দৃশ্যপট- কলাতলী চন্দ্রিমাস্থ বখতিয়ার ঘোনা
বিশেষ প্রতিনিধি
“পাহাড়িকা সমাজ পরিচালনা কমিটি” কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ১নং ওয়ার্ড, চন্দ্রিমা হাউজিং সংলগ্ন পূর্ব কলাতলী, বখতিয়ার ঘোনা- উল্লেখ করে ১২ জনের ছবিসহ একটি ব্যানার টাঙানো হয়েছে গত এক সপ্তাহ ধরে। সরকারি কয়েকটি বিশাল পাহাড়ের সামনেই এই ব্যানারটি টাঙানো হয়েছে। ব্যানারের পিছনে পাহাড় কেটে ইতিমধ্যে খন্ড খন্ড করে তৈরি হয়েছে শতাধিক ঘর। এখনো পাহাড় কেটে সেখানে ঘর তৈরি হচ্ছে দিনরাত। ব্যানারে যাদের ছবি রয়েছে এরা সবাই ইতিমধ্যে সরকারি পাহাড় কেটেই ঘর নির্মাণ শেষ করেছে। ব্যানারে ছবি না আসা এমন অর্ধশতাধিক লোকও সরকারি পাহাড় কাটায় জড়িত বলে জানা গেছে। সরকারি পাহাড় দখল, কর্তন এবং বিভিন্ন অপরাধ আড়াল করতেই এই সমাজ পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এরমধ্যে মোবাইল ছিনতাইকারী, ইয়াবা কারবারি এবং রোহিঙ্গাও রয়েছে বলে জানা যায়।
বখতিয়ার ঘোনায় সবাই সরকারি পাহাড় কেটে ঘর তৈরির কথা স্বীকার করে “পাহাড়িকা সমাজ পরিচালনা কমিটি” এর আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিন বলেন, এখানে সবাই গরীব মানুষ। পাহাড়ে থাকে। প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ পরিবারের মতো রয়েছে। গত ২ মার্চ সমাজ কমিটি গঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ পরিবার সমাজের আওতায় এসেছে। পাহাড় কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, সবাই পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করেছে। আমিও পাহাড় কেটে ঘর করেছি। ইফতেকার উদ্দিন নামে একব্যক্তির কাছ থেকে সরকারি পাহাড় কিনে আমি ঘর করি। বর্তমানে যারা পাহাড় কেটে ঘর করেছে সবাই বিভিন্ন জনের দখলে থাকা পাহাড় থেকে এক গন্ডা বা দুই গন্ডা করে কিনেছে। এখানে সমাজ না থাকায় সমাজ কমিটি করা হয়েছে। পাহাড় কর্তন বা রোহিঙ্গাদের আড়াল করার জন্য করা হয়নি সমাজ কমিটি। তবে এখানে রোহিঙ্গা আছে কিনা আমি জানিনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলাতলী চন্দ্রিমার ঘোনাস্থ বখতিয়ার ঘোনা এলাকায় সরকারি খাস খতিয়ানের পাহাড় গুলো দখলের প্রতিযোগিতা চলছে গত এক বছর ধরে। এরমধ্যে আব্দুল মজিদ, প্রবাসী নাছির, ইফতেকার উদ্দিন, মঞ্জুর আলম ও সালামত উল্লাহ বাবুলের নাম উঠে এসেছে সরকারি পাহাড় দখলের পর বিক্রিতে। তারা সবাই খন্ড খন্ডভাবে সরকারি পাহাড় গুলো বিক্রি করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরপর চলছে পাহাড় কেটে স্থাপনা তৈরি।
বর্তমানে বখতিয়ার ঘোনা এলাকায় ১৫টি স্থানে চলছে পাহাড় কর্তন। একই সাথে ২০টির অধিক জায়গায় পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে ঘর।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সমাজ কমিটি বলে যারা ব্যানার দিয়েছে তারা সবাই সরকারি পাহাড় কাটার সাথে জড়িত রয়েছে। সবাই পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করেছে। মূলত পাহাড় দখল ও কর্তন করার জন্য সমাজ কমিটির নাম ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের কোনো অভিযান বা নজরদারী না থাকায় দিন দিন সরকারি পাহাড় দখলের পর কর্তন চলছে বখতিয়ার ঘোনায়।
“পাহাড়িকা সমাজ পরিচালনা কমিটি”র আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিন, যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন, সদস্য সচিব মো. সোহেল রানা, মো. রাসেল, আমির হোসাইন, আবু ছালেহ, মো. রাসেল, সাইফুল্লাহ, সাইদুল করিম, আল ইমরান, ইব্রাহিম ও মো. নিশাতসহ সবাই সরকারি পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করেছে। এরমধ্যে কয়েকজন ছাড়া সবাই রোহিঙ্গা নাগরিক। রয়েছে মোবাইল ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিও। কয়েকজন সৈকতে ক্যামরাম্যানের আড়ালে মাদক কারবারি ও ছিনতাইয়ে জড়িত। সমাজের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে কটেজ থেকে পতিতাসহ আটকের অভিযোগও রয়েছে।
নতুন সমাজ কমিটির বিষয়ে কক্সবাজার ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান টিপু সোলতান বলেন, বখতিয়ার ঘোনায় নতুন সমাজ কমিটির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি জানি ওখানে কোনো সমাজ নেই আপাততে। পাহাড় কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি পাহাড় দখল ও কর্তন খুবই অপরাধ। যদি কেউ দখল বা কর্তন করে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের কলাতলী বিট অফিসার সোহেল রানা বলেন, চন্দ্রিমার ঘোনাস্থ বখতিয়ার ঘোনা এলাকায় কিছু জমি জেলা প্রশাসনের খাস খতিয়ানে আর কিছু বন বিভাগের। তবে বন বিভাগের জমিতে নতুন করে কোন ঘর উঠেনি আর পাহাড়ও কাটা হয়নি। যেগুলো পাহাড় কাটা হয়েছে বা হচ্ছে সব সরকারি খাস খতিয়ানের।
পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শেখ নাজমুল হুদা ও কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার সুইটি বলেন, সরকারি পাহাড় দখলকারী ও পাহাড় কর্তনে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। চন্দ্রিমার ঘোনা ও বখতিয়ার ঘোনা এলাকায় যারা পাহাড় কাটছে এবং সরকারি পাহাড় দখল করে বিক্রি ও স্থাপনা করে যাচ্ছে তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত সময়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।