কক্সবাজার অফিস:
শহরের অলিগলিতে ব্যক্তি উদ্যোগে তথা কথিত লকডাউন তথা ব্যারিকেড না দিতে নির্দেশ দিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। নির্দেশ অমান্য করে কেউ ব্যারিকেডের নামে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) অভ্যন্তরীণ সড়ক-উপসড়কে ব্যারিকেড না দেয়ার জন্য ‘ডিসি কক্সবাজার’ নামে ফেসবুক থেকে এ নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।
ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসে জেলা প্রশাসক বলেন, ’ব্যারিকেড জরুরি প্রয়োজনে চলাচল বিঘ্নিত করে, তাই নিজ উদ্যোগে অভ্যন্তরীণ সড়কে ব্যারিকেড না দেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’
গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘নিজ উদ্যোগে রাস্তা বন্ধ করার কারণে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, রোগী আসা যাওয়া, এ্যাম্বুলেন্স চলাচল, নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী সামগ্রি পরিবহন ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া রাস্তা বন্ধ থাকার সুযোগে রাস্তার ভেতরে জনসমাগম এবং অপরাধকর্ম সংগঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাই কাউকে অতিউৎসাহী না হয়ে নিজ ও পরিবারের সুরক্ষায় বাড়িতে অবস্থান করার অনুরোধ জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে কয়েকদিন ধরে শহরের অলিগলিতে ব্যক্তি উদ্যোগে ব্যারিকেড দেওয়া হচ্ছে। ব্যারিকেডের ভেতরে চলছে আড্ডা আর নানা অপরাধ কর্ম। অহেতুক বাঁধা সৃষ্টি করছে জরুরি গাড়ি চলাচলে।
কলাতলী এলাকার স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, কলাতলী উত্তর আদর্শগ্রামের প্রবেশমুখে ব্যারিকডে দিয়ে ভেতরে মাদক সেবন, মাদক বেচাকেনা, দোকানে আড্ডা, মোবাইল জুয়াসহ নানা অপরাধ করে যাচ্ছে অপরাধীরা। নিরাপত্তার জন্য নয়, মূলত নিজেদের অপরাধ কর্ম নিরাপদ করতে সেখানে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মাদক ব্যবসায়ীরা কৌশলে সমাজ কমিটির সভাপতি নাসির ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দামকে ব্যবহার করে ব্যারিকেড দিয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু বিষয়টি সভাপতি/সম্পাদক এখনো বুঝে উঠতে পারেনি।
কলাতলী লাইটহাউজ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি জানান, লাইটহাউজের প্রবেশমুখ ও ফাতেরঘোনা এলাকায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে চলছে অপরাধের মহোৎসব। কাজকর্ম না থাকায় দিন গড়িয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে জুয়া আর মাদকের আড্ডা। বিশেষ করে উঠতি বয়সী কিছু মাদকসেবী ও বখাটের উৎপাতে অতিষ্ট হয়ে পড়েছে লাইটহাউজের নিরীহ সাধারণ মানুষ।
পাহাড়তলী ইউসুলুর ঘোনা এলাকাটি মাদকের ডিপো হিসেবে পরিচিত। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ মাদকের সাথে জড়িত। ইউসুলুর ঘোনা প্রবেশমুখে কচ্ছপিয়াপুকুরের পূর্বপাশে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। ব্যারিকেডের কারণে পুরো মাদকের ডিপো নিরাপদ হয়ে গেছে। ভেতরে দিনরাত চলে মাদকের কারবার আর সেবন। পাহাড়তলীর ইসলামপুর, বউবাজার, বাদশা মুন্সিরঘোনা সহ বিভিন্ন এলাকায় একই অবস্থা বিরাজ করছে।
বৌদ্ধমন্দির রাখাইনপাড়া এলাকায় উভয়পাশে টিন দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। ভেতরে দিনরাত চলছে ইয়াবা বিক্রি আর সেবন। প্রশাসনের অভিযানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে সেখানে মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যারিকেড দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি।

ঝাউতলা গাড়ির মাঠ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি জানান, গাড়ির মাঠ এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ব্যারিকেড দিয়ে জুয়া আর আড্ডা চলছে। অসুস্থ রোগী পর্যন্ত বহন করা যাচ্ছে না। ঝাউতলা এলাকায় মাদকসেবীরা অতিউৎসাহী হয়ে এই ব্যারিকেড দিয়েছে বলে দাবী করেন তারা।
পশ্চিমবাহারছড়া শৈবালের সামনেও দেওয়া হয়েছে ব্যারিকেড। সেখানেও ব্যারিকেডের আড়ালে নিরাপদে চলছে মাদক বেচাকেনা আর সেবন।
মোহাজেরপাড়া ও ঘোনারপাড়া এলাকায় দেওয়া হয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে ব্যারিকেড। ঘোনারপাড়া এলাকায় জনৈক সিরাজ ও নুরুসনের নেতৃত্বে ব্যারিকেড দেওয়া হলেও পরে সেটি এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে তুলে নেওয়া হয়। মোহাজেরপাড়া এলাকায় সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে দেওয়া ব্যারিকেডটি এখনো রয়েছে।

এসএমপাড়া এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে অপরাধের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় সচেতন মানুষেরা বার বার বাঁধা দিলেও তোয়াক্কা করছে অপরাধীরা। বিশেষ করে মাদক ব্যবসায়ীরা কৌশলে স্থানীয় কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিনকে দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছে বলে দাবী করেন তারা।

একইভাবে শহর এবং শহরের বাইরের প্রতিটি এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে নিরাপদে চলছে অপরাধকর্ম।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ব্যারিকেডের আড়ালে চায়ের দোকানে আড্ডা, অপরাধীদের অবাধ বিচরণ, মাদক বেচাকেনাসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড চলছে। বিশেষ করে মাদক কারবারীরাই কৌশলে এলাকায় এলাকায় ব্যারিকেড দিয়েছে তাদের মাদক ব্যবসা নিরাপদ করার জন্য।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শবে বরাতের রাতে গরু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও রাস্তার উভয়পাশে ব্যারিকেড দিয়ে শহরে পাড়ায় পাড়ায় অন্তত দুই শতাধিক গরু জবাই হয়েছে। মানুষ নিরাপদ থাকার জন্য যে যার মত বাসায় অবস্থান করবেন। ব্যারিকেড দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কোন যৌক্তিকতা নেই।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (অপারেশন) মাসুম খাঁন বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শহরের অনেক এলাকায় নিয়মিত টহল দিতে গিয়ে ব্যারিকেডের কারণে বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে পুলিশ। ব্যারিকেড দিয়ে কিন্তু মানুষ নিরাপদে বাসায় অবস্থান করে না, বরং ব্যারিকেডের ভেতরে আড্ডাসহ নানা কর্মকান্ড চালায়। অনেক এলাকায় এই ব্যারিকেড অপরাধকর্ম নিরাপদে চালানোর কৌশল মাত্র। তাই এখন থেকে কোথাও ব্যারিকেড পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘এনভায়রণমেন্ট পিপলের’ প্রধান নির্বাহী একেএম রাশেদুল মজিদ বলেন, কক্সবাজারের প্রতিটি এলাকায় সড়কে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে ভেতরে নিরাপদে পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড় কেটে তোলা হচ্ছে অবৈধ ভবন। ব্যারিকেডের কারণে প্রশাসন অভিযানে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টিকে প্রশাসনের গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।