• বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম
চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলেন ‘কালু ড্রাইভার’ কর্মস্থল কক্সবাজার : প্রজেক্ট ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেবে সেভ দ্য চিলড্রেন কক্সবাজারসহ ৫ জেলায় ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কা ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যাকান্ডে দুই নারীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা সাগরে ভাসতে থাকা ১৩ জেলেকে উদ্ধার করল কোস্টগার্ড চকরিয়া ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : হুমকির অডিও ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজারকে সাজালে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ার পথে সীতাকুন্ডে দুর্ঘটনায় একজন নিহত আসছে টানা ৭ দিন ছুটির সুযোগ জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানের বায়োতে যা লেখা হয়েছে

পিএমখালীর প্রতারক আব্বাসের শিকার রোহিঙ্গা নারী : হাতিয়ে নিলেন টাকা

বিশেষ প্রতিনিধি: / ৪০৯ বার ভিউ
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই, ২০২৩

কক্সবাজার সদরের পিএমখালীতে এক দুর্ধর্ষ প্রতারকের আভির্ভাব ঘটেছে। তার ভয়ানক প্রতারণা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউ। প্রবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মান্যগণ্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজের বিত্তশালী পরিবার কিংবা রোহিঙ্গা সবাই তার একের পর এক শিকারে পরিণত হচ্ছে।

থানার দালালি, প্রতিবেশীর জমি দখল, এলাকার সচ্ছল ব্যক্তিদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, বিচারের নামে দু’পক্ষের টাকা আত্মসাৎ করাসহ এমন কোনো দুঃসাহসী অপকর্ম নেই যা সে করেনি ইতিমধ্যে। এমনকি নিজেকে রাতারাতি টাকার কুমির বনে যাওয়া জেলাজুড়ে অন্তহীন আলোচনায় থাকা কথিক পাওয়ার আলীর ভাই পরিচয় দেওয়া, সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিসহ দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিশ্বস্ত তল্পিবাহক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে এ প্রতারক। থানা অথবা দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বিভিন্ন অভিযোগের পাহাড় তার বিরুদ্ধে জমা পড়লেও সেসব ব্যাপারে একেবারেই বেপরোয়া এই দুর্ধর্ষ প্রতারক।

এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে জমি দখল, হুমকি-ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়, নানা কূট-কৌশলে টাকা আত্মসাৎ করে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কীভাবে সেগুলোতে রেহায় পেতে হয় সেটাও সে ভালো মতোই রপ্ত করেছে। আর এভাবে দিনে দিনে দুর্ধর্ষ হয়ে উঠছে সে। তার শিকারের থলিতে একের পর এক যুক্ত হচ্ছে ভুক্তভোগীর নাম। দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্তদের তালিকা।

এতক্ষণ যার কথা বলা হচ্ছে তিনি হলেন- কক্সবাজার সদরের পিএমখালী ইউনিয়নের গোলারপাড়া গ্রামের দরিদ্র নৌকার মাঝি ইলিয়াস প্রকাশ ওরফে কালু মাঝির ছেলে আব্বাস উদ্দিন। জমি দখলে বাধা দেয়ায় স্থানীয় এক ষাটোর্ধ বৃদ্ধের পাকা দাঁড়ি টেনে ছিড়ে মারধর করার অভিযোগে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগে মামলাও রুজু হয়েছিল। অল্প কিছুদিনে আইনের ফাঁক গলে রেহায় পায়। এরপর আবারও শুরু করে সেই পুরোনো কৃত্তিকলাপ। এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে যখন যেভাবে যা করার তা করে আসছে এই দুর্ধর্ষ প্রতারক আব্বাস। প্রশাসনের সাথে পেরে উঠা এ প্রতারকের সাহস এখন আকাশচুম্বি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেখানে নস্যি সাধারণ মানুষ তার কাছে কিছুই নয়।

এবার সেই প্রতারক আব্বাসের শিকারের থলিতে যুক্ত হয়েছে এক রোহিঙ্গা নারীর নাম। অশিক্ষিত আব্বাস নিজেকে সিনিয়র আইনজীবী পরিচয় দিয়ে তার কারাবাসে থাকা স্বামীর জামিনের অজুহাতে ‘বিচারকের নাম ভাঙিয়ে’ ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ওই রোহিঙ্গা নারীর অভিযোগ, আব্বাস তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে এক দফা ধর্ষন ও করেন তিনি।

এমন অভিযোগ তুলে কক্সবাজার সদর থানা ও র‍্যাবের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করে ভুক্তভোগী রোহিঙ্গা নারীর স্বামী শফি আলম। তিনি উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া ৪ নং ক্যাম্পের সি ব্লক ২ এর বাসিন্দা।

অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর একটি মাদক মামলায় আটক হয়ে শফি আলম কারান্তরীন হন। তাকে জামিনে মুক্ত করার আশায় তার স্ত্রী কুলসুমা বেগম কক্সবাজার আদালত চত্বরে আইনজীবীর সাথে কথাবার্তা বলার জন্য যান। সেখানে তার স্ত্রীকে বিভিন্ন ধরণের মিথ্যা কথাবার্তা বলে এবং আব্বাস নিজেকে সিনিয়র আইনজীবী ও বিচারকের কাছের লোক পরিচয় দিয়ে কারাগারে থাকা শফি আলমকে ১৫ দিনের মধ্যে জামিনে মুক্ত করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুই লাখ টাকা দাবি করে তার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। এবং তার স্ত্রী কুলসুমাকে আব্বাসের বাড়িতে নিয়ে যান।

একপর্যায়ে গত বছরের ৩ জুলাই কুলসুমার কাছ থেকে আদালত চত্বর ও আব্বাসের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তিন দফায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা নেন আব্বাস। টাকা নেয়ার পর তার স্ত্রী কুলসুমা জামিনের বিষয়ে আব্বাসকে তাগাদা দিলে সে তাকে নানান ধরনের মিথ্যা আশ্বাস দিতে থাকে। দীর্ঘদিন কোনো সুরাহা না পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে নানা ধরনের হুমকি ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানি করেন। পরবর্তীতে কুলসুমা ধার-দেনা ও ক্যাম্পে চাঁদা তুলে গত ২৭ জুন একজন আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনে মুক্ত করে তার স্বামী শফি আলমকে। জামিনে বের হয়ে শফি আলম আব্বাসের কাছে টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। বর্তমানে রোহিঙ্গা দম্পতিকে আব্বাস ক্যাম্পের বিভিন্ন সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীদের দিয়ে হত্যা ও গুমের হামকি দিচ্ছেন বলে তারা দাবি করেন। টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে আব্বাসের লালিত সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হুমকিতে রোহিঙ্গা পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে সেখানে উল্লেখ করেন।

ভুক্তভোগী কুলসুমা বেগম বলেন, কারাগার থেকে আমার স্বামীকে আদালতে নেয়া হলে সেখানে আমি তাকে দেখতে যাই। এ সময় আমি এক পাশে বসে কান্না করেছিলাম। আব্বাস আমার কাছে এসে নিজেকে সিনিয়র আইনজীবী পরিচয় দিয়ে সমস্যার কথা জানতে চেয়ে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যান। কিছুদিন পর বিচারকের জন্য দুই লাখ টাকা দাবি করে তাকে খুশি করার জন্য আমাকে কুপ্রস্তাব দেন। নিরুপায় হয়ে আমিও তার কথায় রাজি হলে আমাকে একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। পরে তিন দফায় আমার কাছ থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা নিয়ে এখন অস্বীকার করছেন তিনি। অথচ টাকা লেনদেনসহ তারসাথে বলা কথোপকথনের যাবতীয় কল রেকর্ড আমার কাছে রয়েছে। লোক লজ্জার ভয়ে আমাকে ধর্ষণ করার বিষয়টিও অভিযোগে লেখা হয়নি। এসব রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

কক্সবাজার আদালত পাড়ার সংশ্লিষ্টসহ স্থানীয়রা জানান, আব্বাসের গায়ে কালো কোট। পরনে গাউন। হাতে মামলার ফাইল। দেখে মনে হয় মহাব্যস্ত। নিয়মিত বসেনও বিভিন্ন চেম্বারে। আইনজীবী পরিচয়ে মক্কেল ভাগিয়ে নেন। মক্কেলের সাথে করছেন রফাদফাও। তবে তিনি আইনজীবী নন, আইনজীবী ছদ্মবেশে টাউট। এমনকি তিনিসহ তার অপরাপর ভাইয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোতেই পারেনি কেউ। এই টাউটের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেক নিরীহ মানুষ। তার ফাঁদে পড়ে অনেক বিচারপ্রার্থী হারাচ্ছেন হাজার হাজার টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়- অভিযুক্ত আব্বাস উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে তার প্রতিবেশীদের সম্পদ লুট, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার সহ আরও বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত। সে দেশের আলোচিত কুখ্যাত ‘পাওয়ার আলী’র বড় ভাই। আলী সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা খুনে ফাঁসির রায় প্রাপ্ত ওসি প্রদীপের কক্সবাজার শহরের ইনচার্জ হিসাবে কাজ করতো। সে সময় পুলিশকে ব্যবহার করে থানা কব্জায় নিয়ে পিএমখালী সহ পুরো কক্সবাজার শহরে এক ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলো আলী। এখনও সেই আলীর জের ধরে তার বড় ভাই আব্বাস উদ্দিন যাবতীয় অপকর্ম করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা।

অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বেশির ভাগ মানুষ শিক্ষা দীক্ষায় অনগ্রসর হওয়ায় ধূর্ত চরিত্রের আলী এবং তার ভাইয়েরা সাধারণ মানুষগুলোকে নানা ভাবে মানসিক চাপ সৃষ্টি, মারধর এবং হুমকি ধমকি দিয়ে জিম্মি করে রেখেছে বলে অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এলাকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, শিল্পোদ্যোক্তারাসহ সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছেন কথিত ‘পাওয়ার আলী’র ভাইদের কাছে। তাদের দাপটে মানুষজন নিজেদের কেনা কিংবা পৈতৃক জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করতে পারছেন না। তাদের নির্যাতনে অনেকেই হয়েছেন গৃহহীন, আবার কেউ কেউ প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে এলাকা ছাড়া। আর বিচারের নামে টাকা আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, হামলা, হুমকি-ধমকিতে নিয়মিত কেউ না কেউ হচ্ছেন ভুক্তভোগী। এমতাবস্থায় ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই প্রাণভয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না সাংবাদিকদের সামনে। তবে কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুখ খুলেছেন, বর্ণনা দিয়েছে আলী ও তার ভাইদের নির্যাতনের লোমহর্ষক সব চিত্রের।

সচেতন মহল বলছেন, কক্সবাজারের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের যে পরিবার বা ব্যক্তিকে ‘ক্ষমতাধর’ হিসেবে সমীহ করেন, তারাও একসময় আলীকে তোয়াজ করে চলতেন বলে আলোচনা আছে। দুয়েক আগে প্রতারক সাহেদসহ সরকার দলের দুর্নীতিবাজ নেতাদের গ্রেফতারের পর অনেকটা আড়ালে চলে যান পাওয়ার আলী। এরপর থেকেই তার প্রতারণার ঘটনা ফাঁস হতে থাকে। কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, আলী ও তার অপরাপর ভাইয়েরা সাহেদের মতোই বহুরূপী প্রতারক।

এলাকাবাসী বলছেন, কক্সবাজার সদরের পিএমখালী ইউনিয়নের গোলারপাড়া গ্রামের দরিদ্র নৌকার মাঝি দিনমজুর ইলিয়াস প্রকাশ দিনমজুর কালু মাঝির ছেলেদের অদৃশ্য উত্থান হয় মাত্র ১০ বছরে। আব্বাস, আলীসহ তাদের অপরাপর ভাইদের জাদুর কাঠি হচ্ছে জালিয়াতি আর প্রতারণা। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা প্রচার করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের ক্ষমতাবান হিসেবে উপস্থাপন করে কৌশলে তারা প্রতারণার জাল ফেলেন নানা স্থানে। তাদের একাডেমিক শিক্ষা না থাকলেও তদবির বাণিজ্য ও বেদখলে থাকা জমি ক্রয় এবং ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তারা।

এই বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত আব্বাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার রোহিঙ্গা নারীকে তিনি সহযোগিতা করতে চেয়েছেন বলে দাবি করেন। প্রতিবেদকের হাতে থাকা টাকা লেনদেনের কথোপকথনের রেকর্ডগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদোত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগটি কেটে দেন।

কক্সবাজার সদর থানার এসআই শেখ ফরিদ বলেন, এক রোহিঙ্গার অভিযোগ পেয়ে অভিযুক্ত আব্বাসের সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে তার কথা বার্তা আমার কাছে সুবিধার মনে হয়নি। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন