এইচ.এম নজরুল ইসলাম:
“ওরা আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলেছে হিরোশিমায়। আমার মাকে খুন করেছে জেরুজালেমের রাস্তায়। আমার বোনটা এক সাদা কুত্তার বাড়িতে বাঁদি ছিলো। তার প্রভু তাকে ধর্ষণ করে মেরেছে আফ্রিকাতে।আমার বাবাকে হত্যা করে মেরেছে ভিয়েতনামে।আর আমার ভাই, তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরেছে ওরা। কারণ সে মানুষকে ভীষণ ভালোবাসতো।”
জহির রায়হানের সেই বিখ্যাত উক্তিটি দিয়েই লেখাটি শুরু করতে হল।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে অনেক উদ্ভাবন, অনেক উন্নতি এবং অনেক ভালো কাজের পাশাপাশি সভ্যতাকে ধ্বংস করার মত যে সকল কর্মকান্ড ঘটেছে তার মধ্যে গণহত্যা একটি বিশাল জায়গা করে নিয়েছে।
মানুষ হয়ে মানুষকে নির্মম ভাবে হত্যা এবং ধর্ষণ এর মত কান্ড ঘটিয়েছে কিছু মানুষরূপী দানব। এই হত্যাকান্ড যতটা না, কোনো যৌক্তিক কারণে তার চেয়ে বেশী ক্ষমতা দখল এবং লোভের কারণে।
এইসব গণহত্যা শুধু যে রাজনৈতিক কারণে সংগঠিত হয়েছে তা নয়, বরং ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, ক্ষমতার বহি:প্রকাশ এবং মানসিক বিকৃতিও এর অন্যতম কারণ। লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, এই মানসিক ভাবে বিকৃত মানুষগুলো অন্য দেশেরই নয় নিজের দেশের, নিজের সম্প্রদায়ের লোকগুলোকেও হত্যা করেছে নির্মম ভাবে। কখনো জাতীয়তার, কখনো সম্প্রদায়ের অথবা কখনো ধর্মের দোহায় দিয়ে সংগঠিত হয়েছে একটার পর একটা হত্যাকান্ড।
‘গণহত্যা’ বলতে আসলে কী?
গণহত্যার ইংরেজি প্রতিশব্দ জেনোসাইড। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, গণহত্যা বা জেনোসাইড হচ্ছে এমন কর্মকাণ্ড যার মাধ্যমে একটি জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালানো হয়।
তাছাড়া কোনো নির্দিষ্ট স্থানে একসঙ্গে বা অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হত্যা করাকেও গণহত্যা বলা হয়।
সে হিসেবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অসহায় নিরপরাধ বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা শুরু করে। এ হত্যাযজ্ঞটি পাকিস্তানিদের পূর্ব পরিকল্পিত ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ দমন ও স্বাধীনতাকামীদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলা।
কিন্তু স্বাধীনতার ৪৯ বছরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গণহত্যার হিসাবে স্বীকৃতি মিলেনি!
অথচ ৭১ এর ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্বরণ করিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছিল যা এখনো দাবি করে বাংলাদেশ।
২৫ মার্চ শুরু হয় গণহত্যা। চলে দীর্ঘ নয় মাস। দীর্ঘ হতে থাকে নিরীহ বাঙালির লাশের মিছিল। শহীদ হন ৩০ লাখ মানুষ। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বাংলাদেশের এ হত্যাযজ্ঞকে বিশ শতকের সবচেয়ে ভয়ংকর পাঁচটি হত্যাযজ্ঞের মধ্যে অন্যতম উল্লেখ করা হয়।
তারপরও স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও কেন এখনও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি বাংলাদেশের ২৫শে মার্চের গণহত্যা? এমন একটি প্রশ্ন বার বার সামনে চলে আসে বাঙালির কাছে!
গণহত্যা নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রকাশনার তথ্যমতে, ইতিহাসের দশটি জঘন্য গণহত্যা কান্ডের ঘটনা ঘটে তার মধ্যে (১৯১৫-১৯২৩) আর্মেনীয় গণহত্যা, যে যুদ্ধে চলাকালীন এবং তৎপরবর্তী সময়ে তুরস্ক শুধু ১.৮ মিলিয়নের অধিক আর্মেনীয় এবং তুর্কীদের সরাসরি হত্যা এবং বিতাড়িতই করেনি, এছাড়াও হাজার হাজার আর্মেনীয় এবং অ-তুর্কিকে খাদ্যাভাবে মৃত্য বরণ করতে বাধ্য করেছিল।
এছাড়া বিশ্বে বিভিন্ন সময়ে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছি তার মধ্যে অন্যতম যে দেশ গুলো ইতিহাসে স্বাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে তা হল, সোভিয়েত রাশিয়ার স্ট্যালিন যুগ (১৯২৯-১৯৫৩): ভারত ভাগ (১৯৪৭) চীনের গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব (১৯৪৯-১৯৭৬) দ্য হলোকস্ট (১৯৩৯-১৯৪৫) হিরোশিমা ও নাগাসাকি গণহত্যা(১৯৪৫) বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গণহত্যা (মার্চ-ডিসেম্বর ১৯৭১) কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডস (১৯৭৫-১৯৭৮)সার্ব কর্তৃক বসনিয়ান গণহত্যা (১৯৯২-১৯৯৫) রূয়ান্ডা গণহত্যা (১৯৯৪)
এত গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পরও মানুষের ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত না হওয়ায় সভ্যতার এই যুগেও বিশ্বের বহু দেশের বিরুদ্ধে এখনো উঠছে গণহত্যার অভিযোগ!
বিগত কয়েক বছর ধরে উঠছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ মূখী লাখো লাখো শরণার্থী।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গা (মুসলিম) যদিও ওরা নিজেদের মিয়ানমারের নাগরিক দাবী করে আসছে শুরু থেকে। তারপরও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
এটিকে নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা দায়ের করে আফ্রিকার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গাম্বিয়া।
বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্র থেকে যতটুকু যেনেছি, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ সূত্র ‘রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক বাসিন্দারা সংগঠিত হামলা চালিয়েছে এবং এখনো চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের। আইসিজেতে মামলায় গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরতে যে ইস্যু গুলো সামনে আনা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে,বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, মায়ের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ছুঁড়ে মারছে, পুরুষদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে, মেয়েদের ধর্ষণ করছে এবং সবরকমের যৌন নির্যাতন করছে।’’
একে ১৯৯৪ সালে রোয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেছে গাম্বিয়া। তবে গাম্বিয়া আর রোহিঙ্গাদের তথ্য আর অভিযোগ শুনে একজন যুদ্ধ বিজয়ী বাঙালি হিসেবে বলতে হয়, ১৯৭১ সালে আমরাও পাকিস্তানীদের হাতে গণহত্যার শিকার হয়েছিলাম।
যা রোহিঙ্গা নিধনে সেই একই রকম গণহত্যার সব বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। রোহিঙ্গা নামক একটি জাতিগোষ্ঠীকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য এটা মিয়ানমারের সরকারের একটা চেষ্টা।
যদিও বর্তমান আধুনিক সভ্য সমাজে কোন জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস কিংবা হত্যার মতো ঘটনার পিছনে শাসক শ্র্রেণীর অজুহাত থাকে “চরমপন্থা দমন”
ঠিক একই অভিযোগ তুলছে মিয়ানমারের শাসক শ্রেণী,তারা বার বার প্রমান করতে চাইছে রাখাইন রাজ্যে চরমপন্থীদের হুমকি মোকাবিলা করছে গণহত্যা নয়!
আইসিজে মামলার শুনানিতে এই গণহত্যাকে ‘অভ্যন্তরিন সশস্ত্র সংঘাত’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেন সেনা সমর্থিত মিয়ানমার সরকার।
জাতিসংঘের বিশেষ তথ্য অনুসন্ধানী কমিটির প্রধান মারযুকি দারুসমানের নিরাপত্তা পরিষদে দেয়া এক রিপোর্টে বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে এখনও গণহত্যা চলছে। এখনও যে প্রায় চার লক্ষ রোহিঙ্গা রাখাইনে রয়ে গেছেন তারা নানা ধরনের অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।
মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যুকে অভ্যন্তরীণ ব্যাপার কিংবা চরমপন্থা দমন হিসেবে বুঝানোর চেষ্টা করলেও,তার অপরটি হচ্ছে, একটি জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে আরাকানে তাদের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে টিকিয়ে রাখা।
বিশ্বের বুকে যতটা যুদ্ধ আর গণহত্যার মতো ঘটনা হয়েছে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তার সবটির পিছনে রয়েছে বিশ্ব মুড়লদের অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক স্বার্থ!
অথচ এখনো ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর চরমপন্থা দমনের নামে অসহায়ের মত ছুটে বেড়ায় আমরা,প্রতি মুহুর্তে বিশ্ব লুটেরা শাসকরা একটি প্রজন্মকে যুদ্ধ আর বারুদের গন্ধে বড় করে তুলছে! কারো না কারো রক্তের উপর বেড়ে উঠা প্রজন্মও স্বপ্ন দেকে বিশ্বের বুকে একদিন রক্তঝড়া বন্ধ হবে। শান্ত হয়ে যাবে ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, আরাকান, কাশ্মির, বসনিয়া চেচনিয়া , আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায়।
কিন্তু এখনো প্রতিনিয়ত লাখো জনতা মরার পর একতাবদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারছে না সাম্রাজ্যবাদের উত্তরসূরীরা। কিন্তু সময় অনেকটা চলে যাচ্ছে….
পরিশেষে বলতে ইচ্ছে করে
দুনিয়ার সব ফুল বাগিচায় লালচে গোলাপ ফুটুক
দুনিয়ার সব ভোখা শিশু লেনিন হয়ে উঠুক…
লেখক- সভাপতি, রিপোর্টার্স ইউনিটি কক্সবাজার এবং কার্যনির্বাহী সদস্য সাউথ এশিয়া ইয়ুথ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি।