তানভিরুল মিরাজ রিপন, ক্যাম্প থেকে ঘুরে এসে:
চলতি বছরে বিভিন্ন সংঘর্ষে প্রায় ৫০ জন রোহিঙ্গা মারা গিয়েছে। তন্মধ্যে ২৩ জন মারা গিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে ৷ সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ষাটটির মত। রোহিঙ্গারা ১১ রকমের অপরাধের সাথে জড়িত। তন্মধ্যে ইয়াবা, সোনা চোরাচালান , ধর্ষণ, মাদক দ্রব্য সরবরাহ, কিডন্যাপ, অস্ত্র ব্যবসা ইত্যাদি। এ অপরাধগুলো করে প্রায় ১৪ টিরও বেশি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী (ডাকাত) দল।
গত তিন দিনে দু-গ্রুপের সংঘর্ষে ছয় জন রোহিঙ্গা, দু জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি অনেকটা ভাদ্র মাসের বৃষ্টির মতো হয়ে গিয়েছে৷ হঠাৎ কখন কোন সময় বৃষ্টি হয়ে যায় আবার হঠাৎ কোন সময় রোদে ঝলমলে হয়ে যাচ্ছে তা জানবার উপায় নেই। এই দফায় দফায় সংঘর্ষের কারন জানতে আমি টেকনাফ নয়াপাড়া ক্যাম্পের নতুন ও পুরাতন রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেছি।
তারা বলছেন ‘ এই সংঘর্ষ, মারামারির পেছনে যারা কাজ করছে তারা মূলত আন-রেজিস্ট্রার্ড রোহিঙ্গা। তারা চায় না যে আমরা আমাদের দেশে ফেরত যাই। আমরা আমাদের দেশে আমরা ফেরত যেতে চাই। এরা ডাকাতি করে, ইয়াবা, সোনার চোরাচালান করে, বাজার দখল করে যে আধিপত্য বিস্তার করে ডাকাত (আল ইয়েকিন, মুন্না, সালমান শাহ, জকির, আব্দুল্লাহ) গ্রুপগুলো নিজেদের মধ্য মারামারি করে আমাদের সাধারণ রোহিঙ্গাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে’৷
তারা আরও বলেন এটা আমাদের প্রত্যাবাসন কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ‘আইসিসির মামলার আদালত ও তদন্ত বাংলাদেশে করার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তা না হতে দেওয়ার জন্য মিয়ানমার আর্মির টাকায় গড়া গ্রুপ গুলো এরকম করে। ‘
নুর হোসেন বলে একজন বয়োবৃদ্ধ রোহিঙ্গা বলেন ‘ বাংলাদেশ আমাদের রেখেছে। আশ্রয় দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের কিছু ডাকাত বাহিনী এখানে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করছে৷ একজন রোহিঙ্গা মারা যাওয়া মানে আমাদের একটি শক্তি কমে যাওয়া৷ আমরা সেটা চায় না৷ ‘ কিন্তু ‘ পুরাতন রোহিঙ্গারা এসব ডাকাত দল গুলো তৈরী করে৷ এরা সংখ্যায় কমে গেছে৷ এরা রেজিস্ট্রার না। তাই তারা এগুলো করে৷ ‘
নতুন রোহিঙ্গাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে পুরাতন রোহিঙ্গারা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটায়। যেখানে তারা ট্রেডিশনাল অস্ত্র গুলো ব্যবহার করে৷ রাম দা, গুলতি, লাটি এসব তারা সংঘর্ষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে৷ নতুন রোহিঙ্গাদের দাবি পুরাতন রোহিঙ্গাদের আজীবন ভাসমান থাকতে হবে তাদের কোনো কুল নাই। তাই সে রাগ থেকে এমন কর্মকান্ড করে৷ এবং যখন সংঘর্ষ হয় তখন পুরানো ক্যাম্পগুলো থেকে রোহিঙ্গারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনা আরও জটিল করে।
RAB, পুলিশ, এপিবিএন বিভিন্ন চৌকি থাকা সত্যেও তারা কিভাবে রাতের অন্ধকারে অথবা দিনে এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে যায়? তার ব্যাখ্যা খুবই সহজ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রায় তিন পাশে আবার কিছু কিছু ক্যাম্পের চার পাশে পাহাড়। যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি থাকলেও তারা রাতের গভীরে এসব নজরদারি ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন দলের কর্মীরা যোগাযোগ করে তাদের সতীর্থদের ঘটনাস্থলের পাশাপাশি রাখে এবং আশ্রয় দেয়।
দফায় দফায় সংঘর্ষ করেও পার পেয়ে যাওয়ার কারণগুলি আমি খোঁজবার চেষ্টা করেছি৷ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষ হলে স্থানীয় জনগনের মধ্যেও এমন আতঙ্ক বিরাজ করে যে তারা চলাচল পর্যন্ত সীমিত করে ফেলে৷ এমনকি সন্ধ্যার কোনো বাসে অতি প্রয়োজন না হলে টেকনাফ থেকে বা কুতুপালং হাইওয়ে হয়ে কক্সবাজার কেউ আসবার ঝুঁকি নেন না৷ এর ফলে মানুষের চলাচল কম হওয়াতে ক্যাম্পে বহিরাগতদের (বহিরাগত:বিভিন্ন ক্যাম্প হতে ঘটনাস্থলে আসে) আগমন বাড়তে থাকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রাতের দৃশ্য থমথমে থাকে।
কারন ক্যাম্পের মধ্যে হঠাৎ করে আনাগোনা করতে থাকা বহিরাগত রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রকাশ্যে রাম দা, গুলতি, লাঠি, দেশী অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন ব্লকে তাদের তৎপরতা বাড়তে থাকে। অস্ত্রের ঝনঝনানি গুলো শুনতে শুনতে আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গাদের মধ্যে আবারও সে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের কথা, আতংকের কথা মনে পড়ছে।
তারা মনে করছে এখন আবার আমাদের বাচ্চাদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। একসময় মিয়ানমার আর্মির আতংক ছিল, আর এখন আল ইয়েকিন, মুন্না, নবী হোসেন, জকির গ্রুপের নাম শুনলে তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরাও তৎপর আছে। বিভিন্ন অভিযানে তারা সফলভাবে কোনো না কোনো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উদ্ধার করে। এরপরও এত অস্ত্র আসে কোত্থেকে ?
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রায় কোনো বাজারে কামার নেই, এরপরেও রাম দা আসে কোত্থেকে তাদের হাতে? এটির ব্যাখ্যাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। রোহিঙ্গারা যে দেশী অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে সেগুলোর বেশিরভাগই মিয়ানমারের, যা চোরাই পথে আসে। পাশাপাশি তারা যে ভয়ংকর গুলতি গুলো ব্যবহার করে সেগুলো বাংলাদেশের টেকনাফ অঞ্চলের মানুষেরা এমনিতেই ‘ হান্টা ‘ ‘ চিল হান্টা’ ব্যবহার করে থাকে তার সাথে কোনো মিল নেই। বলে রাখা ভালো যে টেকনাফ-উখিয়ার মানুষেরা ‘গুলতি ব্যবহার করে পাখি ধরতে, কাঠবিড়ালি তাড়াতে, ধান ক্ষেতে চড়ুই পাখি তাড়াতে, বা মৌসুমি পাখি গুলো ধরতে ‘।
এর বাইরে ঐ অঞ্চলের স্থানীয়দের কারো মধ্য গুলতি ব্যবহার করে মানুষ খুন করতে দেখা যায় না। অন্য দিকে রোহিঙ্গারা যে গুলতি গুলো ব্যবহার করে সে গুলতি গুলোতে বিষমিশ্রিত থাকে বলে অনেক রোহিঙ্গাদের ধারনা।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে যে রাম দা গুলোর ব্যবহার হয় তার ধাঁচ ধরনও বাংলাদেশি কোনো দা’র মতো নয়। যার ফলে ক্যাম্পে সংঘর্ষে যে অস্ত্র গুলো ব্যবহৃত হয় তা অধিকাংশ রোহিঙ্গাদের দাবি সেসব অস্ত্র মিয়ানমার থেকে আসে এবং এগুলো মিয়ানমার আর্মি সরবারহ করে৷ তবে এ সংঘর্ষ কি শেষ হবার নয়?
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপকর্ম, খুন, জোর জবরদস্তি, হাইজ্যাক ইত্যাদি করে রাতে। তারা রাতে এ সুযোগ পাওয়ার কারন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘটনা ঘটিয়ে সহজে স্থান ত্যাগ করতে পারে। এবং সেসকল সন্ত্রাসী, ডাকাতদের চেহারা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায় তার কারন মুলত ‘ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ধ্যার পর যে বৈদ্যুতিক বাতি গুলো জ্বালানো হয় তার আলো খুব বেশি দুর যায় না৷ এমনকি দুজন ব্যক্তি একটি বাতির নিচে দাঁড়ালে তাতে দু’জন চেনা মানুষকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায়। সুতরাং এখানে বৈদ্যুতিক বাতির অপ্রতুলতা একটি বিশাল সুযোগ তাদের জন্য।
এই অপ্রতুলতা কমিয়ে আনলে ক্যাম্পে সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রম অনেক কমে আসতে পারে। পাশাপাশি চার পাশের যে কাঁটাতারের বেড়া কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো তা দ্রুত শেষ করলে ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে। ওয়াচ টাওয়ার বাড়ালে তাদের নিয়মিত নজরদারি, অস্বাভাবিক আনাগোনার দিকে নজর রাখতে পারবে। সর্বশেষ দরকার এনজিওগুলোকে নজরদারিতে আনা। পাশাপাশি এসব সফলভাবে সম্পন্ন করতে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। নয় তো ক্যাম্পের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বাড়তে থাকবে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিনও হয়ে যেতে পারে।
লেখক; কূটনৈতিক প্রতিবেদক, ভয়েসওয়ার্ল্ড ২৪.কম ।