ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক:
সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের এই সদস্য ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী। একাধিকবারের সংসদ সদস্যও ছিলেন। নিজ জেলা কক্সবাজারের দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় নেতাও বটে। কিন্তু আইনি জটিলতায় গত সাতবছর ধরে দেশে ফেরার সুযোগ হচ্ছে না এই রাজনীতিকের। ফলে তার সান্নিধ্যও পাচ্ছেন না নেতাকর্মীরা।
২০১৫ সাল থেকে ভারতের শিলংয়ে অবস্থান করা এই রাজনীতিক তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে দেশে ফেরার কথা প্রায়ই বলছেন। মাঝে শারীরিক অসুস্থতা পেয়ে বসলেও এখন অনেকটা সুস্থ আছেন তিনি। যদিও পরিবার-পরিজন ছাড়া অনেকটা একাকী জীবন যাপন অনেকটা ক্লান্ত করে ফেলেছে তাকে।
তবে এরমধ্যেও প্রতিনিয়ত দলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখছেন তিনি। স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতারাও প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করছেন তার সঙ্গে।
আর দেশে থাকা স্ত্রী সন্তানদের জন্য বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরও নিয়মিত যোগাযোগ আছে বলে জানা গেছে।
ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাকে খালাস দেয় নিম্ন আদালত। পরে দেশে ফেরারও প্রস্তুতি নেন সালাউদ্দিন। কিন্তু সেই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করায় থমকে যায় দেশে ফেরার প্রক্রিয়া। অনেকদিন ধরে আপিলের শুনানিও বন্ধ রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদের পরিবার ও তার ঘনিষ্ঠজনদের অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে আপিলের শুনানি করছে না।
বিএনপির এই নেতার ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম হেলালী বলেন, ‘শারীরিক যেসব জটিলতা ছিল তা অনেকটা ভালো। কিন্তু শিলংয়ে শীতের প্রকোপ বেশি হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে সালাউদ্দিন আহমেদের। প্রতিনিয়ত আমার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। নেতাকর্মীদেরও খোঁজ নিচ্ছেন। তবে দেশে ফেরার জন্য তার মন কাঁদে সবসময়। আশা করি আপিল নিষ্পত্তি হলে তিনি দেশে ফিরে আসতে পারবেন।’
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আপিল পেন্ডিং অবস্থায় আছে। কোনো শুনানি হচ্ছে না। দুই দেশের ভেতরের বিষয়। কবে শুনানি হবে কোনো ধারণা নেই। কবে মামলা শেষ হবে, কবে দেশে ফিরতে পারবো—তা কী করে বলব!’
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন। পরবর্তীতে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ‘উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরাফেরা’ করার সময় ওই বছরের ১১ মে তাকে আটক করে শিলং পুলিশ। তার নামে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা করা হয়।
তিনি শিলং পুলিশকে জানান, গোয়েন্দা পরিচয়ে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ তাকে তার উত্তরার বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়। একটি প্রাইভেট কারে তাকে শিলং নেওয়া হয়। কিন্তু গাড়িটি কোথা থেকে ছেড়েছিল বা গাড়িতে আর কে বা কারা ছিলেন তা তিনি বলতে পারেননি।
কে এই সালাহউদ্দিন?
কক্সবাজারের চকরিয়ায় জন্ম নেয়া সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন আইন বিভাগে। এলএলবি (সম্মান) ও এলএলএমে উত্তীর্ণ হন কৃতিত্বের সঙ্গে।
বিশ্ববিদ্যালয় থাকাকালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সংগঠনের একাধিক পদে ছিলেন। ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। এরশাদের আমলে কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে।
পরবর্তিতে ৭ম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পান সালাউদ্দিন। বগুড়ায় কর্মরত থাকাবস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে যোগ দেন তিনি। পরে ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন সালাউদ্দিন।
এরপর ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) থেকে নির্বাচিত হন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তাকে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও দেয়া হয়।
ওয়ান ইলেভেনের সময় দুই বছরেরও বেশি সময় কারাগারে থাকতে হয় তাকে। তিনি কারাগারে থাকাবস্থায় নবম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। ওই নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন।
১৯৯৬ সালে সালাহউদ্দিন আহমেদ কক্সবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হন। পরে দুবার কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে ২০১০ সালে জাতীয় কাউন্সিলে তাকে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি ।
মাঝে কিছুদিন দলের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। একপর্যায়ে নিখোঁজ হন তিনি। ভারতের মেঘালয়ের সিলং শহরে উদ্ধার হওয়ার পর সেখানে থাকাবস্থায় তাকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়।
যেভাবে নিখোঁজ হন সালাউদ্দিন
২০১৫ সালে বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পান সালাহউদ্দিন। প্রতিনিয়ত অজ্ঞাতস্থান থেকে দলের বক্তব্য গণমাধ্যমে পাঠাতেন। হঠাৎ করে ওই বছরের ১০ মার্চ উত্তরা থেকে তাকে তুলে নেয়া হয়। ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর ১১ মে বিপর্যস্ত অবস্থায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং এর গলফ লিংক মাঠে পাওয়া যায়।
পরবর্তিতে মেঘালয় রাজ্যের পুলিশ ওই বছরের ৩ জুন ভারতে অবৈধ প্রবেশের অভিযোগ এনে সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। প্রথমে গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রথমে হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরে শিলং জেলে পাঠানো হয়।
পরে শিলং শহর ছেড়ে না যাওয়ার শর্তে আদালত থেকে জামিন পান তিনি। পরে এই মামলায় ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর সালাহউদ্দিন আহমেদকে বেকসুর খালাস দেন শিলং আদালতের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ডিজি খার সিং রায়।
দেশে ফিরতে বাধা কোথায়?
খালাস দিয়ে রায় দেয়ার সময় সালাউদ্দিন আহমেদকে বিএসএফের মাধ্যমে বিজিবিকে কাছে হস্তান্তর করারও নির্দেশ দেয় আদালত। রায় অনুযায়ী তিনি দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিলেও পরে তা আটকে যায়। কারণ তাকে নিম্ন আদালত থেকে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। আপীলে তাকে জেলা ও দায়রা জজ তাকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু আপিলের শুনানি না হওয়ার কারণেই দেশে ফেরার সুযোগ মিলছে না সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীর।
দলের নেতারা যা বলছেন
দেশে না থাকলেও দলের নেতাকর্মীদের ভুলেননি সালাহউদ্দিন। দেশে থাকা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরাও তাকে সার্বক্ষণিক মনে রাখছেন।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সব কর্মকাণ্ডে আমরা তার পরামর্শ নেয়ার চেষ্টা করি। তিনিও আমাদের খোঁজ রাখেন। নেতাকর্মীরা চায় তিনি যেন দ্রুত দেশে আসার সুযোগ পান।’
আর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকে শামীম আরা স্বপ্না বলেন, ‘সালাউদ্দিন ভাই দূরে থাকলেও আমাদের সঙ্গেই আছেন। ‘আমরা অপেক্ষা করছি কখন তিনি দেশে আসবেন।’ সূত্র-ঢাকাটাইমস