• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন

জিলহজ্জের প্রথম দশকঃ গুরুত্ব,ফজিলত ও আমল

নিজস্ব প্রতিদেক / ২৯৭ বার ভিউ
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

হাফেজ লোকমান হাকীম:

সব কিছুর একটা মৌসুম থাকে। তেমনি আশারায়ে জিলহজ হলো ইবাদতের অন্যতম একটি সেরা মৌসুম।
মৌসুমকে যেভাবে কাজে লাগানো হয়,মুমিনদের এটাকেও ঐভাবেই কাজে লাগানো উচিত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فاستبقوا الخیرات. بقرة-١٤٨
তোমরা সৎকাজের প্রতিযোগিতা করো।
▪কেনো এদশক সর্বশ্রেষ্ঠ?
ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ বলেন-
এই দশকে সব মৌলিক ইবাদতগুলো একত্রিত হয়েছে যা অন্য কোনো দশকে হয়নি। যেমন- সলাত,যাকাত,সিয়াম এমনকি হজ্জ। (ফাতহুল বারী)
▪কোন দশক উত্তম?
ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন-
আশারায়ে জিলহজ্জের দিন গুলো রমদানের শেষ দশকের দিনের চেয়ে উত্তম। আর রামাদানের শেষ দশকের রাত গুলো এই দশকের রাতের চেয়ে উত্তম।
(মাজমাউল ফতোওয়া)
▪ বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দশকঃ
বছরের তিনটি দশক সর্বশ্রেষ্ঠ। আর সুগুলো হলো- মুহাররম ও জিলহজ্জের প্রথম দশক এবং রমাদানের শেষ দশক।
◾গুরুত্ব ও ফজিলতঃ
▪কোরআনের বর্ণনা-
والفجر، وليال عشر
শপথ ভোরবেলার, শপথ দশ রাত্রির।-সূরা ফাজর- ১-২
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা.,হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. ও মুজাহিদ রাহ. সহ অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও মুফাসসিরের মতে এখানে দশ রাত বলতে যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশরাতকেই বুঝানো হয়েছে। ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, এটিই বিশুদ্ধ মত।( ইবনে কাসীর)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন-
ويذكروا اسم الله في أيام معلومات على ما رزقهم من بهيمة الأنعام
নির্দিষ্ট দিনসমূহে তারা যেন আললাহর নাম উচ্চারণ করে সেই সকল পশুর উপর, যা তিনি তাদের দিয়েছেন।-সূরা হজ্ব : ২৮
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত, সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা যিলহজ্বের দশ দিনই বোঝানো হয়েছে।-(ইবনে কাসীর)
▪হাদীসের বর্ণনা-
• হযরত জাবির রা.হতে বর্ণিত,রাসূল সাঃ বলেন-
أفضل أيام الدنيا العشر، يعني عشر ذي الحجة، قيل ولا مثلهن في سبيل الله؟ قال : ولا مثلهن في سبيل الله، إلا رجل عُفِّر وجهه بالتراب.
দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল যিলহজ্বের দশদিন জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহর রাস্তায়ও কি
তার সমতুল্য নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর
রাস্তায়ও তার সমতুল্য নেই, তবে ঐ ব্যক্তি,
যার চেহারা ধূলিযুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ শাহদাতের
মর্যাদা লাভ করেছে।-(মুসনাদে বাযযার,মুসনাদে আবু ইয়লা)
• হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত-
ما من أيام أفضل عند الله من أيام عشر ذي الحجة …
যিলহজ্বের দশ দিনের চেয়ে কোনো দিনই আল্লাহর নিকট উত্তম নয়। (সহীহ ইবনে হিববান)
• এসম্পর্কে সহীহ বুখারীর একটি হাদিস হলো-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ ‏”‏ مَا الْعَمَلُ فِي أَيَّامِ الْعَشْرِ أَفْضَلَ مِنَ الْعَمَلِ فِي هَذِهِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا وَلاَ الْجِهَادُ قَالَ ‏”‏ وَلاَ الْجِهَادُ، إِلاَّ رَجُلٌ خَرَجَ يُخَاطِرُ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ بِشَىْءٍ ‏”‏‏.‏
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
রাসূল সাঃ বলেছেনঃ যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ‘আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের ‘আমলই উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়) রাসূল সাঃ বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।
(সহিহ বুখারী)
• হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাঃ ইরশাদ করেছেন আল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে যিলজ্বের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয়
অন্যকোনো দিনের আমল নেই সুতরাং তোমরা সেই দিবসগুলোতে অধিক পরিমাণে তাসবীহ,তাহমিদ,
তাহলীল, ও তাকবীর পাঠ কর।-মুসনাদে আহমাদ।
• রাসূল সাঃ বলেছেন-
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় (ফজিলতপূর্ণ) দিন হলো কুরবানির দিন অতপর মিনায় অবস্থানের দিন। (আবু দাউদ,মিশকাত)
• সাঈদ ইবনে যুবাইর রাঃ জিলহজ্জের দশ দিনে ইবাদতের কারণে অক্ষম হয়ে পরতেন।(দারেমী) এবং তিনি বলতেন – এই দশদিন ঘরের বাতি নিভিও না।
◾ করনীয় আমল-
১/ হজ্জ ও ওমরা করা।
• আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلا.
কারণ এটাই হলো হজ্জের মাস।
২/ চুল, নখ, মোচ ইত্যাদি না কাটা।
• হযরত উম্মে সালামা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন-
إذا رأيتم هلال ذي الحجة وأراد أحدكم أن يضحي فليمسك عن شعره وأظفاره.
তোমরা যদি যিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখতে পাও আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা
করে তবে সে যেন স্বীয় চুল ও নখ কাটা থেকে
বিরত থাকে।(সহীহ মুসলিম)
৩/ ঈদের দিন ছাড়া বাকি নয় দিন রোযা রাখা।
• হযরত হাফসা রা. বর্ণনা করেন-
أربع لم يكن يدعهن النبي صلى الله عليه وسلم : صيام عاشوراء والعشر وثلاثة أيام من كل شهر وركعتين قبل الغداة.
চারটি আমল নবী কারীম সাঃ কখনো ছাড়তেন
না আশুরার রোযা, যিলহজ্বের প্রথম দশকের
রোযা, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযা,
ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায।-
(সুনানে নাসায়ী)
৪/ আরাফাতের দিনের রোযা।
• রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন-
صيام يوم عرفة أحتسب على الله أن يكفر السنة التي بعده والسنة التي قبله.
আরাফার দিনের (নয় তারিখের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর নিকট আশাবাদী যে, তিনি এর দ্বারা বিগত এক বছর ও আগামী বছরের গুনাহ
মিটিয়ে দিবেন।(সহীহ মুসলিম)
• তবে যারা হজ্বে গিয়েছেন, তাদের জন্য এদিন রোযা না রাখা উচিত।
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- نَهَى عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَةَ
হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ আরাফার দিনে আরাফার ময়দানে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ)
• আরাফাতের দিনের সকল দোয়া কবুল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, শ্রেষ্ট দোয়া হচ্ছে আরাফাতের দোয়া। এ দিন আমিও আমার পূর্বেকার নবীদের বলা সর্বোত্তম বাক্য হচ্ছে (তিরমিজি)-
لَا إِلَهَ إِلَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ، وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
৫/ তাকবীর বলা।
তাকবীরে তাশরীক-
যিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখের ফজর থেকে তের তারিখের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর একবার তাকবীর বলা ওয়াজিব। পুরুষের জন্য আওয়াজ করে,আর মহিলাদের জন্য নীরবে।
ا بن عباس : أنه كان يكبر من غداة يوم عرفة إلى آخر أيام التشريق
হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ আরাফার দিন তথা ৯ ই জিলহজ্বের ফজর থেকে আইয়ামে তাশরীকের শেষ দিন পর্যন্ত পর্যন্ত তথা ১৩ ই জিলহজ্ব [আসর নামায] পর্যন্ত তাকবীরে তাশরীক পড়তেন। (সুনানে বায়হাকী)
• সাধারণ তাকবীর-
ابن عمر ؓ -فاکثروا فیهن من التهلیل والتکبیر والتحمید
জিলহজ্জের প্রথম দিবস থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত তাকবীর বলা সুন্নাত। রাস্তা-ঘাটে,ঘরে-বাইরে, হাট-বাজারে,চলা-ফেরায়,মসজিদে-মাদরাসায়-অফিস-আদালতে সর্বস্থানে পড়া সুন্নাত।
আল্লাহ বলেন-
واذکروالله فی ایام معدودات یعنی ایام العشرات و ایام التشریق (قال ابن عباس ؓ)
• ইমাম বুখারী রহঃ বলেন-
ইবনে ওমর ও আবু হুরায়রাহ রাঃ এই দশকে বাজারে বের হতেন,উচ্চ আওয়াজে তাকবীর বলতেন এবং লোকেরা তাঁদের তাকবীর শুনে তারাও বলতো। (বুখারী)
৬/ কুরবানী করা।
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন,
কুরবানীর দিনে বনী আদম এমন কোন কাজ করতে পারে না, যা আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিত করা তথা কুরবানী করার চেয়ে বেশি প্রিয়। কুরবানীর পশু সকল শিং, তাদের পশম ও তাদের খুরসহ কেয়ামতের দিন [কুরবানীদাতার পাল্লায়] এসে হাজির হবে। আর কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর নিকট সম্মানের স্থানে পৌছে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কুরবানী করবে। {সুনানে তিরমিজী}
• আর কোরবানী হলো সূন্নাতে ইবরাহীম আঃ-
عن زيد بن أرقم قال أصحاب رسول الله صلى الله عليه و سلم يا رسول الله ماهذه الأضاحي ؟ قال ( سنة أبيكم إبراهيم ) قالوا فما لنا فيها ؟ يا رسول الله قال ( بكل شعرة حسنة ) قالوا فالصوف ؟ يا رسول الله : قال ( يكل شعرة من الصوف حسنة
যায়েদ বিন আরকাম রাঃ বলেন,
রাসূল সা. এর সাহাবাগণ বললেন-হে আল্লাহর রাসূল! এ সকল কুরবানীর ফযীলত কি? উত্তরে তিনি বললেন-তোমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম আ. এর সুন্নাত। তারা পুনরায় আবার বললেন-হে আল্লাহর রাসূল! তাতে আমাদের জন্য কী সওয়াব রয়েছে? উত্তরে তিনি বললেন-কুরবানীর পশুর প্রতিটি চুলের বিনিময়ে একটি সওয়াব রয়েছে। তারা আবারো প্রশ্ন করলেন-হে আল্লাহর রাসূল! ভেড়ার লোমের কি হুকুম? [এটাতো গণনা করা সম্ভব নয়] তিনি বললেন-ভেড়ার লোমের প্রতিটি চুলের বিনিময়ে একটি সওয়াব রয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
০৭/ তাওবা করা-
এটি হলো সর্বশ্রেষ্ঠ আমলের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ বলেন-
﴿ وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُون.
আল্লাহ তোমার সকলেই আল্লাহর দিকে তাওবা করো- সূরা নূর।
০৮/ অধিক পরিমাণে আমলে সালেহ করাঃ
কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন,হাদীস ও সীরাত পাঠ,নফল সালাত,সদাকাহ,সৎকাজের আদেশ করা,অসৎকাজের নিষেধ করা,দাওয়াতী কাজ করা ইত্যাদি।
ঈমানদারের জন্য এই এই সময়টি আমানত, এর যথার্থ ব্যাবহারের জন্য সকলের প্রস্তুতি নেয়া দরকার।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।

লেখক:খতীব,নন্দন হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদ,চট্টগ্রাম।


বাংলাদেশ সময়:২১৩৫,১৪ জুলাই,২০২০


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন