আজিম নিহাদ:
সকালে যখন অন্যশিশুরা ব্যাগ কাঁধে স্কুলে ছুটে তখন ফরহাদ (১২) ছুটে অন্য গন্তব্যে। কাঁধে ব্যাগের বদলে থাকে প্লাস্টিক কুড়ানোর বস্তা। সারাদিন কাগজ আর প্লাস্টিক কুড়িয়ে দিন কাটে তার।
সন্ধ্যায় সেই প্লাস্টিক বিক্রি করে নিজের মুখে আহার তুলে জাহেদ। প্রকৃতির বুকে যখন অন্ধকার ভর করে, তখন ফরহাদের ঠিকানা হয় ফুটপাত অথবা মার্কেটের নিচে। ফরহাদের মা নেই, বাবা কোথায় ঠিকঠাক মনেও পড়ে না। এই শহরই এখন তার ঠিকানা।
ফরহাদের মত ময়লা-আবর্জনার স্তুপ বা নালা-নর্দমায় জীবিকা খুঁজে বেড়ানো সুবিধাবঞ্চিত প্রায় দুই শতাধিক শিশু রয়েছে কক্সবাজার শহরে। তাদের কাছে ‘একবেলা’ ভাল আহার যেন দুঃস্বপ্নের মত।

এরকম সুবিধাবঞ্চিত প্রায় দুই শতাধিক শিশু নিয়ে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) আনন্দ উৎসবের আয়োজন করে ‘নতুন জীবন’। নতুন জীবন নামের এই সংগঠন পথশিশুদের উন্নয়নে কাজ করে। ২০১৪ সাল থেকে শহরে কাজ করে আসছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি। পথশিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও মাঝেমধ্যে খাদ্য-বস্ত্রের ব্যবস্থা করে থাকে তারা।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শুক্রবার কোরবান পরবর্তী ঈদ আনন্দ ও ভোজনের আয়োজন করা হয় শহরের পৌরপ্রিপ্যারেটরী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। আজ আহারের চিন্তা নেই, তাই প্লাস্টিক কুড়ানোরও প্রয়োজন নেই। একসাথে হৈ-হুল্লোড়, আর নাচে-গানে মেতে উঠে সবাই। ছেলে এবং মেয়ে শিশুদের জন্য আলাদা আলাদা করে বিস্কুট দৌড়, বল চালানো, চেয়ার খেলা সহ আয়োজন ছিল কয়েকটি ক্রীড়া প্রতিযোগীতার।
দুপুরে সবার সাথে কোরবানের ঈদের দিনের মতই গরু মাংস আর অন্যান্য আইটেম দিয়ে পেট ভরে আহার করে তারা। ওই সময় তাদের চোখে মুখে যেন অন্য রকম আনন্দের ছাপ দেখা যায়।
ফরহাদ জানায়, ‘সকাল থেকে সারাদিন সবাই মিলে আনন্দ করেছি। বেশ মজা লেগেছে।
সে আরও জানায়, ‘আমাদের প্লাস্টিক কুড়ানো আর ভাল লাগে না। আমরাও চাই নতুন জীবনে ফিরতে, যেখানে আমরা অন্য শিশুদের মত নিয়মিত স্কুলে যেতে পারবো, খেলাধুলা করতে পারবো।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুবুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র শাহেনা আকতার পাখি, সিনিয়র সাংবাদিক সৈয়দুল কাদের, কক্সবাজার হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান মুহিউদ্দিন মুহি, শেখ রাসেল ঝুঁকিপূর্ন শিশু পুর্নবাসন কেন্দ্রের কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াছমিন, নতুন জীবনের সহসভাপতি মিনহাজ চৌধুরী, স্বপ্নজালের সাকির আলম প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন নতুন জীবনের সভাপতি ওমর ফারুক হিরু। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সুমন শর্মা।
আয়োজনকারী সংগঠন ‘নতুন জীবনের’ সভাপতি ওমর ফারুক হিরু জানান, পথশিশুদের কারও মা নেই, কারও বাবা নেই বা অনেকের মা-বাবা উভয়ই নেই। কাগজ বা প্লাস্টিক কুড়িয়ে যা আয় হয় সেগুলো দিয়ে জীবিকার সংস্থান করে তারা। এই পথশিশুরা কিন্তু আমার বা আমাদের ভাই-বোন আর অন্য শিশুদের মত ঈদ উদযাপন করতে পারে না। তাই তাদেরকেও ঈদের আনন্দ দিতে এই আয়োজন করা হয়েছে। শিশুরা খুব খুশি হয়েছে। এই আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।
তিনি আরও জানান, ‘এই আয়োজনে ২ শতাধিক পথশিশু অংশগ্রহণ করে। আজকের দিনটা অন্তত তাদের আনন্দে কেটেছে। এই ধরণের আয়োজন আমরা (নতুন জীবন) প্রায় করে থাকি।
নতুন জীবনের সাধারণ সম্পাদক সুমন শর্মা জানান, ২০১৪ সাল থেকে কক্সবাজার শহরে অবস্থানরত সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পথশিশু) জন্য কাজ করে যাচ্ছে নতুন জীবন। ৯ জন সংবাদকর্মী এই সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করলেও এখন স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা ৩৪ জন। আর এই সংগঠনে বর্তমানে পথশিশু রয়েছে ২১০ জন।
সভাপতি ওমর ফারুক হিরু জানান, পথশিশুদের সপ্তাহে প্রতি শুক্রবারে পৌর প্রিপ্যারেটরী উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করা হয়। এছাড়াও প্রতি ঈদে নতুন জামা, বার্ষিক পিকনিক, স্বাস্থ্যসেবা, মাঝে মধ্যে ভাল খাবার পরিবেশনসহ নানা আয়োজন করা হয়। আমাদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে যতটুকু সম্ভব করে যাচ্ছি। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে তাদের (পথশিশু) জন্য কোন উদ্যোগ নিতে হলে সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা দরকার।