উঁচু-নিচু ছোট-বড় পাহাড়ের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা। দুপাশে সবুজের সমারোহ। রাস্তার পূর্ব পাশে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে বিভক্তকারী নাফ নদী। নদীতে সারি-সারি নৌকায় পাল তুলে জেলেরা মাছ ধরছে। হিমেল বাতাসে উড়ছে নৌকার পাল। প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে যেতে হবে দেশের সর্বদক্ষিণ সীমান্ত শহর টেকনাফে।
পাহাড়, নদী আর সমুদ্রের অনন্য এক মিলনস্থল বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের ভূমি টেকনাফ। কক্সবাজার থেকে সড়কপথে এ জায়গাটির দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। নাফ নদী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে এখানেই পৃথক করেছে। পাহাড়ের উপর থেকে নাফ নদীর অপরূপ সৌন্দর্য বিরল দৃশ্য। টেকনাফের সমুদ্র সৈকতটিও খুবই সুন্দর। বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন সৈকত বলা যায় এটিকে। এছাড়া এখানকার ঐতিহাসিক মাথিনের কূপ, শাহ পরীর দ্বীপ, কুদুম গুহা, টেকনাফ নেচার পার্ক উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান।
কুদুম গুহা :
সুদীর্ঘ এই বাদুড় গুহায় অজগর সহ অন্যান্য সাপের ভয় ছিল, গেম রিজার্ভে বুনো হাতি দেখার ইচ্ছাও ছিল, পুলিশ এসকর্ট নিয়ে না যাওয়ায় ডাকাতের কবলে পড়বার আশংকা ছিল, কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টির কারণে এক পাহাড়ী জোক ছাড়া বাকী সব ঝুঁকিই সম্ভবত ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছিল।
কেউ বলে কুদুম, আবার কেউ বলে কুদুং। ভিতরে বাঁদুড়ের ওড়াউড়ি, ননস্টপ কিচকিচানি আর বোটকা গন্ধ। আর বাদুড়-চামচিকা যেখানে থাকবে, সেখানে সাপ বিশেষত অজগর অবশ্যম্ভাবী। গুহায় পানি অ্যাভারেজে কোমর সমান, তবে এই সিজনে গলাপানি পর্যন্ত আমরা গিয়েছি, আরও ডিপ হতেও পারে। এবং সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, পানি অসম্ভব স্বচ্ছ এবং ন্যাচারেলি খুব ঠান্ডা। হাটুপানিতেই ছোট ছোট মাছের খেলা দেখেছি। যদি গ্রুপে আসেন, তাহলে সবার আগে নামবেন কারণ এরপর পানিতে হাটাহাটির সময় কাদায় সব ঘোলা হয়ে যায়।
গেম রিজার্ভ :
টেকনাফ গেম রিজার্ভ বাংলাদেশের একমাত্র গেম রিজার্ভ বন। এটি ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কটি স্থানে বন্যহাতির দেখা মেলে তার মধ্যে এটি অন্যতম। বন্য এশীয় হাতির অভয়ারণ্য হিসেবে ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় গেম রিজার্ভ। এখানে উঁচু পাহাড় আর বঙ্গোপসাগরের মধ্যে রয়েছে বিশাল গর্জন বন। এছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে শোভিত হচ্ছে তৈঙ্গাচূড়া। কক্সবাজার শহর থেকে ৮৮ কিলোমিটার দক্ষিণে টেকনাফের দমদমিয়া এলাকায় মুছনী গ্রামে অবস্থিত গেম রিজার্ভ। নানা ধরনের বন্য পশুপাখি, গাছপালা, ফল-ফুলসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখানে উপভোগ করতে পারবেন।
তৈঙ্গাচূড়া :
গেম রিজার্ভের অন্যতম আকর্ষণ হল তৈঙ্গাচূড়া। এ চূড়া অত্যন্ত খাড়া প্রকৃতির। এটি এক হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। এখান থেকে বঙ্গোপসাগর, নাফ নদী, মিয়ানমার সীমানার পাহাড় শ্রেণী এবং গেম রিজার্ভের চিত্র উপভোগ করা যাবে।
কুদুমগুহা :
গেম রিজার্ভের অভ্যন্তরে রইক্ষ্যং এলাকায় কুদুমগুহার অবস্থান। এটি বাংলাদেশের একমাত্র বালু-মাটির গুহা। কুদুমগুহায় প্রচুর বাদুড় বাস করে। তাই এটিকে বাদুড় গুহা বলেও অভিহিত করা হয়। কুদুমগুহায় দুই প্রজাতির বাদুড় ছাড়াও ৪ প্রজাতির শামুক, তিন প্রজাতির মাকড়সাসহ বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র প্রাণীদের বসবাস রয়েছে। দুর্গম পাহাড় অতিক্রম করে এই গুহায় যেতে হয়।
রোমাঞ্চকর এ ভ্রমণে পথ পাড়ি দিলে অবশ্যই বনপ্রহরী সঙ্গে নিতে হবে।
চাকমা গ্রাম :
কুদুমগুহার পাশেই একটি গ্রামে চাকমা সমপ্রদায়ের বসবাস। উপজাতিদের জীবনবৈচিত্র্য নিজ চোখে দেখতে যেতে পারেন গ্রামটিতে। তবে এ জন্য অবশ্যই আপনাকে কোনও গাইড কিংবা কোনও চাকমা উপজাতির সহায়তা নিতে হবে।
নেচার পার্ক :
নেচার পার্কের অবস্থান টেকনাফ শহর থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার উত্তরে। এই পার্কটিতে কয়েক হাজার শতবর্ষী গর্জনগাছ রয়েছে। বিশাল এই বনের ভেতর হাঁটার জন্য রয়েছে তিনটি রাস্তা। এসব রাস্তায় পর্যটকদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য মোড়ে-মোড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিশ্রামাগার।
এখানে টাওয়ারে বসে হাতি, হরিণ, বানরসহ বিভিন্ন পশুপাখির ডাক শুনতে পারবে। পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি করা চৌকিতে বসে পুরো বনের চিত্র, নাফ নদী ও মিয়ানমারের আরাকান সীমান্তের দৃশ্য মনভরে উপভোগ করা যাবে।
টেকনাফ সমুদ্র সৈকত:
টেকনাফ শহর ছাড়িয়ে দক্ষিণে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে এ সমুদ্র সৈকত। খুবই পরিচ্ছন্ন এ সৈকতে পর্যটকের আনাগোনা সবময়ই কম থাকে। তবে জেলেদের আনাগোনা এ সৈকতে বেশি। বিশেষ করে খুব সকাল কিংবা সন্ধ্যায় জেলেদের বেশি মাছ ধরতে দেখা যায় এ সৈকতে। দীর্ঘ এ সৈকতে বেড়াতে ভালো লাগবে সবার। টেকনাফ শহর থেকে জিপে চড়ে যাওয়া যায় টেকনাফ সৈকতে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের তুলনায় টেকনাফ সমুদ্র সৈকতের পানি অধিক পরিষ্কার
নে-টং বা দেবতার পাহাড়:
সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে জাহাজ থেকে দেখা যায় বীর দর্পে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে নেটং পাহাড়। েএই পাহাড়ের উপর থেকে দূর থেকে দেখা মিয়ানমার আর বে অব বেঙ্গল এক অন্যরুপে ধরা দেবে চোখে।
মাথিনের কূপ:
টেকনাফ উপজেলায় ভ্রমণ করতে গেলে পর্যটকগণ মাথিনের কূপ দর্শন করতে কখনই ভুল করেন না। মাথিনের কুপ টেকনাফ থানার সম্মুখে অবস্থিত।বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে কলকাতার ধীরাজ ভট্টাচা র্য নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা টেকনাফ থানায় বদলী হয়ে আসেন।এ সময় সেকানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের এক রাজার কন্যা থানায় অবস্থিত পাত কুয়া থেকে পানি আনতে যেত। থানার নবাগত সুদর্শন তরুণ কর্মকর্তা ধীরাজ থানায় বসে বসে মাথিনের পানি আনা-নেয়া দেখতেন। এভাবে ধীরাজের সঙ্গে মাথিনের দৃষ্টি বিনিময় এবং পরে তা প্রেমে পরিণত হয়। চৌদ্দ বছর বয়সী মাথিন ও ধীরাজের নিখাদ প্রেমের ঐতিহাসিক নিদর্শন এ মাথিনের কূপ। গোত্র আভিজাত্যের প্রতিবন্ধকতায় ধীরাজ-মাথিনের বিয়ে হয়নি। সমধুর প্রেমের করুণ বিচ্ছেদে মাথিন তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করেন। এতে শাশ্বত অকৃত্রিম প্রেমের এক ইতিহাস বিরচিত হয়। মাথিনের অতৃপ্ত প্রেমের আমোঘ সাক্ষী এই মাথিনের কূপ দর্শনে এলে আরো অনেক অজানা কাহিনী জানা যায়।
বার্মিজ মার্কেট:
এ মার্কেটে প্রতিদিন শত শত পর্যটক কেনাকাটা করে থাকেন। এখানে বার্মিজ পন্যের সাথে থাই পন্যও কম দামে পাওয়া যায়।
শাহপরীর দ্বীপ:
টেকনাফ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপ। এটি মূলত সাবরাং ইউনিয়নের একটি গ্রাম। একসময় এটি দ্বীপ থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছুকাল আগে এটি মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। টেকনাফ উপজেলা শহর থেকে শাহপরীর দ্বীপের দূরত্ব প্রায় পনের কিলোমিটার। জনশ্রুতি আছে শাহসুজার স্ত্রী পরীবানুর ‘পরী’ ও শাহসুজার ‘শাহ’ মিলে এ দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে। আবার অন্য একটি মতে শাহ ফরিদ আউলিয়ার নামেই এ দ্বীপের নামকরণ। শাহপরীর দ্বীপের নামকরণের এরকম আরো অনেক ইতিহাস প্রচলিত আছে স্থানীয়দের কাছে। টেকনাফ শহর থেকে জীপে চড়ে যেতে হয় জায়গাটিতে।
শাপলাপুর সৈকত:
টেকনাফ শহর ছেড়ে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে প্রায় বিশ কিলোমিটার গেলে শিলখালী গর্জন বন। সুউচ্চ গর্জন গাছের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া মেরিন ড্রাইভ সকটির ধরে আরো প্রায় দশ কিলোমিটার গেলে নির্জন একটি সমুদ্র সৈকত। এটি শাপলাপুর সমুদ্র সৈকত। এ সৈকতের তীর ঘেঁষে রয়েছে ছোট ছোট আর মাঝারি আকৃতির ঝাউগাছের জঙ্গল। খুব সকাল কিংবা বিকালে এ সৈকতে ঝাঁকে ঝাঁকে নামে লাল কাঁকড়াদের দল। তাছাড়া দীর্ঘ এ সৈকত বেশিরভাগ সময়ই থাকে প্রায় জনমানবহীন। ভ্রমণে যারা নির্জনতাকে পছন্দ করেন তাদের জন্য শাপলাপুর সৈকত আদর্শ জায়গা। টেকনাফ শহর থেকে শাপলাপুর বাজারগামী বাস কিংবা জিপে চড়ে আসা যায় যায়গাটিতে। তবে শাপলাপুর সৈকতটি বাজারের আগেই। তাই পথেই নেমে যেতে হবে।
সাবরাং:
সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক নামে সরকার একটি বিশেষ পর্যটন জোন স্থাপন করেছে। আগামী দিনে এটি অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফ যায় সেন্টমার্টিন সার্ভিসের হিনো এসি বাস। ভাড়া ১১৫০ টাকা। এছাড়াও ঢাকা থেকে শ্যামলি, এস আলম, সৌদিয়া, হানিফ ইত্যাদি পরিবহনের নন এসি বাস যায় টেকনাফ। ভাড়া ৬৫০-৮০০ টাকা। ঢাকা থেকে যেকোনো বাসে কক্সবাজার এসে সেখান থেকেও সহজেই আসা যায় টেকনাফ। কক্সবাজার শহর থেকে লোকাল মাইক্রোবাসসহ বেশকিছু বাস যায় টেকনাফ। ভাড়া ১২০-২৫০ টাকা। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের বাস ছাড়ে আন্ত:জেলা বাস টার্মিনাল থেকে আর মাইক্রোবাসগুলো ছাড়ে শহরের কলাতলী এবং টেকনাফ বাইপাস মোড় থেকে।
কোথায় থাকবেন:
টেকনাফে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল নে টং ( ফোন :০৩৪২৬-৭৫১০৪, এসি দ্বৈত কক্ষ ১৯০০ টাকা, এসি স্যুইট ৩১০০ টাকা এবং সাধারণ দ্বৈত কক্ষ ১৩০০ টাকা)। পর্যটনের এ মোটেলটি টেকনাফ শহরের বাইরে। টেকনাফ শহরেও কিছু সাধারণ মানের হোটেল আছে। এসব হোটেলে ৩০০-১৫০০ টাকায় কক্ষ পাওয়া যাবে।
যারা যেতে চানঃ
টেকনাফ থেকে ৩৫ কিঃমিঃ, কক্সবাজার থেকে প্রায় ৫০ কিঃমিঃ এসে নামতে হবে হোয়াইকং বাজারে। এইখানে বনবিভাগের একটা বিট অফিস আছে, এরপর হোয়াইকং হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে অবশ্যই পুলিশ এসকর্ট নিতে হবে। যদ্দূর শুনেছি তারা ট্যুরিস্টদের ব্যাপারে যথেষ্ট হেল্পফুল। রাস্তাটা নাকি বেশই খারাপ, দিনে দুপুরে ডাকাতি হয়।
হোয়াইকং-শাপলাপুর রোডে মিনিট পনেরো গেলেই একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নামতে হয়। এরপর গেম রিজার্ভের মধ্য দিয়ে ট্রেইল, পৌছে যাবেন দেশের একমাত্র (জানামতে) মাটি-বালুর প্রাকৃতিক গুহা।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক