বিশেষ প্রতিনিধি: কক্সবাজারের সদরসহ চার উপজেলায় এনজিওর দেওয়া নকল বীজ রোপণ করে কপাল পুড়লো হাজার হাজার কৃষকের। প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে ওই বীজ রোপণ করা হয়। ইতোমধ্যে দুই থেকে তিন মাস পেরিয়ে গেছে। গাছের আকারও বড় হয়েছে। কিন্তু তেমন কোনো ফলন চোখে পড়ছে না। এতে হতাশ কৃষক।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও) নামের এনজিওর দেওয়া শশা, তিত করলা, বেগুন, ঢেঁড়সের বীজে ভালো ফলন হবে, মাঠপর্যায়ে সুশীলনের কর্মীদের এমন চটকদার প্রচারে আশায় বুক বাঁধেন কৃষক। জেলার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলার প্রায় ৩৫ হাজার কৃষক ওই বীজ রোপণ করেন।
ঝিলংজা ইউনিয়নের পূর্ব মোক্তারকুল গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক বজল আহমেদ বলেন, একনাগাড়ে কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন জাতের শশার আবাদ করে আসছেন নিজের ১ একর জমিতে। ফলনও আশানুরূপ পেয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন প্রতিবছর। কিন্তু এনজির দেওয়া বীজে ফলন কয়েক গুন পাওয়া যাবে-এমন প্রচারণায় বীজ রোপন করে চরমভাবে প্রতারিত হলাম এবার। এতে আমার দুই লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।

একই এলাকার কৃষক নুর মোহাম্মদ বলেন, কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী দেড় মাসের মধ্যে উচ্চফলন হওয়ার কথা। দেড় মাস দূরে থাক তিন মাসেও তেমন কোনো ফলন দেখছি না গাছে। আমার মতো কয়েক হাজার কৃষক এনজিওর দেওয়া বীজ রোপণ করে পথে বসেছেন।
দরগাহ পাড়া গ্রামের কৃষক নুরুল আলম বলেন, শশা চাষে অন্যান্য বছর ভালো ফলন হওয়ায় আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছি। এ কারণে চলতি বছর আমি ৬০ শতক জমিতে এফএও নামে এনজিওর পক্ষ হয়ে সুশীলনের মাঠকর্মী রেজাউল করিমের পরামর্শে তাদের দেওয়া বীজ রোপণ করি কয়েক গুন ফলনের আশায়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো ফলন দেখছি না গাছে। এতে আমার প্রায় কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, এভাবে কয়েক হাজার কৃষক ওই এনজিওর চটকদার প্রচারে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের দেওয়া বিভিন্ন রকমের বীজ রোপণ করে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে দিতে হবে এনজিওকে। তা না হলে দায়-দেনা করে শশা ও ঢেঁড়স উৎপাদনে নামা প্রান্তিক কৃষক পথে বসবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের পূর্ব মোক্তারকুল, পশ্চিম মোক্তারকুল, দরগাহ পাড়া, চেয়ারম্যান পাড়া, খরুলিয়া ও মিঠাছড়ির চরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার তিন শতাধিক কৃষকের মধ্যে অধিকাংশ এনজিওর দেওয়া বীজ রোপণ করেন জমিতে। গাছের আকার অনেক বড় হলেও কোন ফলন নেই। সুশীলনের মাঠকর্মীরা পাড়ায় পাড়ায় ব্যাপক প্রচার চালান। এতে ওই বীজ রোপণে কৃষক উদ্বুদ্ধ হন।
মোক্তার আহাম্মদ, মোবারক, হানিফসহ অসংখ্য কৃষক দাবী করেন, কয়েক গুন ফলনের কথা বলে এনজিওর কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীরা কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তারা বাজার থেকে নকল ও খোলা বীজ কিনে প্যাকেটজাতকরণ করেন। হয়তো বা সাধারণ বীজ এনজিওর প্যাকেট সংগ্রহ করে তাতে নকল বীজ ঢুকিয়ে গ্রাম-গঞ্জে প্রতারকচক্র আমাদেরকে ঠকিয়েছেন। যেসব জমিতে এই বীজ রোপণ করা হয়েছে সেখানে পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি।
এই শশার বীজের প্যাকেটে উৎপাদক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোন প্রতিষ্টানের নাম লেখা না থাকলেও আন্তর্জাতিক সংস্থা ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও) এর লেখা রয়েছে। এফএওর পক্ষে বীজ বিতরণকারী সুশীলনের কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, অনেক কৃষকের অভিযোগ পেয়েও কিছু করতে পারছিনা। কারন আমরা শুধুমাত্র বিতরণ করেছি। কোন ধরনের বীজ কেনা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই।
এফএওর কর্মকর্তা ও বীজ বিতরণকারী বিদ্যুৎ কুমার হালদার অভিযোগটি মানতে নারাজ। তিনি দাবি করেন, কোনো অবস্থাতেই তার দেওয়া বীজ নকল নয়। কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে বীজ দেওয়া হয়েছে। কোন কৃষকের অভিযোগ থাকলে জেলা কৃষি অধিদপ্তর বারাবরে লিখিত দিতে বলেন। কয়েকজন কৃষক বিভিন্ন অজুহাতে শুধু অভিযোগ করেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ গোলাম সরওয়ার তুষার সরেজমিনে ওই বীজ রোপন করা জমিতে গিয়ে কৃষকদের অভিযোগ সত্য হিসেবে প্রমাণ পেয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, এনজিওর কর্মকর্তারা নকল বীজ কিনে কৃষকের সাথে প্রতারনা করেছেন। আবার সেই দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চেষ্টা করছেন। তারা কি বীজ, কোন ধরণের বীজ বিতরণ করেছেন আমাদের জানা নেই।
তিনি আরোও বলেন, এনজিরও কর্মকর্তা বিদ্যুৎ কুমার শুধু শুধু মিথ্যা বলছেন। তারা কৃষি অধিদপ্তরের সাথে কোন ধরনের সমন্বয় করেন নি। বিতরণের দিন আমাদের উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেন। ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পাবার দাবি করারটা যৌক্তিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।