আরফাতুল মজিদ
চলতি বছরের ৮ মে কক্সবাজার মধ্যম কলাতলী থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছিল সদর থানা পুলিশ। এসময় নিজ ঘর থেকে ইয়াবাসহ আটক হন শামসুল ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও তার ছেলে সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে মা-ছেলে কারাগারে থাকলেও অধরা মূল ইয়াবা কারবারি শামসুল ইসলামের ছেলে রাসেল। অধরা থেকেই ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে রাসেল ও তার বাবা শামসুল ইসলাম।

ইয়াবা উদ্ধারের ওই মামলায় পলাতক আসামীও হন রাসেল ও তার বাবা। এখনো পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি ইয়াবা ভেন্ডার ওই রাসেলকে। রাসেল পলাতক থেকেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকায় প্রচার রয়েছে। রাসেল সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য অথবা রাসেলের ইয়াবা বহনকারী নৌকার মাঝিকে আটক করলেই রাসেলকে গ্রেফতার করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেছেন এলাকার লোকজন।

পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ফাতেমা বেগমের বড় ছেলে রাসেল সাগর পথে ইয়াবা এনে পাচার করছিল। তার রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন সদস্যকে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে দ্রুত সময়ে। এছাড়া নজরদারীতে রয়েছে রাসেলের পুরো সিন্ডিকেট। অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাসেল সিন্ডিকেটে রয়েছে তার নিজের দুই মামাও। এরমধ্যে একজন রয়েছে জামাল। জামাল শহরের আলোচিত ইয়াবা কারবারি। ইয়াবা নিয়ে আটকও হয়েছিল। রয়েছে একাধিক মামলাও। অপরজন দেলোয়ার। তাদের মাধ্যমে ইয়াবা কারবারিতে জড়িয়ে পড়ে রাসেল। রাসেলের পুরো পরিবার ইয়াবা কারবারে জড়িত। তার পরিবার ও আত্মীয় মিলেই প্রায় ২৫ জন ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছে।

এরমধ্যে একজন একটি টেলিভিশনের কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি রয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। রাসেলের বাড়ি থেকে ইয়াবা উদ্ধারের সময় এবং উদ্ধারের পরে ওই সাংবাদিক ইয়াবা কারবারি রাসেলের সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগও করেছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ইয়াবাসহ শামসুল ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও তাদের ছেলে সাইফুল ইসলাম আটক হলেও এখনো অধরা মূল ইয়াবা কারবারি রাসেল, তার বাবা শামসুল ইসলাম, মামা দেলোয়ার, কামাল, শফিক ও রাফি। এই ৭ থেকে ৮জন সদস্য রাসেলের পারিবারিক ইয়াবা কারবারি। এছাড়াও তাদের রয়েছে আরো ১৭ জনের আত্মীয় স্বজনের ইয়াবা সিন্ডিকেট।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাসেলের অন্যতম ইয়াবা যোগানদাতা হল সাহাব উদ্দীন। সাহাব উদ্দীনের বাড়ি টেকনাফের হ্নীলা। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা কারবারের সুবাদে সাহাব উদ্দীন বসবাস করে আসছে রাসেলের এলাকা মধ্যম কলাতলীতে। কলাতলীর পাশে ঝরঝরি এলাকা থেকে সাহাব উদ্দীন বিয়েও করেন। সাহাব উদ্দীনের শ^শুর বাড়ির সবাই ইয়াবা কারবারে জড়িত রয়েছে বলে এলাকায় ব্যাপক প্রচার রয়েছে।
মধ্যম কলাতলী, চন্দ্রিমা এলাকা ও ঝরঝরি এলাকায় ১০টির অধিক জায়গাও কিনেছে সাহাব উদ্দীন। সাহাব উদ্দীনের একভাইও ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকায় আটক হন। সাহাব উদ্দিন, রাসেল ও জামাল হলো মূল ইয়াবা ট্যাবলেটের গড়ফাদার। সাগর পথে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে খালাস হয় কলাতলীর একটি নৌকার ঘাটিতে। যে ঘাটি দিয়ে ইয়াবা তুলে রাসেলের ঘরে জমা রাখা হয়। যেখান থেকে পুলিশ ১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা জব্দ করে।

একটি সূত্রে জানা গেছে, রাসেলের নিজস্ব ফিশিং বোট রয়েছে। যে বোট দিয়ে সাগর পথে ইয়াবা এনে তার বাড়ির সামনে নৌকার ঘাটিতে খালাস করত। ওই নৌকার মাঝি ছিল মধ্যম কলাতলী এলাকার আমির হোসেনের ছেলে ফরিদ ওরফে ডাইল ফরিদ। ফরিদকে আটক করলেই অনেক তথ্য পাবে প্রশাসন। সে রাসেলের সব ইয়াবা সাগর পথে বহনকারি ছিল। কিন্তু এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরছে ডাইল ফরিদ।
এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবা কারবারি রাসেল ও তার বাবা পলাতক রয়েছে। কিন্তু থেমে নেই তাদের ইয়াবা কারবার। নতুন করে তাদের ইয়াবা কারবারের হাল ধরেছে ঝরঝরি এলাকার বার্মায়া নুরুল ইসলামের ছেলে মোস্তাক ও মইন উদ্দিন। রাসেলের আপন ফুফাত ভাই মোস্তাক ও মইন। ঝরঝরি এলাকায় খামার বাড়ি থেকে রাসেলের ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে মোস্তাক। একই এলাকার আলম ও ধইন্ন্যা বিবির ছেলে সাজ্জাত হোসেন সুনিয়াও রাসেল সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। সুনিয়া রাসেলের চাচাত ভাই। জামাল নামেও একজন রাসেলের যেঠাত ভাই রয়েছে। মোস্তাক, মইন উদ্দিন, সুনিয়া ও জামাল বর্তমানে রাসেলের ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকায় প্রচার রয়েছে। শহরের এসএমপাড়ায়ও রাসেলের একজন ফুফাতো ভাই রয়েছে। যার সাথে রাসেলের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তাদের সাথে রয়েছে মধ্যম কলাতলী এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে আবু তাহের। তাহের ইতিমধ্যে ইয়াবাসহ আটকও হয়েছিল। আটকের পর কারাগার থেকে বের হয়ে তাহের স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েছে।
রাসেলের এক প্রতিবেশি জানান, সাহাব উদ্দীনের হাত ধরে ইয়াবা কারবারে রাসেলের উত্থান। টেকনাফের হ্নীলা সাহাব উদ্দীনের পুরো পরিবার ইয়াবা কারবারে জড়িত। এমনকি ঝরঝরি এলাকায় সাহাব উদ্দীনের শ^শুর বদিউল আলম ও শ^াশুড়ি রহিমা বেগমও ইয়াবা বিক্রি করে এলাকায়। তাদের ইয়াবা বিক্রির ধরণও ভিন্ন। শ^শুর বদিউল আলম পাইকারি (কাট) ইয়াবা বিক্রেতা ও শ^াশুড়ি রহিমা বেগম খুচরা বিক্রেতা। তাদের দুই ছেলে হিরু ও মাসিক পলাতক ইয়াবা কারবারি রাসেল সিন্ডিকেটে সক্রিয় সদস্য।
এছাড়া মাসিকের বোনের জামাই রুবেল ও তার ভাই পুতিক্কাও ইয়াবা কারবারে জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। বদিউল আলমের ছেলে হিরু, মাসিক, আব্দুর রহমানের ছেলে সাকিব, মধ্যম কলাতলী এলাকার তোহিদুল ইসলাম, শালিক রেস্টুরেন্টের মালিক নাছিরের ছোট ভাই হেলাল খান ও শফিউল আলম লাকি রাসেলের ইয়াবা পার্টনার।
অন্যদিকে সাহাব উদ্দীনের শালা হিসেবে পরিচিত তৌহিদ। সাহাব উদ্দীনের বাড়ি টেকনাফ। ওসি প্রদীপের আমলে সাহাব উদ্দীনের পুরো পরিবার পালিয়ে আশ্রয় নেন কলাতলী ঝরঝরিপাড়া এলাকায়। ঝরঝরিপাড়ায় আশ্রয় নিয়ে গড়ে তুলেন বিশাল ইয়াবা সিন্ডিকেট। যার একমাত্র সিন্ডিকেটের প্রধান হলেন রাসেল।
সাহাব উদ্দীনের হয়ে কক্সবাজারে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে রাসেল। আর রাসেল সিন্ডিকেটে রয়েছে হিরু, মাসিক, তৌহিদ, হেলাল খান, শফিউল আলম লাকী, সুনিয়া, ছোট রাসেল ও আব্দুর রহমানের ছেলে সাকিব। কলাতলী এলাকার মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে আবু তাহেরের সাথে ইয়াবা ব্যবসারের পার্টনার ছিল সাকিব। একসময় আবু তাহের থেকে প্রায় ১০ হাজার ইয়াবা ছিনতাই করে সাকিব। এরপর থেকে তাদের সর্ম্পক ভেঙে যায়। তাহের থেকে ইয়াবা ছিনতাইয়ের কয়েক দিনপর দামী একটি বাইকও ক্রয় করে কলাতলী এলাকার আলোচিত সাকিব। সাকিব কক্সবাজার সিটি কলেজের একজন ছাত্র। অল্প বসয়ী কলেজ ছাত্রেই এই লাইফস্টাইল অন্যরকম। কয়েকদিন পরপরেই নামি-দামী বাইক। আলিশান চলাফেরা। দামী রেস্টুরেন্টে আড্ডা। তার ইয়াবা কারবারের বিষয়টি পুরো কলাতলীবাসি অবগত।

একটি সূত্রে জানা গেছে, তাদের ইয়াবা খালাসের মূল পয়েন্ট হল কলাতলী মেম্বারের নৌকার ঘাটটি। যে পয়েন্ট দিয়ে রাসেল সিন্ডিকেটসহ অনেক ইয়াবা কারবারি মাদক খালাস করে নিয়মিত। স্থানীয় যুবলীগ ও আওয়ামীলীগের কথিত নামধারী কিছু ব্যক্তি এই ইয়াবা সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করে বলে পুরো এলাকায় জনশ্রতি রয়েছে। এই গ্রুপটির মূল আড্ডা চন্দ্রিমা ও ঝরঝরিপাড়া এলাকায়।
অপর দিকে ঝরঝরিপাড়া এলাকায় ইয়াবার ছোঁয়ায় বদলে যায় হাবিবুর রহমান ও মুফিজুর রহমানের জীবন। তারা একই এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে। কথিত সমাজের সভাপতি পরিচয়ে ঝরঝরিপাড়া এলাকায় ইয়াবা কারবার করে যাচ্ছে মুফিজুর রহমান। মুফিজের রয়েছে বাংলাবাজার এলাকায় পোলট্রি ফার্ম এবং এলাকায় নির্মাণাধীন রয়েছে বহুতল ভবন। তিনি এলাকার একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত। তার ভাই হাবিবুর রহমান ইয়াবাসহ ঢাকায় আটকও হয়েছিল। জেল কেটেছে প্রায় ৬ মাস। হাবিব একসময় শহরের লালদীঘির পাড়স্থ একটি আবাসিক হোটেলের কর্মচারি ছিল। ইয়াবার ছোঁয়ায় আজ কোটিপতি এই হাবিব। জেল থেকে বের হয়ে ফের ইয়াবা ব্যবসা চাঙ্গা রেখেছে হাবিব।
তবে কলাতলী সচেতন মহলের দাবী, শুধু রাসেল সিন্ডিকেট নয় আরো বহু ইয়াবা সিন্ডিকেট কলাতলী রয়েছে। যারা এখনো অধরা। অনেকেই কারাগার থেকে ফিরে এসে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। তার মধ্যে একজন রাসেল। তবে বর্তমানে অল্প বসয়ী অনেকে ইয়াবা কারবারে জড়িত হয়ে পড়েছে। যারা নিত্য নতুন দামী বাইক নিয়ে ঘুরে। রাসেলের সাথে যারা চলাফেরা করে তাদের আইনের আওতায় আনা হলে কলাতলীর অর্ধেক ইয়াবা কারবার বন্ধ হবে বলে অনেকেই মন্তব্য করেন। এমনকি রাসেল সিন্ডিকেটের সদস্যদের আটক করলে পুরো কলাতলী ইয়াবা ও কিশোর গ্যাং বন্ধ হবে বলে অনেকেই জানান।