• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৩:১০ পূর্বাহ্ন

জালের টান, ঢেউয়ের ধাক্কায় জীবিকা খুঁজে শিশুরা

নিজস্ব প্রতিদেক / ৪৪০ বার ভিউ
আপডেট সময় : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বিশেষ প্রতিনিধি:

উত্তাল সাগরে জালের টান আর ঢেউয়ের ধাক্কা খেতে খেতে দিন শেষে মাছে ভর্তি হয় কফিলের ঝুলি। সন্ধ্যা নাগাদ সেই মাছ বাজারে বিক্রি করে এক থেকে দেড় হাজার টাকা যা আয় তা দিয়েই চলে পুরো পরিবার।

কফিল সবেমাত্র ১২ বছরে পা দিয়েছে। কাঁধে উঠেছে পরিবারের বোঝা। এতটুকুন বয়সে কতইবা সইতে পারবে ঢেউয়ের ধাক্কা। তবুও জীবনের নির্মম নিয়তি তাকে প্রতিদিন পাঠশালার বিপরীতে নিয়ে যায় বঙ্গোসাগরে।

কফিলের বাড়ি টেকনাফ উপজেলার উপকূল এলাকা বাহারছড়ার শামলাপুর গ্রামে। সাগর আর রোহিঙ্গা বেষ্টিত এ গ্রামের অধিকাংশ শিশুর গল্প এমনই। সংসারের চাকা ঘুরাতে গিয়ে অবুঝ বয়সে আলোর জগত দেখার স্বপ্ন কখন যে ফেকাসে হয়ে যায় তারা বুঝতেই পারে না।

টেকনাফ উপকূলের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম গিলে খাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। উপকূলীয় জেলে পরিবারে ছেলে সন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়া যেন আজন্ম পাপ। ছেলে সন্তানের বয়স দশ পেরোনোর দিকে তাকিয়ে থাকে মা-বাবা। পেরোলেই মাছ কিংবা পোনা ধরার জাল কাঁধে সাগরের পথ দেখিয়ে দেয় খোদ নিজেরে মা-বাবা। সেই শিশুকাল থেকে মাছ ধরা। জীবনের সবটুকু শেষ করেও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় তাদের?

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম দারিদ্র্যের শেকলে বাঁধা উপকূলের জীবন। শতকরা ৯০ ভাগ পরিবার দারিদ্রতার খেয়ালে তাকিয়ে থাকে নতুন প্রজেন্মর প্রতি। নেই শিক্ষা-দীক্ষার চিন্তা, নেই ভবিষ্যতের ভাবনা। আছে শুধু একমুঠো ভাত ও অনাহারের কান্না।

উপকূলের জেলে জীবনের হিসেবটা এমনই। নানামুখী সংকটের ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত এ জীবনের হিসেব মেলানোটাই যেন কঠিন।

উপকূলের নতুন প্রজন্মের তথা শিশুদের এমন জীবন যুদ্ধের গল্প খুঁজেছে ভয়েসওয়ার্ল্ড। ভয়েসওয়ার্ল্ডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কফিলের মতো শত শত শৈশব-শিক্ষা বঞ্চিত শিশুর জীবনের গল্প।

শিশু জেলে কফিল শামলাপুর গ্রামের মো. আনিসের ছেলে। আনিসের চার সন্তানের মধ্যে কফিল ছাড়া তিনজনই মেয়ে। কফিল সবার বড়। কফিলের বাবাও সাগরে পোনা সংগ্রহ করে। কিন্তু বাবার আয় ধীরে ধীরে কমে এসেছে। সংসার যেন আর চলে না। তাই সংসার টেনে নিতে কফিলকেও জীবন বাজি রেখে সাগরে যেতে হয় প্রতিনিয়ত।

আগস্টের মাঝামাঝি কোন এক সকালে সাগরে যাওয়ার পথে কফিলের সাথে কথা হয় ভয়েসওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদকের। বই হাতে থাকার কথা জাল কেন; জিজ্ঞেস করতেই কফিল কোনভাবে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করলো।

আর যাই হোক কফিলের উত্তরে স্পষ্ট বুঝা গেল  ‘মা-বাবা জন্ম দিয়েছে, তারাই এর উত্তর দিতে পারবে, আমি পারবো না। তারা লালন-পালন করে বড় করছে, তারা যে পথ দেখাবে সেই পথে চলতে হবে আমাকে।’

তবে কফিলের স্কুলের যেতে মন চায়। বই-খাতা হাতে দৌঁড়তে চায় স্কুলের আঙিনায়। শৈশবের দূরন্তপনার মুহুর্তগুলো ছুঁতে চায় সে। আদৌ কি সম্ভব? এই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল কফিলের বাবা আনিসের কাছে। কিন্তু বাবা অকপটে দারিদ্রতার অজুহাত দেখিয়ে ছেলের সুন্দর প্রজন্মকে জালের ছিদ্র দিয়ে উড়িয়ে দেন।

উখিয়া উপজেলার উপকূলীয় ইমামের ডেইল এলাকার সাব্বির হোসেনের ছেলে জয়নাল আবেদীন (১৪) বলে, ‘আমাকে দেখিয়ে দাদনদার থেকে দাদন (মাছ ধরবে বলে অগ্রিম টাকা কিংবা সুবিধা) নিয়েছে বাবা। যার কারণে প্রতিদিন মাছ ধরতে সাগরে যেতে হয়। পড়ালেখা করলে; অসুস্থ হলে স্যারের কাছে আবেদন দিয়ে ছুটি নেয়া যায় শুনেছি। কিন্তু জেলে হলে অসুস্থায় কাতরালেও যতক্ষণ মরে যাইনি ততক্ষণ সাগরে মাছ ধরতে যেতে হবে দাদন নিয়েছি বলে।’

সে আরও বলে, ‘সাগরের ঢেউয়ের আতঙ্ক কাটিয়ে কিনারে ফিরতে না ফিরতেই পড়তে হয় দাদনদারদের রোষানলে। হিসাব বুঝিয়ে দিতে হয় কড়ায়-গ-ায়।  সেই অশান্তিতে বই-কলমের কথা ভুলে যাই।’

টেকনাফের বড়ডেইল এলাকায় বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরেন জামাল উদ্দিন। বয়স প্রায় ৪৫ অতিক্রম করেছে। কিশোর বয়স থেকে অন্যের নৌকায় মাছ ধরেন তিনি। তাঁর দুই কিশোর ছেলেও ঠিক বাবার মতোই জীবিকার অন্বেষণে অন্যের নৌকায় মাছ ধরে। তারা যা রোজগার করে তা পরিবারেই খরচ হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

ছেলেদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাথা নিচু করে বলেন, ‘গরীবের জন্য কিসের লেখাপড়া। আমার জমি-জমা নেই। পড়ালেখা করানোর মতো সামর্থ্যও নেই। তাই বাবার মতো জেলে হয়ে পরিবারের হাল ধরার জন্য তৈরী করছি দুই ভাইকে।’

উপকূলের প্রত্যেক পরিবারই জীবিকার তাগিদে তাকিয়ে থাকে পরবর্তী প্রজন্মের দিকে। শিশু বয়সে মাছ ধরতে গিয়ে অনেকে পঙ্গুত্ব নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। কেউবা সব হারিয়ে পথে বসেছে। এভাবে মা-বাবা সাগরে উৎসর্গে করে দেয় সন্তানের জীবন।

জেলেদের জীবনের ফেলে আসা সেই দিনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় অবশিষ্ট আর কিছুই নেই। না হয়েছে এক টুকরো সম্পদ, না পেরেছেন সন্তানদের লেখাপড়া করাতে। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে হিসাব মেলাতে পারে না। বাকি ক’টা দিন হয়তো এই কাজ করেই জীবনটা পার করে দেবেন। পরের প্রজন্ম মৎস্যজীবী হলেই যেন জেলে জীবনের পরম প্রশান্তি। জীবনকে সপে দেন নিয়তির হাতে।

প্রতিবেদনটি তৈরী করতে সহযোগিতা করেছেন সাংবাদিক তারেকুর রহমান। তাঁর বাড়ি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন