বিশেষ প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক একাধিক বাহিনীর সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ রোহিঙ্গাসহ স্থানীয়রা। ৩৪টি ক্যাম্পে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে সন্ত্রাস। খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক পাচার ছাড়াও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মাত্রাবেড়েই চলছে। এতে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীর সংখ্যাই বেশী। এমতাবস্থায় উখিয়ার রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে পুলিশের সাথে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। এসময় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অত্যাধুনিক বিদেশী অস্ত্র, ৪৯১ রাউন্ড তাজাগুলি। গত বৃহস্পতিবার রাতে ১৮ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এম ব্লকে ৮ এপিবিএন এর টহলদল কে লক্ষ্য করে গুলি চালায় অজ্ঞাত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা, পরে আত্মরক্ষায় গুলি ছোড়েন এপিবিএন সদস্যরা।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কামরান হোসাইন। তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর ক্যাম্প এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে বাড়ানো হয়েছে তৎপরতা।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্যাম্পগুলো ঘিরে মাথা চড়া দিয়ে উঠেছে ১০-১৫টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ। দিনে দুপুরে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ধর্ষণ, মাদক সরবরাহ, মানবপাচার ও অস্ত্রের ঝনঝনাতিতে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছে তারা। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কেউ কেউ গ্রেপ্তার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও পাহাড়ের নির্জন এলাকায় আস্তানা গড়ে তোলায় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ অপরাধী। সর্বশেষ বি ব্লকের হেড মাঝি আজিম উদ্দিন কে হত্যার ঘটনায় আবারো আলোচনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সশস্ত্র গ্রুপগুলো।
পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন বলা হলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। শুধু সন্ত্রাসী গ্রুপ নয়; দেশীয় জঙ্গিবাদীদের বিচরণেও উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র দাবি করছে, দেশের অভ্যন্তরীণ শীর্ষ জঙ্গি সংগঠনগুলোর অন্যতম টার্গেট এই রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সদস্য রিক্রুট করার জন্য শীর্ষ জঙ্গি নেতারা নিয়মিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বৈঠক করছেন। জঙ্গি নেতাদের ইন্ধন দিচ্ছেন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তার বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ থাকায় বিষয়টি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, পাহাড়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আদ্দু বাহিনী, গিয়াস বাহিনী ও সালমান শাহ বাহিনী। সালমান শাহ বাহিনীর সালমান শাহ কারাগারে থাকলেও সক্রিয় রয়েছে বাহিনীর কার্যক্রম। এ ছাড়া আছে জোকি বাহিনী, পুতিয়া বাহিনী, খালেক বাহিনী, জাকারিয়া গ্রুপ ও মুন্না গ্রুপ। জোকি বাহিনীর জোকি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও এই বাহিনীর হাল ধরে তার বড় ভাই দিল মোহাম্মাদ আর জামিল। শালবন পাহাড়কেন্দ্রিক নয়াপাড়া ক্যাম্পে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলে সবচেয়ে বেশি। সেখানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত করা হয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। স্বার্থে টান পড়লেই যে কাউকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় নির্জন পাহাড়ে। অর্ধ শতাধিক লোককে সেখানে গুলি করে হত্যাও করা হয়েছে। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে প্রতিহত করতে গিয়ে গেল বছর প্রায়ই ঘটছে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও। এখন পর্যন্ত ৩০টির মতো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে বলেও র্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ১৮ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি।
প্রসঙ্গত, এক সপ্তাহ আগে ১৮ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ওই ক্যাম্পের বি ব্লকের হেড মাঝি আজিম উদ্দিন কে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এঘটনায় নিহত আজিম উদ্দিনের স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ৫ জন।