তানভিরুল মিরাজ রিপন:
অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে গ্রহণ করতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রস্তুত ? বাংলাদেশ ডিজিটাল হয়েছে তার বিশাল অর্থ বহন করে প্রায় সর্বস্তরে ইন্টারনেট সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ শুধুই ইন্টারনেট সুবিধা নয় সরকারি বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সহজ পরিচিতির, একদৃষ্টিতেই সমস্ত কিছু জেনে যাওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সেবাও এখন অনলাইনে। জনগনের দোরগোড়ায় সরকার বিভিন্ন সেবা পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন পরিষদেও চালু করেছে সব ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা।
ই-কমার্সে বাংলাদেশ এগিয়েছে আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানির নেটওয়ার্ক ২জি থেকে ৩জি পর্যায়ক্রমে ৪জি থেকে ৫জি উন্নীত করবার সকল কার্যক্রম চলছে৷ তবে কোনো অপারেটর আদৌ যথোপযুক্ত সেবা নিশ্চিত করছে? অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষে হয়রানি সকল বাজনার খাজনা নিশ্চিত করেছে কিন্তু একটু মফস্বলে গেলে’ই নেটওয়ার্কের অবস্থা শোচনীয়।
কভিড-১৯ কালে সকল শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। শারীরিক ক্লাসরুম থেকে এখন পুরো বিশ্ব সরে এসেছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের দিকে৷ যেহেতু বাংলাদেশ সরকারের বলছে বাংলাদেশ ডিজিটালাইজড হয়েছে সকল ক্ষেত্রে।
কিন্তু বাংলাদেশ সত্যিকার্থে সকল ধরনের শিক্ষা কার্যক্রমে পিছিয়ে। তার উদাহরণ বাংলাদেশের পাবলিক, সরকারি , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থান ও সিদ্ধান্তগুলোর দিকে তাকালে বুঝতে পারা যাবে বাংলাদেশের শিক্ষার কতটা ভবিষ্যত।
শিক্ষা মূলত মৌলিক সেবা, পণ্য নয়। শিক্ষা প্রদান করতে সরকার বাধ্য। অথচ বাংলাদেশ সরকার অবৈতনিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়ে সরকারি প্রাইমারি স্কুল চালু করলেও পাশাপাশি অনুমোদন দিচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলের। সরকার শিক্ষা খাতের সকল প্রতিষ্ঠান অলাভজনক হিসেবে দেখার ফলে সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ইস্যু দেখিয়ে টাকা আদায় করছে মোটা দাগে।
যাক সে কথা প্রসঙ্গে ফিরি, ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানের নামে শুধু হাতে গুনা কিছু শিক্ষককে আইসিটি বিষয়টির জন্য সাময়িক প্রশিক্ষণ দিলেও দেশের সকল শিক্ষককে আসলেই ডিজিটালাইজড করা হয়নি। তার ফলে বাংলাদেশের শিক্ষকেরা এখনও পিছিয়ে আছে। পিছিয়ে আছে বললে ভুল হবে পিছিয়ে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে ১৮ মার্চ থেকে সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। দেশের শিক্ষা কার্যক্রম ডিজিটাল না হওয়ার ফলে একে একে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা , এইচএসসি পরীক্ষা হবে কি হবে না তা নিয়ে সরকার এখনো নীতিগত সিদ্ধান্তে যেতে পারেনি।
সরকার আসলে কোথায় উন্নত করেছে আইসিটি খাত? আইসিটির সর্বোচ্চতম সেবা যদি শিক্ষাখাত ভোগ করতে না পারে, তাহলে আইসিটির প্রজন্ম তৈরী হবে? এপ্রিল-মে’র দিকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ( বেসরকারি ) চুপিচুপি ক্লাস শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভয়ে। এটি আসলে শিক্ষা কার্যক্রম নাকি টাকা উত্তোলন ফন্দি তা সকল অভিভাবকদের কাছে স্পষ্ট। মানে ও গুণের বালাই নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো গবেষণা পর্যন্ত অনলাইনের মাধ্যমে করিয়ে নিচ্ছে। সে কার্যক্রমের একটি নির্ভর যোগ্যতা আছে। তদারকি আছে৷ কাউন্সিলিং আছে৷ কিন্তু বাংলাদেশে সেসবের উপস্থিতি আছে? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্ট ফোন নেই, যাদের স্মার্ট ফোন আছে তাদের ভালো নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাও নেই।
তাত্ত্বিক বিষয়ের সাথে যে ব্যবহারিকের সম্পর্ক আছে সে বিষয়গুলো পড়ানো যাচ্ছে না। যার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরী হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার মান এখানেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়৷ বাংলাদেশের শিক্ষা কতখানি যুগোপযোগী তা এই সকল সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দেয়৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উপনিবেশিক কীটপতঙ্গরা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে দেখে। অথচ অক্সফোর্ড বহুদুর মানে-গুণে, জ্ঞান সৃষ্টি ও গবেষনায়, আর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক, কিংবা পাবলিক সকলে এমন নিয়ম করে রেখেছে জ্ঞান সৃষ্টি তো দুরে থাক, কথাও বলা মুশকিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনো অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারেনি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ৬ সেপ্টেম্বর শুরু করেছে শিক্ষা কার্যক্রম । দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। কারন শিক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধতা আছে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছে স্মার্ট ফোন নেই।
ইন্টারনেট প্যাকের উঁচু দাম। নেটওয়ার্কের বেহাল অবস্থা। সকল কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে উন্নত আজও হয়নি। এই না হওয়াটাই আমাদের শিক্ষা এই না হওয়াটা আমাদের আগামী দিন।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক।