• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন

ধর্ষণ সমাচার: অগ্রগতি ও পিছুটান

নিজস্ব প্রতিদেক / ৬০৭ বার ভিউ
আপডেট সময় : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মো. নাজমুল হক:

আদীকাল থেকে মানুষের প্রগতির মূল জীবনীশক্তি ছিলো একটি সভ্য সমাজ গড়ে তোলা। যেখানে জীবন ও সম্পদের উপর কোনোরূপ হুমকি আসবে না। কিন্তু মানুষের সংঘাতপূর্ণ আচরণিক বৈশিষ্ট্য, মানুষের অন্তঃশ্রেণী আধিপত্য এবং ভোগ-বিলাসী জীবন ব্যবস্থা সামাজিক অশান্তি জিইয়ে রেখেছে এখন পর্যন্ত। যার শিকার হচ্ছে নারীরা। শৈশব থেকে সাম্য, নৈতিকতা এবং সহমর্মিতার শিক্ষা নিয়ে বড় হলেও বর্তমান সমাজে এর প্রত্যক্ষ প্রয়োগ খুব কম দেখা যায়।

একটি লম্বা ইতিহাস আমরা দেখতে পাই যা নারীদের উপর হওয়া শোষণের কথা বলে। নেতিবাচক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো তার ভোগবাদী এজেন্ডা ধরে রাখার জন্য ক্রমাগত নারীদেরকে দমিয়ে রাখছে। লজ্জাজনক হলেও সত্যি, ধর্ষণকে নারীদের দমিয়ে রাখার নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার করছে কিছু মানসিক বিকারগ্রস্ত পুরুষ। ধর্ষণ-মনোবিদদের মতে যারা ধর্ষক তারা মনোবিকারগ্রস্ত। নারীর উপর ক্ষমতা দেখানো, তাকে দখল করার মনোবৃত্তি এবং অবদমিত কাম চরিতার্থ করার প্রবণতার কারণে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে।

‘সমাজ ও রাষ্ট্র নারী সহায়ক নয়। বিচারকার্য পরিচালনার সময়টিতে ভিক্টিমকে নানাবিধ বৈরিতার সম্মুখিন হতে হয়। সহানুভূতি বা সহমর্মিতার বদলে সন্দেহ এবং ভ্রুকুটি প্রত্যক্ষ করতে হয়। আইনি জটিলতা, আইনি তদন্তে ত্রুটি এবং প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলা, দ্বিতীয় ধর্ষণের মতো নানারকম ধাপ পেরুতে হয় বিচার পাওয়ার জন্য।’

ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে একটি বৃহৎ সময় ধরে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, নারী সংগঠন এবং সমাজের সোচ্চার মানুষের উপরোল্লিখিত অভিযোগগুলো ছিলো। সবগুলো অভিযোগের সমাধান করা সময় সাপেক্ষ। তবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক জায়গায়ই পরিবর্তন এসেছে।

ধর্ষণ পরবর্তি মামলা করতে পূর্বে যে জটিলতাগুলো ছিলো তাদের নিষ্পত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৫ সালে করা এক রিট পিটিশনে (রিট পিটিশন নং-৫৫৪১) সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ১৮টি দিকনির্দেশনা দেন। যেখানে বলা হয় কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়াই ধর্ষণের এফআইআর নথিভুক্ত করতে হবে এবং যদি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এর ব্যঘাত ঘটান তবে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভিক্টিম এর মামসিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এবং যাতে ‘দ্বিতীয় ধর্ষণ’র মতো কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন না হতে হয় সে উদ্দেশ্যে প্রতিটি থানায় একজন মহিলা কর্মকর্তার উপস্থিতি (কার্যঘন্টায় সবসময় উপস্থিত থাকার শর্তে) নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং আরো বলা হয়েছে ভিক্টিম তার পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্মুখে প্রাথমিক জবানবন্দি দিবে। এফআইআর করার সময় অপ্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া থেকে বিরত থাকতেও হাইকোর্ট নির্দেশনা দেন।

যদি ভিক্টিম আইনি সহায়তা নিতে অসমর্থ হয় তবে তার সুবিধার্থে বিভিন্ন নারী সংগঠন যারা এসব বিষয়ে সাহায্য প্রদান করেন তাদের একটি তালিকা প্রতিটি থানায় সংযুক্ত করতে হবে এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবশ্য করণীয় হিসেবে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে অভিযোগের জানান দিবেন এমন নির্দেশনা দেন। পূর্বে আইনি জটিলতার জন্য ধর্ষণের পর মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য ৭২ ঘন্টার বেশি সময় নেওয়া হতো। এতে করে ধর্ষণের শারীরিক প্রমাণ বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতো এবং ফলশ্রুতিতে আসামীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে উঠেছিলো।

এই বিড়ম্বনা এড়াতে হাইকোর্ট এফআইআর দাখিলের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ফরেনসিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন এবং এই প্রক্রিয়া চলাকালীন ভিক্টিমের পছন্দ অনুযায়ী তার আইনজীবী বা অন্য কেউ এবং মহিলা কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপস্থিত থাকার যৌক্তিকতা সম্পর্কেও বলেন। মেডিক্যাল পরিক্ষার সময় ভিক্টিমের সাথে হওয়া অযাচিত আচরণ কমাতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রলম্বিত বিচারকাজকে তরান্বিত করতে প্রথম শুনানির পর ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেন হাইকোর্ট।

মনে হচ্ছে না এত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার পরও অপ্রত্যাশিতভাবে কেন বাংলাদেশে ধর্ষণ বেড়ে চলেছে? একই প্রশ্ন প্রত্যেকটা বিবেকবান মানুষকেই ভাবায়। প্রকৃতপক্ষে কোনো অপরাধের নির্মূল করতে গেলে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সর্বস্তরে প্রয়োগেরও প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনের সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগ দেখতে পাই না।

রাজনৈতিক প্রভাব নয়তো বিত্তের প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা, এসব কারণে ঝিমিয়ে পড়েছে ধর্ষণ মামলার নিষ্পত্তির গতি। পুলিশ সদরদপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে দেড় লক্ষাধিক ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতন বিষয়ক মামলা ঝুলে আছে। বছরে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ মামলা। সাজা পাচ্ছে হাজারে মাত্র চারজন আসামী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান এর মতে, ‘বিচারহীনতা এবং ভয়ের সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণ অনেকটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরোও বলেন, ‘বিচার না পাওয়ায় মামলা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন আক্রান্তরা।’

আইন প্রয়োগের দীনতার পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় ভিক্টিমকেই প্রমাণ করতে হয় সে ধর্ষিত হয়েছে এবং এ সাপেক্ষে সাক্ষী উপস্থিত করতে বলা হয়। এর ফলাফল হিসেবে ভিক্টিমকে ধর্ষণের বিবরণ ও প্রমাণ পুনঃপুনঃ বলতে হয় পুরো কোর্টের সামনে। যা কিনা তাকে পূর্ব অভিজ্ঞতার স্মরণ করতে বাধ্য করে এবং মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।

ভিক্টিমের অপরাধ প্রমাণ করার বাধ্যবাধকতার এই সংস্কৃতির পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং অভিযুক্তের সাথে স্থান পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ইতিমধ্যেই বিচার বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে এই আইন করা হয়েছে।

১৯৯৬ সালে চঁহলধন াং. এঁৎসববঃ ঝরহময মামলায় ভারতের সুপ্রিমকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে বলেন, ‘অর্থাৎ ধর্ষিতার বক্তব্যকে প্রমাণ করার জন্য অন্য সাক্ষী হাজিরার বাধ্যবাধকতা নেই। আদালতের মতে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নারী ধর্ষণের মিথ্যা ঘটনা বর্ণনা করে নিজেকে অসম্মানিত ও অপমানিত করতে আদালতে আসবে না। স্বভাবে লাজুকতার কারণে নারীরা সাধারণত যৌনতাবিষয়ক ঘটনা লুকাতে চায়। তার অভিযোগের ব্যাপারে প্রদত্ত বক্তব্য অবিশ্বাস করার কারণ না থাকলে সাক্ষী হাজিরার বাধ্যবাধকতা মানে ধর্ষণের মাধ্যমে সে যে আঘাত পেয়েছে, সে বিষয়ে পূণরায় অমর্যাদা করা।’

সামাজে বৃহৎ পরিসরে সোচ্চারমূলক প্রচারণা চালাতে হবে। ভিক্টিম ব্লেমিং এর মতো সামজিক চর্চা বন্ধের জন্য ভিক্টিমের পরিচয় গোপনে হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেটা সর্বোপরি পালন নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষিতাকে নয় ধর্ষককে ঘৃনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার ভেঙে দেওয়া এবং জনগণের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে মনোবিশারদের কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার নিমিত্তে সরকারকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

মানুষের নৈতিক বিবেকবোধ এর বিকাশে গুরুত্বারোপ করতে হবে। কথাসাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, ‘আমাদের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের বিবেক। বিবেককে চাপিয়ে যখন প্রবৃত্তি প্রভাব বিস্তার করে তখন ভোগবাদী সত্ত আধিপত্য বিস্তার করে। ধর্ষকরা শুধু নারী লোলুপ নয়। তাই যদি হতো তাহলে তারা শিশুদের ধর্ষণ করতো না।

প্রথমত তারা অবদমিত কাম চরিতার্থ করতে চায়; দ্বিতীয়ত, নারীর প্রতি প্রভুত্ব বা ক্ষমতা দেখাতে চায়; তৃতীয়ত, নারীকে ভোগের বস্তু মনে করে। নারী যে বোনের মমতা, মায়ের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় মেশানো একজন মানুষ সেটা এদের মন থেকে সরে গিয়ে শুধু ভোগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইউনির্ভাসিটি অফ প্রফেশনালস।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন