সিরাজুল ইসলাম:
করোনা ভাইরাস সংক্রমনে রেড জোনের ঘোষণার মধ্যেও কক্সবাজার শহরের খুরুশকুল ব্রীজ ঘেঁষে থেমে নেই জাহাঙ্গীর কাসেমের নদী দখল করে ফিশিং বোট নির্মাণের কাজ। সেখানে সরকারি নির্দেশনা না মেনে অর্ধশত শ্রমিক প্রতিনিয়ত ফিশিং বোট নির্মান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, সেখানে নদীর জায়গা দখল করে করোনা ভাইরাস সংক্রমনেও প্রায় ১০টি বোট মেরামতের কাজ চলছে। তৈরী করছে নতুন ট্রলারও।
বোট নির্মানের কাজে পুড়ানো কালো ধোয়ার আর তেল নদীতে মিশে গিয়ে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। তৈরী হচ্ছে বনের চোরাই কাঠ দিয়ে ফিশিং বোটও। অদৃশ্য কারণে বন বিভাগ-পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চক্রটি।
সম্প্রতি বাঁকখালী নদীর উপর সেতু নির্মা প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর দখল প্রক্রিয়া বেড়েছে দ্বিগুণ। এতে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে নদী, বিপন্ন হতে চলেছে অস্তিত্ব। প্রতিনিয়তই চলছে এসব দখল প্রক্রিয়া।
জানা গেছে, জাহাঙ্গীর কাশেম বাঁকখালীর নদীর শীর্ষ দখলদারদের একজন। জাহাঙ্গীর কাসেমসহ আশপাশে সরকারি ১ নং খাঁস খতিয়ানের ১০ হাজার ২ দাগের (শ্রেণী নদী) নদীর তীরের জমি দখল করে সেখানে দখলবাজরা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য দিচ্ছে স্পার বাঁধ। অন্যদিকে নদীর তীর দখল করে দিনদিন তৈরী হচ্ছে চিংড়ি ঘের, জেটি, ঘর-বাড়িসহ ফিশিং বোট নির্মানের অবৈধ কারখানা। এতে বাঁধের নিচে নদীর তলদেশে পলি জমে যাচ্ছে। একারণে বাঁধের উপর স্রোতের আঘাত আসবে না।

দখলদারদের থাবায় ক্রমে নদীর অংশটুকুও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে নদীর তীরে নির্মিত বাঁধসহ স্থাপনা সীলগালা করলেও জাহাঙ্গীর কাসেমের ফিশিং বোট কারখানায় অভিযানের আছড় লাগেনি। যার ফলে বেপরোয়াভাবে বাঁকখালী নদী গিলে খাচ্ছে নদীখেকো জাহাঙ্গীর কাসেম।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সেখানে দেখা যায়, প্রকাশ্যে ভূমিদস্যুরা নদীর তীর দখল করে নানা স্থাপনা নির্মাণ করলেও প্রশাসন আংশিক অভিযান ছাড়া স্থায়ীভাবে কিছু করতে পারছে না। এতে নদী দখল ও ফিশিং বোটের কালো ধূয়ায় পরিবেশ বিপন্নের পাশাপাশি নদীর মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।
স্থানীয় লোকজন থেকে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর কাসেম নামে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি খুরুশকুল ব্রীজ এলাকার দখলযজ্ঞে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাহাঙ্গীর কাসেম বিশেষ ক্ষমতা আইন, বিষ্ফোরক দ্রব্য, এসিড অপরাধ দমন আইন, মারামারি, পাহাড় কাটাসহ একাধিক মামলার আসামী। জাহাঙ্গীর কাসেমের নেতৃত্বে রয়েছে আরেক দখলবাজ জনি। তিনি জাহাঙ্গীর কামেসের ম্যানেজার হিসেবে পরিচিত। সে নদীর তীরের বোট নির্মাণ দেখাশুনা করেন। প্রশাসনের অভিযান কখন হবে না হবে সেদিকে খোঁজ খবর রেখে কাজ চালিয়ে যান বলেও জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা আরও জানান, বর্তমানে জাহাঙ্গীর কাসেেমের দখলে রয়েছে নদী তীরের ৫ একরেরও বেশি জমি। তার নিয়োগ করা শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত নতুন করে নদীর তীর ভরাট ও ফিশিং বোট নির্মাণ কাজ করছেন। ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে বিশাল আয়তনের তীরভূমি। পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি না থাকায় নদীর তীরের প্যারাবন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেখানে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের পর বাঁধের পাশে একের পর এক ছোট স্পার বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীর স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন করা হচ্ছে। এর পর সেখানে ফিশিং বোট, জেটি, চিংড়ি ঘের নির্মান করে পরিবেশ দূষণ করছে। প্রশাসন যদি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয় তবেই তাদের দখল-বেদখল ঠেকানো সম্ভব। ‘

নদী দখল- দূষণ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর কাসেমের ম্যানেজার জনি বলেন, নদীর তীর তো ব্যবহার হবেই। মালিকের নির্দেশে ফিশিং বোট নির্মাণের কাজ চলছে। কেউতো বাঁধা দেয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর কাসেম বলেন, আমার ফিশিং বোট নির্মাণের জমি ১ নং খাস খতিয়ানের শ্রেণী নদী হলেও আমি আরএস, এমআরা মূলে একটি খতিয়ান সৃজন করেছি। আরো একটি খতিয়ানের মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে। করোনা সংক্রমণরোধে রেডজোন চলাকালীন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
এনভায়রনমেন্ট পিপল এর নির্বাহী রাশেদেুল মজিদ বলেন, বাঁকখালী নদীর সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে কয়েক বছর আগে। অথচ চিহ্নিত সীমানার মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে নদী দখল করে শত শত ভবন, চিংড়ি ঘের, ফিশিং বোট নির্মাণের কারখানাসহ ব্যবসার নামে নদীর জমিতে ভূমিদস্যুতা চলছে প্রতিনিয়ত। সরকারি খাস খতিয়ানের ১০ হাজার ২ দাগের প্রায় ৬৬ একর জমি যদি উদ্ধার না হয় তবে দখলবাজরা শত কোটি টাকার এসব জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে ফেলবে।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী-পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, নদীর তীরে প্যারাবন ধ্বংস ও পরিবেশ দূষণ করে বোট নির্মাণের বিষয়টি জানতে পেরেছি। শিঘ্রীই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার মুক্তার বলেন, বর্তমানে করোনা ভাইরাসে মোবাইল কোর্টের অভিযান ও তদারকি কম থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে নদী দখলেএবং বোট নির্মাণ করছে। খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।