প্রজনন মৌসুমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলে রাতের আঁধারে অবাধে চলছে মাছ শিকার। উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের অভিযানকে ফাঁকি দিয়ে এলাকার অসাধু জেলেরা শিকার করছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মৎস্য বিভাগের নিয়মিত অভিযানেও তেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডী, শহরের নাজিরারটেক, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিনসহ টেকনাফের কয়েকটি এলাকার বঙ্গোপসাগরে গভীর রাতে নানা কৌশলে কারেন্ট জাল ফেলে জেলেরা ডিমওয়ালা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতের মাছ শিকার করছে। আহরিত মাছগুলো রাতারাতিই বিক্রি হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মৎস্য বিভাগের অভিযান টিমের গতিবিধি লক্ষ রেখেই অসাধু জেলেরা মাছ শিকার করছে। অভিযান টিম কোথায় বা কোন দিকে যাচ্ছে তার সঠিক তথ্য মুহূর্তেই জেলেরা পেয়ে সতর্কতার সঙ্গে মাছ শিকার করছে। ফলে অভিযানে নামলেও আগ থেকেই জেলেদের মোবাইল ফোনে সতর্কীকরণ মেসেজ চলে যাওয়ায় অভিযান ভেস্তে যাচ্ছে। অধিক রাতে অভিযান না থাকায় এসব এলাকার শত শত মাছ ধরা নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে জেলেরা ডিমওয়ালা ইলিশসহ নানা ধরনের মাছ শিকারে নেমে পড়ে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্কুল শিক্ষকের অভিযোগ, সরকার ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনসচেতনামূলক প্রচার-প্রচারণা তেমন একটা ছিল না। তাই অনেক জেলেই এ সময়ে মা ইলিশ শিকারে দেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে সেই সম্পর্কে জানে না। তাছাড়া প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে চেয়ারম্যান-মেম্বারের নিকটাত্মীয়দের ঘরে। তাই পরিবার চালাতে নিরুপায় হয়ে দরিদ্র জেলেরা নদীতে নামছেন মা ইলিশ শিকারে। এসব ডিমওয়ালা ইলিশ গভীর রাতে এবং সকালে স্থানীয় বাজারে এবং বিত্তবানদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কমমূল্যে বিক্রি করছে অসহায় দরিদ্র জেলেরা।
জানা গেছে, ৬৫ দিনের দীর্ঘ সময়ে জেলেদের মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দিয়ে থাকে। জেলায় ৬৩ হাজার ১৯৩ নিবন্ধিত জেলে পেয়েছে ৬৫ কেজি করে ৩ হাজার ৫৩৮ টন চাল। সরকারের এই সহায়তা পাওয়ার পরেও অনেক জেলে সাগরে মাছ ধরতে যায়। প্রতি বছর মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযানে লক্ষ লক্ষ মিটার জাল জব্দ করে পুড়ানো হয়। অনেকের জেল জরিমানাও হয়ে থাকে। এতকিছুর পরেও জেলেরা রাতে সাগরে মাছ ধরতে যায়। তা অবশ্য সংশ্লিষ্টদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। গত ২০ মে থেকে শুরু হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞা। শেষ হবে চলতি মাসের ২৩ জুলাই।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, গত দেড়মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৫ দশমিক ৩৬৩ লক্ষ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত জাল সাথে সাথে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া ২ দশমিক ২৬৯ মেট্রিক টন মাও জব্দ করা হয়। যেগুলো বিভিন্ন এতিমখানায় বিতরণ করা হয়।
সূত্রটি আরও জানায়, অবৈধভাবে সাগরে মাছ ধরার অপরাধে ৬টি মামলা, একজনের একমাসের জেল, ৩ লক্ষ ১ হাজার টাকা জরিমানা ও ৭টি নৌযান আটক করা হয়।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তারাপদ চৌহান বলেন, ৬৫ দিন বন্ধের আগে থেকে জেলেদের মাইকিং, লিফলেট বিতরণসহ নানাভাবে জানানো হয়েছে। বন্ধের সময় কোনো নৌযান সাগরে যাবে না। কেউ লুকিয়ে মাছ ধরলে তাকে উপযুক্ত শাস্তির বিধান আছে। কোস্টগার্ডসহ প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা প্রতিনিয়ত সাগর পাহারা দিয়ে থাকি। লোকবল কম হওয়ার কারণে চাইলেও হুট করে অভিযানে যেতে পারি না। তবে অন্যবারের তুলনায় জেলেরা আগের চাইতে আরও বেশি সচেতন হয়েছে। আমরা জেলে পল্লীতে গিয়ে জেলেদের সাথে আলোচনা করি। ৬৫ দিন বন্ধে কি উপকার হবে, তা নিয়ে ধারণা দিয়ে থাকি। এসব অভিযানে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌ পুলিশ এবং কোস্টগার্ডসহ মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, জাটকাসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রজাতির মাছের ডিম, লার্ভি ও পোনা রক্ষায় মৎস্যসম্পদ ধ্বংসকারী বেহুন্দি জাল এবং অন্যান্য অবৈধ জাল নির্মূলে পরিচালিত সম্মিলিত বিশেষ অভিযানে গত দেড় মাসে ৩৫ দশমিক ৩৬৩ লক্ষ মিটার জাল জব্দ করা হয়। জব্দ হওয়া জাল পুড়িয়ে বিনষ্ট এবং মাছ স্থানীয় এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, সাগরে মাছের প্রজনন বাড়াতে সরকারের এই উদ্যেগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কারণ ৬৫ দিন বন্ধে সাগরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ডিম ছাড়ে এবং প্রজনন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় জেলেরা। জেলেরা বেশি মাছ আহরণের জন্যে এটি একটি সুযোগ। যদিও বা এই দীর্ঘ সময়ে জেলেদের চলতে খুব কষ্ট হয়। এজন্য তাদের জন্য সরকারের চাল সহায়তা রয়েছে। দুই ধাপে প্রতিজন জেলে পাবেন ৯৫ কেজি করে চাল। কয়েকদিনের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের চাল পাবেন জেলেরা।
জেলেরা জানান, মৎস্য আহরণ তাদের মূল পেশা। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। দাদন ব্যবসায়ীরা টাকার জন্য চাপ দেয়। এনজিও’র কিস্তি পরিশোধ করাসহ নানা জটিলতার মধ্যে দিন কাটে তাদের। এজন্য তারা লুকিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। এতে করে সমস্যা হলেও করার কিছু থাকে না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, মৎস্য আহরণে বিরত থাকা নিবন্ধিত জেলেরা ভিজিএফ চাল পেয়েছেন। এরপরেও যারা আইন অমান্য করে মাছ ধরতে যায় তাদের জরিমানা করা হয়। এমনকি অনেক জেলেকে কারা ভোগ করতে হয়েছে।