ফরিদ মোহাম্মদ:
স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে ছোট্ট সংসার ছিল আবছারের। সাগরে মাছ ধরে যা আয় হতো তা দিয়ে বেশ সুখেই কাটছিল অভাবে আবৃত্ত তার সংসার। কিন্তু হঠাৎ সুখের সংসারে নেমে আসে অনামিশার ঘোর অন্ধকার। গভীর সাগরে উত্তাল ঝড়ো হাওয়া সবকিছু নিমিশেই শেষ করে দেয়।
২০১৭ সালের আগস্টে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ো হাওয়ার কবলে পড়ে ১৮ জন জেলে নিয়ে একটি ট্রলার ডুবে যায়। ওই ট্রলারে আবছারও ছিলেন। এরমধ্যে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেলেও আবছারের লাশ কোথাও মিলেনি। সেই থেকে এখন অবধি স্বামীর অপেক্ষায় আছেন আবছারের স্ত্রী সোনা বিবি।
নুরুল আবছারের বাড়ি কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের কুলিয়াপাড়ায়। তিনি ওই এলাকার মরহুম রিদুয়ান মাঝির ছেলে।
২০১৭ সালের আগস্টে একটি ফিশিং ট্রলার নিয়ে আবছারের সাথে আরও ১৭ জন জেলে সাগরে রওনা দেন। ওই ট্রলারের মালিক চট্টগ্রামের হলেও তত্ত্বাবধান করেন টেকপাড়ার জসিম উদ্দিন। কিন্তু কূলে ফেরার আগে গভীর সাগরে প্রবল ঝড়ো হাওয়ার কবলে পড়েন তারা।
এক পর্যায়ে তাদের ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলার ডুবির এক সপ্তাহ পর একজন জেলে ভাসতে ভাসতে জীবিত অবস্থায় কূলে ফিরে এলেও বাকিদের কেউ প্রাণে বাঁচেনি। কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেলেও আবছারসহ প্রায় ৮ জনের লাশ পর্যন্ত মিলেনি।
এই দূর্ঘটনার প্রায় ৩ বছর হলেও এখনো স্বামীকে খুঁজে বেড়ান তার স্ত্রী সোনা বিবি। তার বিশ্বাস স্বামী একদিন ফিরে আসবেন।
খুরুশকুল কুলিয়াপাড়া বাজারের পূর্বপাশে একটি ঝুপড়ি বাড়িতে দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন সোনা বিবি। স্বামী বেঁচে থাকতে প্রায়ই মেরামত করতেন ওই বাড়িটি। কিন্তু স্বামী সাগরে নিখোঁজ হওয়ার পর ঘর মেরামত করার মত সামর্থ্য হয়নি সোনা বিবির। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কোনরকম মাথা গোঁজান।
গত ২০ আগস্ট সোনা বিবির বাড়িতে যান এ প্রতিবেদক। সোনা বিবির মুখে শুনেন তার কষ্টে গল্প। দুই সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে কুলসুমার বয়স এখন ৭ বছর। আর ছেলে তামিমের বয়স ৫ বছর।
সোনা বিবি বলেন, ‘কষ্টের সংসার হলেও আমরা বেশ সুখে ছিলাম। নিষ্টুর সাগর এভাবে স্বামীকে কেড়ে নেবে ভাবতেও পারিনি। আবছার নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছি।’
তিনি বলেন, আবছার মারা যাওয়ার পর মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। আয়ের সাথে খরচের হিসাব না মেলায় নিরূপায় হয়ে বড় মেয়েকে এতিম খানায় দিয়ে দিয়েছি। ছোট ছেলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। কিন্তু ড্রেস এবং অন্যান্য ভরণপোষণ বহন করা সম্ভব হয়না।
সোনা বিবি তার কষ্টের গল্প শোনানোর এক পর্যায়ে হু হু করে কেঁদে ফেলেন। বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর ছেলে-মেয়েকে ঈদে ঠিকমত নতুন কাপড়ও কিনে দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘মানুষের বাড়িতে যা রোজগার হয় তা দিয়ে কোন রকম খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকি। এত কষ্টে দিনাতিপাত করলেও নুন্যতম খোঁজ খবর নেয়নি বোট মালিক, সমিতি ও সরকারি-বেসরকারি কোন সংস্থা।’
নুরুল আবছারের বড় ভাই আব্বাস আলী জানান, ‘চট্টগ্রামের এক ব্যক্তির বোট নিয়ে সাগরে যায় তার ভাইসহ ১৮ জেলে। গভীর সাগরে পৌঁছালে ঝড়ের কবলে পড়ে বোটটি ডুবে যায়। এ সময় বোটে থাকা কয়েকজন জেলে ঢেকে ঘুমাচ্ছিল। বাকিরা বোটের উপরে ছিল। ঝড়ে ডুবে যাওয়ার সময় কেবিনে থাকা সবাই মারা যায়। বাকিদের মধ্যে একজন প্রাণে বাঁচলেও অধিকাংশই মারা যায়। আবছারের লাশ কোথাও পাওয়া যায়নি।’