকে করে নিয়ে যায় শুটকি। এই সিন্ডিকেটের অর্থ যোগানদাতা রুবেল বর্তমানে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছে পরিণত হয়েছে। তিন বছর আগেও কিছুই ছিল না রুবেলের। বর্তমানে বহুতল ভবন নির্মাণ এবং নিয়মিত নামিদামী গাড়ি নিয়ে চলছে তারা চলাফেরা।
সম্প্রতি নতুন ফিশারীঘাট এলাকার সমাজ কমিটির সভাপতি আমির হোসেন সংবাদ সম্মেলন জানিয়েছে, ওই এলাকায় অনেক মাদক কারবারি রয়েছে। মাছ ব্যবসা ও হাঙ্গর তেলের ব্যবসার আড়ালে মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। যারা ইয়াবা কারবার করছে তারা সবাই দৃশ্যমান। অল্প সময়ে এতো টাকার উৎস হয় কিভাবে। অনুসন্ধান করলে এসব মাদক কারবারের তথ্য বের হয়ে আসবে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে নুনিয়াছড়ায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে নবী হোসেন, ইয়াবা ভেন্ডার হিসেবে পরিচিত জামে মসজিদের পিছনে মিয়া হোছনের পুত্র জসিম, তিন রাস্তা মোড়ের কাদেরের কলোনী এলাকার ওসমানের স্ত্রী আমেনা, মো. আলীর পুত্র নুর আবছার, নুনিয়াছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে খুচরা বিক্রয়কারি শামসুল আলমের ছেলে মোবারক, শিল্প এলাকার নুর মোহাম্মদ, সাজেদা আক্তার সাজু, রুবি আক্তার, শেকু মিয়া, প্রথম ভেন্ডার হিসেবে পরিচিত শফি উল্লাহর স্ত্রী রোজিনা, ছৈয়দ নুরের স্ত্রী ছেন বাহার, শুক্কুর, আবুল কাশেম, নুরুল হক, শামশুল আলম টিটু, আরিফ উদ্দিন, বার্মাইয়া ছৈয়দুল ও নুরুল হক।
এরিমধ্যে অনেকেই আটক হয়ে জেলও কেটেছে। আত্মগোপনে ছিল অনেকেই। বর্তমানে অধিকাংশ মাদক কারবারি এলাকায় ফিরেছে। শীর্ষ কারবারি নবী হোসেন দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিল। তিনি সরাসরি মিয়ানমার থেকে ট্রলার যোগে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। নদীর তীরে আলিশান বাড়ি তৈরি করে কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা কারবার।
চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ইয়াবার ডিপো শহরের নুনিয়াছড়ায় পৃথক অভিযানে পৌন ১৮ লাখ ইয়াবা, পৌন ২ কোটি টাকাসহ ৫ জনকে আটক করেছিল ডিবি পুলিশ। এরমধ্যে কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডী ঘাট থেকে সমুদ্র পথে পাচার হয়ে আসা ৭ বস্তা ভর্তি ১৪ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সদস্যরা। এ সময় আটক করা হয়েছে ২ জনকে। জব্দ করা হয়েছে পাচার কাজে ব্যবহৃত ট্রলারটিও। ওই অভিযানে সূত্র ধরে আটক এক জনের বাড়ি থেকে নগদ ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৫শ’ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ সময় আটক করা হয় ২ জনকে। রাতে আবার অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ৩ লাখ ৭৫ হাজার ইয়াবা। এ সময় আটক করা হয় আরও ১ জনকে।
সব মিলিয়ে পৃথক এ অভিযানে পৌন ১৮ লাখ ইয়াবা, পৌন ২ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় আটক হন- কক্সবাজার পৌরসভার উত্তর নুনিয়ার ছড়া মো. নজরুল ইসলামের পুত্র মো. জহিরুল ইসলাম ফারুক (৩৭), একই এলাকার মো. মোজ্জাফরের পুত্র মো. নুরুল ইসলাম বাবু (৫৫), ফারুকের শ্বশুর আবুল হোসেনের পুত্র আবুল কালাম (৫৫), আবুল কালামের পুত্র শেখ আবদুল্লাহ (২০) ও ফারুকের মামা শ্বশুর আবু সৈয়দের স্ত্রী ছেনুয়ারা বেগম (৪৪)। তারা সবাই নুনিয়াছড়া কেন্দ্রিক ইয়াবা কারবারের সিন্ডিকেট। দীর্ঘদিন ধরে তারা মাছ ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যায়।
নুনিয়াছড়া ও নতুন ফিশারী ঘাট এলাকায় মাদকের বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান, ইতিমধ্যে ইয়াবাসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে নুনিয়াছড়া থেকে। আরো অনেক মাদক কারবারি রয়েছে। অভিযুক্ত এলাকাগুলোর উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।