কক্সবাজারের নাজিরারটেক উপকূলে নৌযানডুবিতে নিখোঁজ নিউজিল্যান্ডের কিশোর আলবার্টের (১৬) মরদেহ উদ্ধারের পর তার পরিবারের বাংলাদেশে অবস্থানের নানা তথ্য সামনে এসেছে।
জানা গেছে, পরিবারের চার সদস্যের কারও ভিসার মেয়াদ বর্তমানে নেই। এমনকি ১৩ বছর বয়সী রালফের ভিসাসংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার।
তিনি বলেন, “গত ৮ এপ্রিল মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপ উপকূলে জলদস্যুদের হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে পরিবারটি কোস্টগার্ডের হেফাজতে ছিল”।
তাহমিনা আক্তার বলেন, “এদের কারও কারও ভিসা থাকলেও মেয়াদ নেই। আবার ছোট শিশু রালফের (১৩) ভিসার কোনো কাগজপত্রও পাওয়া যায়নি”।
ইউএনও জানান, মঙ্গলবার নৌযানডুবির পরপরই ঢাকায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ড দূতাবাসকে বিষয়টি জানানো হয়। বুধবার বিকেলে দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। আলবার্টের মরদেহের আইনগত প্রক্রিয়া শেষে জীবিত তিনজনকে দূতাবাসের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার সকালে বাঁকখালী নদীর মোহনা-সংলগ্ন নাজিরারটেক এলাকায় সাগরে নৌযানডুবির ঘটনায় আলবার্ট নিখোঁজ হয়। প্রায় সাড়ে ৩২ ঘণ্টা পর বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুববাজার-সংলগ্ন উপকূলে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। পরে পুলিশ ও লাইফগার্ড কর্মীরা মরদেহটি উদ্ধার করেন।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, মরদেহটি উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছে।
নৌযানডুবির সময় স্থানীয় জেলেরা আলবার্টের বাবা জন এডওয়ার্ড (৭৪), মা বেলা (৩৬) ও ভাই রালফকে (১৩) জীবিত উদ্ধার করেন। পরে তাদের কোস্টগার্ড কক্সবাজার স্টেশনে হস্তান্তর করা হয়। তারা সবাই নিউজিল্যান্ডের নাগরিক।
পরিবারটির বাংলাদেশে অবস্থান নিয়ে জানা গেছে, তারা প্রায় আড়াই বছর ধরে কক্সবাজারের উপকূলের আশপাশে নিজেদের নৌযানে অবস্থান করছিলেন। তাদের ব্যবহৃত জোড়া বোটটির নাম ‘আইল্যান্ড গার্ল’। নৌযানটি কক্সবাজার শহরের এসএম পাড়া উপকূলে তৈরি করা হয়েছিল।
স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল জানান, আধুনিক নকশার বোটটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল। ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্র ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি বোটটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লাগে এবং এতে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রুবেল বলেন, “বোটটি দীর্ঘদিন বাঁকখালী নদীতে নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করে রাখা হতো। পরিবারটি বিভিন্ন সময়ে বোট নিয়ে সমুদ্রে গেলেও আবার কক্সবাজার উপকূলে ফিরে আসত।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আলী জানান, জীবিত উদ্ধার হওয়া তিন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক বর্তমানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
এর আগে গত ৮ এপ্রিল রাতে মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে পরিবারটি জলদস্যুদের হামলার শিকার হয়েছিল। পরদিন কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, জন এডওয়ার্ড তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব কাঠের বোটে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল তাদের।
কোস্টগার্ড জানিয়েছিল, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবারটিকে সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। গত ১ মার্চ তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেওয়া হয়। ওই সময় পাসপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি শেষ হয়ে গেছে।
তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা সোনাদিয়া চরে বোটসহ অবস্থান করছিলেন। পরে দুর্বৃত্তদের হামলার খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের একাধিক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারটির সদস্যদের উদ্ধার করে।
নৌযানডুবির ঘটনায় জীবিত উদ্ধার হওয়া রালফ স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তারা ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি ও তার বাবা নৌকার ডেকে ছিলেন। তার মা ত্রিপলের ছাউনির নিচে ছোট ভাই আলবার্টকে লাইফ জ্যাকেট পরাচ্ছিলেন।
রালফের ভাষ্য, হঠাৎ নৌকাটি ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। তার ধারণা, আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপটি ঠিকভাবে আটকানো ছিল না। আলবার্ট সাঁতারও জানত না।
তিনি জানান, প্রায় আড়াই বছর ধরে তারা ওই নৌযানেই কক্সবাজারের আশপাশের নদী ও সমুদ্রপথে অবস্থান করছিলেন। মঙ্গলবার সমুদ্রে যাওয়ার পর বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মুখে পড়ে নৌযানটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।